বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জের দেওয়াননগর গ্রামে কর্মসংস্থান কর্মসুচী ও পাউবোর পিআইসি প্রকল্পে পুকুরচুরির অভিযোগ মেম্বার তৈয়বুর রহমানের বিরুদ্ধে

আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দেওয়ান নগর গ্রামে ২টি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রকল্প দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দেওয়াননগর গ্রামে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ম পর্যায়ের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসুচির আওতায় ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প ও একই অর্থবছরে একই ইউনিয়নের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদিত ডাকুয়ার হাওর উপ-প্রকল্পের আওতায় দেওয়াননগর গ্রামের জামে মসজিদ হতে ০.৫৫০ কিলোমিটার ডুবন্ত বাধের ব্রীজ ক্লোজিং এর ভাঙ্গা বন্ধকরন এবং বাঁধ পুনরাকৃতিকরন কাজ বাস্তবায়নের জন্য গঠিত ২৫ নং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। দুটি পিআইসিতে সভাপতি হিসেবে প্রকল্প কাজ ভাগিয়ে নেন মোহনপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য স্থানীয় ভৈষবেড় গ্রামের মফিজ আলীর পুত্র মোঃ তৈয়বুর রহমান। পিআইসির কাজটি সম্পন্ন করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ৫ সদস্যবিশিষ্ট পিআইসি কমিটি গঠন করে উক্ত ইউপি সদস্য নিজে সভাপতি ও তার ভাতিজা একই গ্রামের মৃত ইসমাইল আলীর পুত্র মোঃ কুতুব উদ্দিনকে সদস্যসচিব এবং দেওয়ান নগর গ্রামের কৃষক মোঃ আকবর আলী,মোঃ আনাছ আলী ও মোহাম্মদ আলী কে সদস্য নির্বাচিত করেন। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরু এবং শেষ পর্যন্ত ৩ জন সদস্যের মধ্যে একজনকেও কাজে সম্পৃক্ত করেননি তিনি। এমনকি কাজ শুরু করতে গিয়ে দেওয়াননগর গ্রামের ১৩ জন কৃষকের জমির মাটি কেটে নিয়ে প্রকল্পে মাটি ভরাট করলেও কোন জমির মালিককে ক্ষতিপূরন বাবত প্রতিশ্রæত অর্থ প্রদান থেকেও বিরত থাকেন। এছাড়া প্রকল্পে দুর্মুজ করা,দূর্বাঘাস লাগানোসহ আনুসাঙ্গিক সকল কাজ থেকেই বিরত থেকে দায়সারাভাবে শুধুমাত্র মাটির কাজ পরিচালনা করেই ক্ষান্ত থাকেন। ৫ সদস্যবিশিষ্ট পিআইসির ৩ সদস্য শুরু থেকেই প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মোঃ তৈয়বুর রহমানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাজে অভিযোগ দায়ের করে যাচ্ছিলেন।
এছাড়া ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে দেওয়াননগর গ্রামের মিরা সরকারের বাড়ীর সামনে থেকে পূর্বহাটির নতুন মসজিদ পর্যন্ত রাস্তায় ভাটি ভরাট এর লক্ষ্যে প্রকল্প কমিটি গঠন করত: কথিত কমিটির সভাপতি সেজে গত ২৩/১১/২০১৯ইং থেকে ১৫ জানুয়ারি ২০২০ইং পর্যন্ত প্রতি শ্রম দিবসে ২শত টাকা হিসেবে ২৫ জন উপকারভোগীদের মাধ্যমে ২ লক্ষ ২ হাজার টাকা ভাগিয়ে নিয়েছেন। পিআইসির মজুরদের মাধ্যমে দায়সারাভাবে কাজ করে কাগজেপত্রে উপকারভোগী হিসেবে ব্যাংক হিসাব চালু করেছেন আপন ভাই মহিবুর রহমান,ভাবী,ভাতিজা আবু হাসনাত ও ভাতিজা বউ লাভলী বেগম,ভাতিজা কুতুব উদ্দিন,কুতুব উদ্দিনের ভাইয়ের স্ত্রী এবং অটো রাইসমিলের মালিক একলাছুর রহমানকে। নিজ পরিবারের ২৫ জনের নামে জয়নগর বাজার কৃষি ব্যাংক শাখায় হিসাব চালু করে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে ভাগিয়ে নেন সরকারী প্রকল্পের টাকা। অথচ যাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেছেন এবং বরাদ্দকৃত টাকা পকেটস্থ করেছেন তাদের কাউকেই প্রকল্পের কাজে এক কোদাল মাটি ফেলতে দেখেননি এলাকাবাসী। মেম্বার তৈয়বুর রহমানকে প্রকাশ্য এই অনিয়ম দুর্নীতির কাজে সহযোগীতা করেছেন সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান,ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা।
শুধু তাই নয় কর্মসংস্থান কর্মসুচী প্রকল্পের রাস্তা পুরোপুরি না করেই ভূয়া বিল,মাস্টাররোলও প্রদান করেছেন মেম্বার তৈয়বুর রহমান। পাউবোর পিআইসি প্রকল্পের মজুরদের দিয়ে একই সাথে কর্মসংস্থান কর্মসুচির কাজ বাস্তবায়ন করেছেন দায়সারাভাবে।
জানা যায়,দেওয়াননগর গ্রামের রাস্তাটি গ্রামের স্কুল, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মক্তব, ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের সংযোগ রাস্তা। কিন্তু যে গ্রামের রাস্তায় কর্মসংস্থান কর্মসুচি প্রকল্প নিয়েছেন সেই দেওয়ান নগর গ্রামের কোন শ্রমিক বা উপকারভোগীকে তিনি ঐ রাস্তার কাজে নিয়োজিত করেননি। কাগজেপত্রে ও ব্যাংক হিসেবে ভৈষভেড় গ্রামের পরিবার ও গোত্রীয় লোকদেরকে শ্রমিক উপকারভোগী দেখালেও কাজ করিয়েছেন এই ২ গ্রামের বহিরাগত লোকদেরকে দিয়ে।
এদিকে ওয়ার্ড মেম্বার তৈয়বুর রহমান যে ভাতিজা মোঃ কুতুব উদ্দিনকে তার কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব মাধ্যমে টাকা পাইয়ে দিয়েছেন সেই একই ভাতিজাকেই পিআইসির সদস্য-সচিব করেছেন। ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য সরকার নির্দেশিত বিধান অমান্য করেছেন বলে দাবী করছেন এলাকার মানুষজন। দেওয়ান নগর গ্রামের গরীব ও অসহায় কৃষকরা সরকারী নির্দেশ মোতাবেক বেরীবাঁধে মাটি দেওয়ার জন্য জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু, যারা মাটি দিয়েছেন তাদের ১৩ জনের মধ্যে কোন কৃষকই মাটি দেওয়ার বিপরীতে কোন টাকা পাননি কিংবা তাদের জায়গা ভরাট করেও দেওয়া হয়নি। যার কারণে তাদের ফসলি জমি এখন পতিত থাকবে। এ ব্যাপারে মোহনপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হেমন্ত দাস,সাধারণ সম্পাদক এখলাছুর রহমান ও ১নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক কমর উদ্দিন বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধে (পিআইসি) কমিটিতে দেওয়ান নগর গ্রামের তিনজনকে রাখা হয়েছে কিন্তু কাজের বেলায় ঐ ৩ জনের সাথে কোন পরামর্শতো দূরের কথা কাউকে ঘুনাক্ষরেও কোন কাজে ডাকা হয়নি। একইভাবে কর্মসংস্থান কর্মসুচির কাজেও গ্রামবাসীকে উপেক্ষা করা হয়েছে পুকুরচুরির অসদুদ্দেশ্যে। পিআইসির সভাপতি সেজে মেম্বার যে হাওরে কাজ করেছেন সেই হাওরে তিনি এবং তার ভাতিজার কোন জমিও নেই। এর আগেও দুইবার সভাপতি সেজে উক্ত মেম্বার পিআইসির কাজ ভাগিয়ে নিয়ে এরকম নজিরবিহীন দুর্নীতি করেছেন। অভিযুক্ত ২টি প্রকল্পে সরকারের দেয়া বরাদ্দের মোট ১৫ লক্ষ টাকার মধ্যে ৭০% এর বেশী টাকা আদায় করলেও তিনি ২ প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার মতো ব্যয় করেছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তৈয়বুর রহমানের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পাউবো প্রকল্পের সদস্য-সচিব ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের উপকারভোগী মোঃ কুতুব উদ্দিন নিজেকে প্রকল্প সভাপতি মেম্বার তৈয়বুর রহমানের ভাতিজা স্বীকার করে বলেন,আমার চাচায় কমিটিতে রাখছইন বিধায় আমি ২টি পিআইসিতেই ছিলাম বা আছি। তবে দেওয়াননগরে যেখানে বাঁধ হয়েছে সেখানে আমার জমি থাকলেও আমার চাচার কোন জমি নাই। পিআইসির অভিযোগকারী ৩ সদস্য শুরু থেকেই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছে তারপরও আমরা কাজ করেছি কোনরকমে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পিআইও অফিসের তালিকায়,কর্মসৃজন প্রকল্পের ৫নং উপকারভোগী শ্রমিক ফখরুল আমিন মেম্বারের নাতি,৬নং শ্রমিক উপকারভোগী একলাছুর রহমান ভাতিজা,৭নং উপকারভোগী শ্রমিক কায়েছ মিয়া নাতি,৮নং উপকারভোগী শ্রমিক জাহানারা বেগম ভাবী,৯নং উপকারভোগী শ্রমিক মমতা বেগম ভাতিজার বউ,১০ নং উপকারভোগী শ্রমিক মহিবুর রহমান আপন সহোদর,১৫ নং উপকারভোগী শ্রমিক মোঃ কুতুব উদ্দিন ভাতিজা,১৬ নং উপকারভোগী শ্রমিক আবুতাহের ভাতিজা,১৭নং উপকারভোগী শ্রমিক আমিরজান ভাতিজার বউ,১৮নং উপকারভোগী শ্রমিক সালেহা বেগম নাতবউ,২০ নং উপকারভোগী শ্রমিক সানোয়ারা নাতবউ,২২ নং উপকারভোগী শ্রমিক আবু হাসনাত ভাতিজা,২৩নং উপকারভোগী শ্রমিক মায়া বেগম ভাবী,২৪ নং উপকারভোগী শ্রমিক রইছ উদ্দিন ভাতিজা,২৫নং উপকারভোগী শ্রমিক শাহেদা খাতুন মেম্বার তৈয়বুর রহমানের ভাতিজি বলে তিনি স্বীকার করে আরো বলেন,আসলে আমরা কেউই কর্মসংস্থান কর্মসুচি প্রকল্পের কাজ করার মতো লোক নই। আমার চাচা যেকোনভাবে হউক অন্যদের দিয়ে কাজ করিয়ে আমরা নিজের আত্মীয় স্বজনদেরকে একটু সুবিধা দিয়েছেন যা নিতান্তই স্বাভাবিক বলে আমি মনে করি। টাকা আমার চাচা মেম্বার বেটায় একলা খাইছইন না অফিসার,সাংবাদিক ও চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সকলরেই খাবাইছইন। পিআইসি কমিটির অনুমোদন আনতে প্রতিবারই চাচাকে মোটা অংকের টাকা গুনতে হয়েছে।
৬নং শ্রমিক উপকারভোগী একলাছুর রহমান বলেন,আমি একটি অটোমেটিক রাইসমিলের মালিক। ২ শত টাকা রোজে কর্মসংস্থান কর্মসুচি প্রকল্পে মাটিকাটার কাজের লোক আমি নই। এসব জালিয়াতি প্রতারনার কারবার আমার চাচা তৈয়বুর মেম্বারের।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পিআইও মানিক মিয়া বলেন,২ গ্রামের মধ্যে বিরোধের জের ধরে উক্ত অভিযোগের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এই অভিযোগগুলো উপজেলা চেয়ারম্যান আগেই প্রতিকার করেছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন,অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
দেওয়ান নগর গ্রামের কৃষক মোঃ আকবর আলী,মোঃ আনাছ আলী ও মোহাম্মদ আলী বলেন,আমরা জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ২ প্রকল্পের সভাপতি তৈয়বুর রহমানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দায়ের করেছি। আইনগত প্রতিকার না পেলে আদালত চালুর সাথে সাথেই বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করবো।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply