বাংলাদেশ, শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পথ-শিশুদের নিয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি আজকের এই সমাজ ও দেশ। আমাদের দায়িত্ব ও করণীয় কি?

মুহাম্মদ রবিউল আলম রবিন: আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত আছে আগামী দিনের দায়িত্বশীলতা। তারাই হবে দেশ ও জাতির অন্যতম অগ্রনায়ক বীর সেনাপতি। তাইতো কবি গোলাম মোস্তাফা বলছেন
“ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা
সব শিশুরই অন্তরে”।

শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে ভবিষ্যতের কত কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন প্রতিভা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের সচেতন মানুষ লক্ষ করছে যে অনেক ছিন্নমূল শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনাদরে, অবেহলায়, মানুষ হচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এদেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা। আমরা জানি শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কখনো উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারেনা, পারেনা তাদের লক্ষ্যপূরণ করতে। তাই এসব অধিকার বঞ্চিত শিশুকে আত্নশক্তিতে বলীয়ান করে তুলতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ। আমাদের অযত্ন, অবেহলা, উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষা সুযোগের অভাবে তারা যেন কখনোই ঝড়ে না যায় সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে আমার, আপনার, সবার।

শিশু বলতে কাদের বুঝায়- আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ শিশু সনদে বর্ণিত ঘোষনা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বুঝায় সেই অনুযায়ী আমাদের বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০-৪৫% ভাগই শিশু বলে গন্য করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের জাতীয় শিশুনীতিতে শুধু ১৪ বছরের কমবয়সীদের শিশুকে হিসাবে গন্য করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত কিছু আইনে ১৫ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসাবে গণ্য করা হয়েছে প্যানেল কোড এর ধারা অনুযায়ী।

পথশিশু কারাঃ আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোকই দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। এরা তাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুদেরকে গড়ে তুলতে পারেনা। তাদের সংসারের অভাব, অনটন লেগেই তাকে সর্বক্ষেত্রে। তারা তাদের ছেলে মেয়েদেরকে ঠিকমত খাবার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার সুযোগ সুবিধা প্রদানে ব্যার্থ হয়। তাই এসব শিশুরাই তখন জীবন নামে বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এইসব কাজের মধ্যে রয়েছে – রিক্সা শ্রমিক, ভ্যানগাড়ি শ্রমিক, ফুল বিক্রেতা, কুলিং কর্ণার, হোটেল শ্রমিক, মাদক সেবক, মাদক বিক্রেতা, কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পথ শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাঃ নিরক্ষরতা একটি সামাজিক অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে পথ শিশুদের মুক্ত করতে হলে তাদেরকে প্রয়োজনীয় তাদের মৌলিক শিক্ষা অধিকার দিতে হবে, কেননা শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নত হতে পারে না।মেরুদন্ডহীন মানুষ জড় পদার্থের ন্যায় অচল।কারণ শিক্ষা মানুষকে সত্যিকার মানুষ রুপে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর শিক্ষাহীনতা তাদেরকে অমানুষ করে তোলে। তাই পথ শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বিভিন্ন কারণে। যেমন শিক্ষার আলোয় পথ শিশুরা আলোকিত হবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে। তারা ভালমন্দ, ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে অবগত থাকবে। তারা যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।

পথশিশুদের প্রতি সরকারের দায়িত্ব ও করণীয়ঃ আমাদের দেশে কত ছিন্নমূল শিশু রয়েছে যারা দুইবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে না।সমাজের উচু তলার মানুষ থেকে ভিন্ন কিছু মানুষ রয়েছে যাদের দিন কাঠে অনেক কষ্টে। তারা কিভাবে তাদের সন্তানকে স্কুলে প্রেরণ করবে! উন্নত দেশে দেখা যায় যে, শিশুর সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকার বহন করে। তেমনি আমাদের দেশের অবহেলিত শিশুদের সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলে সমাজে আর কোন নিরক্ষরতা এবং অরাজকতা থাকবে না।

পথ শিশুদের শিক্ষায় আমাদের করণীয়ঃ যে জাতি শিশুর প্রতি মনোযোগী নয় সে জাতি কোন দিন বড় হতে পারবে না। শিশুর পুরিপূর্ণ বিকাশে জাতীয় সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। পথ শিশুদের ব্যাপারে শুধু সরকারি কার্যক্রম নয়! আমাদেরকে সচেতন অবলম্বন করতে হবে। পথ শিশুদের অধিকার দায়িত্ব, ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে তুলতে হবে, সমাজকে। উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তারা যেন অর্থনির্ভরশীল মানুষ হিসাবে নিজাকে গড়ে তুলতে পারে সেই ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। সমাজের বিত্তবান মানুষেরা সব সময়ই পথ শিশুদের ঘৃণার চোখে দেখে তাই সমাজে ধনী গরীবের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে। যাতে ধনীরা পথ শিশুদের উপর নির্যাতন করতে না পারে। সমাজে সাম্যের বাণী প্রচার করতে হবে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় আমরা বলতে পারি “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

আসুন আমরা সবাই মিলে পথ শিশুদের মৌলিক অধিকারের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তাদেরকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা গ্রহণ করি, যা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply