বাংলাদেশ, শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

তুরিন আফরোজ

রাজনৈতিক সন্ত্রাসের নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো যখন একটি রাষ্ট্র বা ওই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি সন্ত্রাসী আচরণ শুরু করে। বিদেশি অথবা নিজের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কর্র্তৃক এই ধরনের সন্ত্রাসকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ আদতে খুবই হতাশাজনক। কেননা নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূলত একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আর সেখানে কিনা রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা হরণ করে দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

দক্ষিণ-এশীয় রাষ্ট্রগুলো নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের উর্বর ভূমি। পাকিস্তানের লিয়াকত আলী খান (১৯৫১), মুহাম্মাদ জিয়াউল হক (১৯৮৮), বেনজির ভুট্টো (২০০৭); ভারতের মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী (১৯৪৮), ইন্দিরা গান্ধী (১৯৮৪), রাজীব গান্ধী (১৯৯১); শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েকে (১৯৫৯), ভিজায়া কুমারাতুঙ্গা, রানাসিংহে প্রেমাদাসা (১৯৯৩); ভুটানের জিগমে পালডেন দর্জি (১৯৬৪) কিংবা মালদ্বীপের ড. আফরাশিম আলী (২০১২) হত্যাকা- ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটিয়েছে বারবার।

গণতান্ত্রিক সমাজ রক্ষায় ও এসব জঘন্য ধারাবাহিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ইতি টানতে প্রকৃত অপরাধী ও তাদের মদদদাতাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা অপরিহার্য। আসলে অপরাধ যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপসারণ করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নৃশংস আক্রমণ কখনোই বিচারের আওতামুক্ত থাকা উচিত নয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার ও সহযোগীদের নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে পুরো বাংলাদেশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ভয়াবহ রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল। সেই নৃশংস হত্যার মাত্র একচল্লিশ দিন পর একটি ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ ঘোষণা করা হয়, যার ফলে খুনিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে এই অধ্যাদেশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা’র রায়ের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতি বেরিয়ে আসে এবং সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ তৈরি হয়। তবে এখনো প্রশ্ন ওঠে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের দেশি-বিদেশি খলনায়কদের বিচার কি বাংলাদেশ করতে পেরেছে?

‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা’ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের নগ্ন উদাহরণ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের জন্য তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং দলের অন্য সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়। শুধু তা-ই নয়, সেই বর্বর গ্রেনেড হামলার পরে তৎকালীন বিএনপি সরকার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত উধাও করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। একই সঙ্গে গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা রাজনৈতিক নাটকও সাজায়। এ কারণেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়ার জন্য এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

দেরিতে হলেও প্রায় ১৪ বছর পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে! মামলার জীবিত ৪৯ আসামির মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

এছাড়াও মামলায় সংশ্লিষ্টতার দায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মামলাতে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য মোট ১৪টি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছিল আদালত। এর মধ্যে ৭ নম্বর বিবেচ্য বিষয় ছিল “গুলশান থানার লালাসরাই মৌজার ১৩ নম্বর রোডের ব্লক-ডি, বাড়ি নম্বর-৫৩, বনানী মডেল টাউনের জনৈক আশেক আহমেদ, বাবা-আবদুল খালেক; তার বাসাটি ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত। ওই ‘হাওয়া ভবন’ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কি না? ওই ঘটনাস্থলে পলাতক আসামি তারেক রহমান অপরাধ সংঘটনের জন্য ষড়যন্ত্রমূলক সভা করেন কি না ও জঙ্গি নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন সময় মিটিং করেন কি না?”

আদালত সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে হাওয়া ভবনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। আর সে কারণেই আসামি তারেক জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।

আদালতের ১০ থেকে ১৩ নম্বর বিবেচ্য বিষয় ছিল

১০. অভিন্ন অভিপ্রায়ে ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে পরস্পর যোগসাজশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেনেড আক্রমণ চালানোর সুবিধার জন্য ও অপরাধীদের রক্ষার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায়, অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না।

১১. অভিন্ন অভিপ্রায় ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে মামলার ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত সংরক্ষণযোগ্য তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে এবং আদালতের অনুমতি না নিয়ে অপরাধীদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে আলামত নষ্ট করায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না।

১২. অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত সভা ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে পরস্পর যোগসাজশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মূল আসামিদের সহায়তা করার লক্ষ্যে আসামিদের নির্বিঘেœ ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে ও পরবর্তী সময়ে আসামিদের অপরাধের দায় থেকে বাঁচানোর সুযোগ করে দেওয়ার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না।

১৩. প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের রক্ষা করার জন্য প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অন্য লোকের ওপর দায় বা দোষ চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার লক্ষ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না।

ওপরের সবগুলো বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ষড়যন্ত্রের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে বলেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা এটাও জেনেছি, তদন্তে ও আসামিদের জবানবন্দিতে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে শুধু তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর-ই নন, বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল।

তাহলে আমার প্রশ্ন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও ওই তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলো কেন?

আসলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় সত্য অনুসন্ধান করা খুব জরুরি।  রাজনৈতিক সন্ত্রাস কিছুতেই তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।লেখক আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট barrister_tureen@hotmail.com

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply