বাংলাদেশ, সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জে সাংসদকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট এসএ টিভির সাংবাদিক গ্রেপ্তার

আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ-১ আসনের (তাহিরপুর,ধর্মপাশা,জামালগঞ্জ) সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন কে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলায় এসএ টিভির জেলা প্রতিনিধি ও সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক হাওরাঞ্চলের কথা পত্রিকার সম্পাদক মাহতাব উদ্দিন তালুকদার (৪৬) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বনানীপাড়া মহল্লার বলাকা এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে রাত ১২টায় জেলার ধর্মপাশা থানায় মাহতাব উদ্দিন তালুকাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের হয়। মামলার বাদী হন ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নের উত্তরবীর গ্রামের বাসিন্দা বেনুয়ার হোসেন খান পাটান। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেনের সমর্থক হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান,বাদী তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আসামী মাহতাব উদ্দিন তালুকদার তার নিজের ফেসবুকে সোমবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন কে নিয়ে একটি পোস্ট দেন। এতে এটিএন এর সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, “অবশেষে সুনামগঞ্জ ১ আসনের এমপি রতনকে আটক করেছে দুদক”। এই মিথ্যা বানোয়াট ও অপসংবাদে এবং গুজবে ক্ষুব্ধ এমপির পক্ষে আওয়ামীলীগ নেতা বেনোয়ার হোসেন খান পাটান বাদী হয়ে মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে আসামী করে ধর্মপাশা থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ২৫,২৯,৩১,৩৫ ধারায় মামলা নং ৩ তাং ৪/৪/২০২০ইং দায়ের করেন। মামলাটি এফআইআরের পর সাথে সাথেই সুনামগঞ্জ জেলা সদরে পৌছে পুলিশ তাকে আটক করে সদর থানা হাজতে নেয়।
মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.সহিদুর রহমান। মাহতাব উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের স্বরুপগঞ্জ গ্রামের পশর উদ্দিনের পুত্র।
সহকারী পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন,আমরা ধর্মপাশা কোর্টে সোপর্দ না করে জেলা সদরে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাকে প্রেরণ করেছি।
সুনামগঞ্জ কোর্ট ইন্সপেক্টর আশেক সুজা মামুন বলেন,মঙ্গলবার দুপুরে আমল গ্রহনকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ধর্মপাশা জোনের দায়িত্বরত বিচারক মোঃ খালেদ মিয়ার কোর্টে আসামী মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে হাজির করে তার জামিনের আবেদন করা হয়। এডভোকেট রজত কান্তি সরকারসহ ৫ জন সিনিয়র আইনজীবি তার জামিনের আবেদন শুনানী করেন। বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ শুনানী শেষে তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেন।
সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বিপিএম বলেন,কেউ আইনের উর্ধে নয়। সুস্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘন করে একজন সাংসদের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে গুজব ও অপপ্রচারের কারণেই ধর্মপাশা থানায় সাংসদের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাটি এফআইআর হয়েছে। তিনি বলেন,একটি পত্রিকার সম্পাদক নিজের পত্রিকা ও টেলিভিশন বাদ দিয়ে ফেইসবুকে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন গুজব রটনা করতে পারে এরকম আহম্মকি কর্মকান্ড এই প্রথম আমার চোখে পড়েছে।
এর আগে মাহতাব উদ্দিন তালুকদার সুনামগঞ্জ জজকোর্টের কর্মচারী হোসেন আহমদের দায়েরকৃত সিআর ৪/২০১০ (সদর) নং মামলার আসামী ছিলেন। ঐ মামলায় ১০/১০/২০১২ইং তারিখে বিজ্ঞ আদালত তাকে ৪ মাসের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। পরে বাদীর সাথে আপোষ করে ফৌজধারী আপীল নং ৭/২০১৩ দায়েরক্রমে মামলা থেকে রেহাই পান তিনি। সাংবাদিকতার জাল অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে আবেদন করে সাপ্তাহিক হাওরাঞ্চলের কথা পত্রিকার ডিক্লারেশন পান মাহতাব উদ্দিন তালুকদার। পরে সাংবাদিক হোসাইন মাহমুদ শাহীনের দাখিলকৃত অভিযোগের তদন্ত করে জেলা প্রশাসক,তার পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেন। এর আগে তার সাপ্তাহিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান,মাজহারুল ইসলামসহ ৪ জন স্টাফ জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দাখিল করে তার পত্রিকা থেকে অব্যাহতি নেন। পত্রিকা বাতিল হওয়ার পর উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে ঐ পত্রিকাটি পূণ: প্রকাশনার পাশাপাশি সাবেক জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের সময়কালে এটিকে দৈনিক হিসেবে উন্নীত করেন। সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাকে সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। মাহতাব উদ্দিন তালুকদার ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে শহরের কাজীর পয়েন্টে স্কাইনেট কম্পিউটার নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে সেখানে জাল সনদ বিক্রিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হন। সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়ার সমর্থিত বিএনপির নেতাদের সাথে সম্পৃক্ততা গড়ে তোলে তিনি জাতীয়তাবাদী বাস্তুহারা দলের জেলা কমিটি গঠনে নেতৃত্ব দেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি  মতিউর রহমানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সুনামগঞ্জ জেলা বাস্তহারালীগ গঠন করে ঐ দলের সভাপতি হন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী যুব শ্রমিক লীগ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও সাংবাদিক ফোরাম সুনামগঞ্জ সংগঠনের সাধারন সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের একাংশের নামে মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন,সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার সম্পাদক পংকজ দে ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি একে এম মহিম। তারা নিজেদেরকে প্রেসক্লাবের একাংশের সভাপতি সম্পাদক দাবী করে বলেন,মাহতাব উদ্দিন দাবী করেছেন,তিনি সম্মানিত সংসদ সদস্যকে নিয়ে কোন পোষ্ট দেননি। সোমবার রাতে তার ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছিল। প্রায় ৬ ঘন্টা পর তিনি আরেকজনের সহায়তায় সেটি উদ্ধার করেন। পরে তিনি নিজেই তার ফেইসবুকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তারা বলেন,যেহেতু মাহতাব উদ্দিন দাবী করেছেন তিনি এটি করেননি। তার ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছিল সেহেতু বিষয়টির তদন্ত হতে পারতো। সামাজিকভাবেও নিস্পত্তির সুযোগ ছিল। আমরা বিষয়টির সঠিক তদন্ত চাই। সম্মানিত সংসদ সদস্যের সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য অন্যায় কোন উদ্যোগ হলে সেটিরও বিচার চাই। একই সঙ্গে মাহতাব উদ্দিন যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের শিকার না হন সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবাণ জানান তারা।

সুনামগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও মোহনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধ কুলেন্দু শেখর দাস, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক-দৈনিক নয়াদিগন্তের জেলা প্রতিনিধি তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ,অর্থ সম্পাদক-একুশে টেলিভিশনের প্রতিনিধি মোঃ আব্দুস সালাম, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক-দৈনিক বিশ্বমানচিত্রের জেলা প্রতিনিধি একে মিলন আহমদ, সদস্য ও দৈনিক ঢাকা প্রতিদিনের জেলা প্রতিনিধি শামীম আহমদ তালুকদার, প্রচার সম্পাদক-২৪ ঘন্টার প্রতিনিধি কে এম শহীদুল ইসলাম, মহিলা সম্পাদিকা তানিম আক্তার, সদস্য-দৈনিক যায়যায় কালের প্রতিনিধি মহিবুর রেজা টুনু, সদস্য-দৈনিক স্বাধীন বাংলার প্রতিনিধি মোঃ বাবুল মিয়া, সদস্য-দৈনিক ডেসটিনির প্রতিনিধি বিপলু রঞ্জন প্রমুখ ফোরামের সাধারন সম্পাদক গ্রেফতারকৃত মাহতাব উদ্দিন তালুকদার কর্তৃক তার ফেইসবুক আইিডকে হ্যাকড করে একজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে এমন মন্থব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবী জানান।

তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বলছেন,ফাজিলপুর বালিপাথর মহালের ব্যবসা নিয়ে সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে এক ক্ষুব্ধ শ্রমিকলীগ নেতা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে সাংবাদিক মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে বাধ্য করে ঐ সাংসদের বিরুদ্ধে হাওরাঞ্চলের কথা পত্রিকায় একটির পর একটি ফরমায়েসী সংবাদ পরিবেশন করান। আর এসব ফরমায়েসী সংবাদের কারণেই সাংসদ রতনের আক্রোশের শিকার হন মাহতাব উদ্দিন তালুকদার। এদিকে সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সমর্থকরা আটককৃত সাংবাদিক মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে রিমান্ডে নিয়ে ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনের দাবী জানিয়েছেন।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply