বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনাকালীন বর্ষাকালে নগরবাসীর জনদুর্ভোগ

আবছার উদ্দিন অলি

বৈশ্বিক মহামারী করোনায় মানুষকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারণে এমনিতেই মানুষ আজ
দিশেহারা। সেই সাথে ঘন ঘন ভূমিকম্প আর বর্ষাকালের বৃষ্টি নতুন করে দূর্ভোগ সৃষ্টি করছে। “বর্ষার ঝর ঝর সারাদিন ঝরছে মাঠ ঘাট থৈ থৈ খাল
বিল ভরছে”। ঋতু বৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। ছয় ঋতুর বিচিত্র সৌন্দর্য এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপভোগ্য করেছে। বাংলাদেশের ছয় ঋতুর
মাঝে বর্ষার স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আষাঢ় ও শ্রাবণ এ দু’মাস বর্ষাকাল হিসেবে বিবেচিত। গ্রীষ্মের প্রচন্ড খরার পর বর্ষা আসে প্রকৃতিকে  শীতল করার জন্য। বর্ষায় আকাশ মেঘে কাল হয়ে আসে। একটানা ঝম ঝম বৃষ্টি, উদ্দাম বাতাস, চারদিকে থৈ থৈ পানি, সতেজ গাছপালার সবুজ রূপ
বাংলাদেশকে অপরূপ সাজে সাজায়। আকাশে মেঘের আনাগোনা, মেঘের গুরু গর্জন, চকিতে বিদ্যুৎ চকম, রিমঝিম বৃষ্টি একটানা শব্দ বর্ষার
শুরুতেই ধুলিকণাময় পৃথিবীকে ধুয়ে মুছে করে পবিত্র। নদী-নালা, খাল-বিল কানায় কানায় হয় পূর্ণ। যেদিকে তাকান যায়, শুধু পানি আর পানি। কদ,
কেয়া, জুঁই, চামেলী ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা ফুলবন প্রকৃতি যেন নববধুর সাজে সজ্জিত হয়। সারাদিন বৃষ্টি আর বৃষ্টি কোথাও বের হওয়ার জো নেই। চারদিকে আঁধার ছড়িয়ে যায়। আকাশে তখন মেঘের খেলা। প্রবল বর্ষণে প্রাকৃতি মুখরিত হয়ে পড়ে অনেক সময় আকাশে সূর্যের দেখাই মিলে না। বৃষ্টির পানিতে খাল-বিল, নদী-নালা ভরে যায়। ডুবে যায় মানুষের ঘর-বাড়ি, ফসলের মাঠ, পথ-ঘাট। চারদিকে অথৈ পানি খেলা করে নদীতে শুরু হয় পাল তোলা নৌকার আনাগোনা বৃষ্টির পানি মাটি নরম হয়ে উঠে। তখন মাটির বুকে ফসলের সমারোহ। মাঠে মাঠে ফসল ভরে থাকে।
গাছে গাছে সবুজ পাতা গজায়। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে প্রকৃতি। প্রকৃতির এ অফুরন্ত সৌন্দর্য মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির প্রাচুর্য আর পথ-ঘাটের কাদা উপেক্ষা করে চলে জীবন যাপন। বর্ষা বাংলাদেশে কৃষকের ঘরে এনে দেয় নতুন কর্মব্যস্ততা। এ সময় কৃষকেরা আমন ধানের বীজ বুনে। আউস ধান কাটে, আমনের চারা রোপন করে এবং রাশি রাশি পাট কেটে ঘরে আনে। ভাটিয়ালি গানের সুরে এক কোমার পানতে লাঙ্গল চালিয়ে তারা হাল বয় রোপণ করে আমন ধানের চারা। রাশি রাশি সোনালি আঁশ আর আউস ধানের প্রাচুর্য দেখে কৃষকের মন ভরে ওঠে অনাবিল আনন্দে। এই তো গেলো গ্রামের কথা আসা যাক নগর জীবনে। আষাঢ়ের আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি নেমেছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম পরিণত হয়ে যায় এক জল থৈ-থৈ নগরীতে। দু’একবার ক্ষণিকের জন্য সূর্যের মুখ দেখা গেলেও পুরো সপ্তাহ ছিল বর্ষণসিক্ত। বর্ষাকালে প্রায় ভোর থেকে সন্ধা পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।জলাবদ্ধতা ও যানবাহন সঙ্কটের ফলে সকাল থেকেই নগরবাসীকে চলাফেরায় পোহাতে হয় অশেষ দুর্ভোগ। ভোগান্তি, জনজীবন হয়ে পড়ে প্রায় স্থবির। সবচেয়ে বিপাকে পড়তে হয় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের। কাকভিজা হয়ে অনেককে অফিসে যেতে হয়। খানাখন্দে ভরা রাস্তাগুলো ছিল দূর্ঘটনার অদৃশ্য ফাঁদ। মৌসুমী বায়ুর প্রবাহটি সক্রিয় হয়ে ওঠায় দেশব্যাপী এবারের প্রবল বর্ষণ শুরু হয় বলে জানা যায়। বর্ষার প্রথম দফা ভারি বর্ষণের আমেজ পাওয়া যাচ্ছিল। বঙ্গোপসাগর আবার উত্তাল-বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।
সাগরের ওপর এসে ভিড় করেছিল বিশাল ঘন কালো মেঘ। একটানা ভারি বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমতে থাকে। বড়পোল, চকবাজার,
বহদ্দারহাট, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, হালিশহর, আগ্রাবাদ, পাঠানতলী, মাদারবাড়ীসহ বহুস্থানে হাঁটু পানি জমে যায়। শহরের বিভিন্ন জায়গায়
নৌকায় মানুষ চলাচল করছে। জলাবদ্ধতা যেন নগরবাসীর উপর অভিশাপ হিসাবে ভর করেছে। সহসা এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় মিলছেনা।
এমন সু-সংবাদও নগরবাসীর কাছে নেই। সব মিলিয়ে নগরবাসী ভালো নেই। নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে যেখানে রাস্তা-ঘাট কাটা
হয়েছে। ম্যানহোল চুরি হয়ে গেছে সেখানে পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায় গর্তগুলো। এতে যত্রতত্র রিক্সা ও টেক্সী পড়ে দূর্ঘটনা ঘটায় ও শত শত যাত্রী
আহত হয়। অনেকে ময়লা পানিতে ভিজে একাকার হন। প্রবল বর্ষণের ফলে রাস্তায় রিক্সা, টেক্সী, কারের সংখ্যা কমে যায়। সুযোগ বুঝে যানবাহনের
ভাড়াও এক লাফে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়। ফলে একদিকে যানবাহন মেলা কঠিন হয়ে পড়ে অন্যদিকে চালকেরা তাদের মেজাজ মর্জি মতো গন্তব্যে
যেতে চাইলে নাগরিকদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। নগরীর নিম্নাঞ্চলবাসীরা চোখের জলে নাকের জলে একাকার হন। কিন্তু সমস্যার কোনো সুরাহা হয়
না। নগরীর বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশনের যেসব ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোও ঠিক মতো দেখার লোক নেই। অধিকাংশ ড্রেনেই নানারকম ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখার কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দুর্ভোগ কিছুটা কমার কথা থাকলেও তা কমছেনা। কিন্তু এই অব্যবস্থা
আর কতদিন চলবে। বর্ষা মৌসুমে নগরীতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা ঘরেও ঢুকে পড়ে পানি। এই সমস্যা সবার মুখে মুখে কিন্তু বাস্তবায়ন যেন
ফাইল চাপা হয়ে পড়ে আছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে রাস্তা সংস্কারের কাজ চলার কারণে দূর্ভোগ আরো বেড়ে চলেছে। বর্ষার আগমনে নগরবাসীর জীবনে নেমে আসছে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান কি নেই? আর কতকাল নগরবাসী এভাবে জলাবদ্ধতার উপর ভাসবে আর কাঁদবে। করোনা, ভূমিকম্প আর বর্ষাকালের বৃষ্টি সবকিছুর পরও মানুষ ভালো ভাবে বাঁচতে চায়।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply