বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জে সুদখোর আতাউরের কাণ্ড!

আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ 

সুদের টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে নিজের নিরীহ মোটর সাইকেল চালককে মিথ্যে মামলায় জেলহাজতে পাঠিয়েছেন এক প্রতিষ্ঠিত সুদখোর। ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী নোয়াহাটি গ্রামে। সুদ ব্যবসায়ীর নাম আতাউর রহমান। তিনি বালিজুরী নয়াহাটি গ্রামের মৃত নবী হোসেন এর পুত্র ও বালিজুরী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বলে জানা যায়। সুদ ব্যবসায়ী আতাউরের নির্যাতনের শিকার নিরীহ মোটর সাইকেল চালক হচ্ছেন জুয়েল মিয়া (৪০)। তিনি একই গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের পুত্র।
নিজেকে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি পরিচয়ে দাপট খাটিয়ে বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ৪০৬/৪২০ ধারায় তাহিরপুর থানায় নিরীহ মোটর সাইকেল চালক জুয়েল এর বিরুদ্ধে মামলা নং ৮ (জিআর ৭১/২০) তাং ১১/৬/২০২০ইং এফআইআর করান তিনি। মামলার বাদী হন আতাউর নিজেই।
মামলায় উল্লেখ করা হয় বিবাদী জুয়েল বালি ও পাথর ব্যবসায়ী। বিবাদী জুয়েলের পুজি স্বল্পতার কারণে আতাউরকে ব্যবসায়ে ৬০% লভ্যাংশ প্রদানের শর্তে টাকা চাইলে তিনি সরল বিশ্বাসে ৮/৪/২০১৯ইং তারিখে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে প্রথম ৫ লক্ষ টাকা প্রদান করেন জুয়েলকে। এমনিভাবে বিভিন্ন তারিখে সোনালী ব্যাংক লিঃ তাহিরপুর শাখা থেকে ৫টি ভিন্ন তারিখে নগদ ৩০ লাখ টাকা জুয়েল নিয়েছে বলে উল্লেখ করেন বাদী আতাউর। গত৫/১২/২০১৯ইং দুপুর ১.১০ টায় বালিজুরী বাজারস্থ বাদী আতাউর রহমানের অফিস ঘরটিকে ঘটনাস্থল উল্লেখে কথিত আসল ৩০ লাখ টাকাসহ ৬০% লভ্যাংশের টাকা ফেরত চেয়ে নিজের অফিস ঘরে গত ১০/৫/২০২০ইং দুপুর ১২টায় তথাকথিত সালিশ বৈঠকের আয়োজন দেখিয়ে ২৫/৫/২০২০ইং তারিখের মধ্যে পরিশোধ করবে মর্মে পৃথক ৩টি একশত টাকার নন জুডিসিয়েল স্টাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেন আতাউর। বিশ্বাস ভঙ্গ ও প্রতারনার মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকাসহ লভ্যাংশের ৬০% টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন ঘটনার উল্লেখ করে থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন তিনি। তাহিরপুর থানার এসআই জহরলাল দত্ত (বিপি ৮২০১০৯৬৬৪৩) কোন প্রকার সমন ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই গত ১০ জুন বুধবার দিবাগত রাত দেড়টায় তাহিরপুর থানার একদল পুলিশ নিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার ওয়েজখালী আবাসিক এলাকার ভাড়াটে বাসা থেকে জুয়েলকে আটক করে নিয়ে যান এবং তাহিরপুর থানা হাজতে আটক রেখে গত ১২ জুন শুক্রবার বাদ জুমা আটককৃত
জুয়েলকে কোর্ট হাজতে প্রেরণ করেন।
বালিজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুজ জহুর,বালিজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী  লীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক মিলন তালুকদার,৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফারুক আহমদ, স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য গুলেনুর মিয়াসহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা বলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত সুদখোর। তার সুদের টাকা ও স্টাম্প জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আয়্যুব বখত জগলুল এর কার্যালয়েও ইতিপূর্বে একটি সালিশ বৈঠক হয়েছিল। তার ব্যক্তিগত হেফাজতে প্রচুর পরিমাণ নন জুডিসিয়াল স্টাম্প থাকে। এসব সাদা স্টাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে তিনি বিভিন্ন লোকজনকে শতকরা মাসিক ১০% থেকে ২০%
সহ বিভিন্ন রেটে সুদে টাকা প্রদান করেন। সময় মতো টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তিনি পূর্বে স্বাক্ষর নেয়া সাদা স্টাম্পগুলোতে তার ইচ্ছেমতো পাওনা টাকার ফিগার লিখিয়ে সালিশ করে টাকা আদায় করেন। কারো কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে থানা পুলিশে মামলা দায়ের করে অন্যায়ভাবে হয়রানী করেন।
এলাকাবাসী বলেন,জুয়েল আতাউরের কাছ থেকে বালি পাথর ব্যবসার জন্য কোন টাকা আদৌ নেয়নি। জুয়েল টেলিভিশন ও ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতির একজন মেইকার মাত্র। বালিজুরী  বাজারে একটা মেইকারের দোকান দিয়ে টিভি ফ্যান ঠিক করে যা পেত তাই দিয়ে সে সংসার চালাতো। তার বাবার রেকর্ডীয় ২/৪ শতক বাড়ির জায়গায় এনটি টিনশেড ঘরছাড়া তার কিছুই নেই। আতাউর রহমান মেইকার জুয়েলের মোটর সাইকেলে চড়ে তাকে ড্রাইভার হিসেবে ব্যবহার করে এখানে সেখানে যেতেন এবং বিভিন্ন পার্টিকে সুদের টাকা প্রদানের বেলায় ব্যাংক থেকে জুয়েলের মাধ্যমে নিজের একাউন্ট থেকে টাকা উঠিয়ে আনতেন। বিভিন্ন সময়ে জুয়েলের উঠানো কোন টাকাই জুয়েল ভোগ করেনি।এসব টাকা বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে সুদ আদায় করেছেন আতাউর রহমান। আতাউরের ন্যায় তার ভাতিজা হেলাল ও ভাগ্না সাইফুলসহ তার পরিবারের অন্যান্য লোকরাও তাদের সুদের
ব্যবসায় জুয়েলকে মিডিয়া হিসেবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলো। সম্প্রতি অসহায় নিরীহ জুয়েল সুদের টাকা বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করলে জুয়েলের সাথে আতাউরের সম্পর্ক নষ্ট হয়। এক পর্যায়ে খুন ও মামলার ভয় দেখালে প্রাণ ভয়ে জুয়েল গত ২ মাস আগে স্বপরিবারে গ্রাম ছেড়ে বিশ্ব ম্ভরপুরে চলে আসে। কিন্তু বিশ্বম্ভরপুরেও আতাউরের যন্ত্রণায় নিরাপদ থাকতে না পেরে ঘটনার এক সপ্তাহ আগে সুনামগঞ্জ শহরের ওয়েজখালী এলাকায় একটি ভাড়াটে বাসায় উঠে।
১০ জুন বুধবার দিবাগত রাত দেড়টায় এসআই জহরলাল দত্ত এর নেতৃত্বে তাহিরপুর থানার একদল পুলিশ কোন প্রকার সমন ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই সুনামগঞ্জ পৌরসভার ওয়েজখালী আবাসিক এলাকার ভাড়াটে বাসা থেকে জুয়েলকে ধরে নিয়ে যায় এবং তাহিরপুর থানা হাজতে আটকে রাখে। পরদিন বৃহস্পতিবার থানা হাজতে আটকে রেখে সুদের টাকা আদায় করে দেয়ার জন্য পুলিশ ও আতাউরের লোকজন চাপ প্রয়োগ ও শারীরিক মানসিক নির্যাতন করে জুয়েলকে। এতে সে রাজী না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে জেল হাজতে পাঠায়।
জানতে চাইলে তাহিরপুর থানা ওসি মোঃ আতিকুর রহমান বলেন,আতাউর রহমান ব্যাংক চেক ও নন জুডিসিয়েল স্টাম্পসহ প্রমাণ দেখিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করলে আমরা তার বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করি এবং আটককৃত জুয়েলকে টাকা পরিশোধের জন্য সময় ও সুযোগ দেই। ব্যর্থ হওয়ায় আমরা মামলাটি এফআইআর করি।
আরো জানা যায়,গত ৩ বছর আগে বালিজুরী গ্রামের চাল ব্যবসায়ী মনসুর আলীর কাছ থেকেও এমনিভাবে নন জুডিসিয়েল সাদা স্টাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে টাকার এমাউন্ট বসিয়ে সুদ আসলের টাকা দাবী করেন আতাউর। পরে ঘটনাটি নিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় সাবেক মেয়র আয়্যুব বখত জগলুল সালিশ বৈঠক করেন। সালিশে আতাউরকে সুদখোর ও দাদন ব্যবসায়ী বলে অভিহিত করে নিরীহ চাল ব্যবসায়ী মনসুরের কাছে আতাউর
কোন টাকা পায়না বলে সিদ্বান্ত হয়। অথচ এই আতাউরের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে চাল ব্যবসায়ী মনসুরও ৩ বছর আগে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
এলাকার বালি পাথর ব্যবসায়ীদের সংগঠন “বালি জুরী মিনিক্রাশার মালিক সমিতি”র সভাপতি মাহমদ আলী বলেন,আমরা আমাদের এলাকার সকল বালি পাথর ব্যবসায়ীদেরকে চিনি জানি। জুয়েল আদৌ কোন বালি পাথর ব্যবসায়ী নয়। সে আতাউরের মোটর সাইকেল চালক ছিল। আতাউর ব্যাংক থেকে তার মাধ্যমে টাকা উঠিয়ে এনে সুদ ও দাদন ব্যবসায় লাগাতো। জুয়েল যদি আতাউরের কাছ থেকে কোন টাকা এনে নিজে ভোগ করতো তাহলে ঐ টাকা দিয়ে বাড়িগাড়ী করতো অথবা কোন বড় ধরনের ব্যবসায় খাটাতো কিংবা কোন ব্যাংকে জমা রাখতো। কিন্তু জুয়েল আতাউরের কাছ থেকে নিজের জন্য কোন টাকা আনেনি বলে তার বিরুদ্ধে এসব আজগুবি অভিযোগ প্রমাণের কোন সুযোগ নেই। তাহিরপুর সার্কেলের (এএসপি) সহকারী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার বলেন, কোন ব্যক্তি যদি উদ্দেশ্যমূলক প্রতারনার আশ্রয়ে থানা পুলিশকে ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে কোন নিরীহ মানুষকে হয়রানী করে এবং পুলিশের কাছে যদি তা প্রমাণ হয় তাহলে ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধেও আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চেয়ে আতাউর রহমানের মুঠোফোনে ৩ দিন তৃতীয় দফায় কল করলেও তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে রাজী হননি। অসহায় জুয়েলের স্ত্রীপুত্র ও এলাকাবাসী সুদখোর আতাউর রহমানকে আটক করে নিরীহ জুয়েলকে উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা মামলায় ফাসানোর আসল রহস্য উদঘাটনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply