বাংলাদেশ, শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২০ ইং, ২১শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

নি:স্বজনের বাঁচার আকুতি ও ধনীদের বাঁচার অধিকার

আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগ সম্পর্কে অসচেতনতা, অসাবধানতা এবং রোগের লক্ষন সম্পর্কে ধারনার অভাব ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। রোগ, রোগী, চিকিৎসা ও প্রাসঙ্গিক মেডিসিনসহ যন্ত্রাংশ সম্পর্কে ধারনা দেয়ার একক এখতেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের। ভুক্তভোগী হিসেবে আমরা শুধুমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান ঘোষিত তথ্যাবলী তুলে ধরতে পারি। একসময় দিবসটি উদযাপনের সকল আনুষ্ঠানিকতা হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও উদ্বেগজনক হারে কিডনি রোগীর সংখ্যা ক্রমবৃদ্ধির ফলে এ মরনব্যাধী রোগ ও চিকিৎসার বিষয়ে জানার আগ্রহ বাড়ছে সাধারনের। দু:খজনক হলেও সত্য যে, পরিসংখ্যানমতে বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ১৮% শতাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত । সে তুলনায় বাংলাদেশে জীবন সুরক্ষার উপযোগী উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কোন প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। ফলে ধনীশ্রেণির কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাড়ি জমাতে পারলেও গ্রাম বাংলার হতদরিদ্র নি:স্ব রোগীরা কিডনি রোগ চিহ্নিত হওয়ার আগেই চিকিৎসা না পেয়ে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে কি পরিমাণ রোগীর মৃত্যু ঘটছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এমন বাস্তবতায় ধনী রোগীদের বাঁচার অধিকারের পাশাপাশি নি:স্বজনের বাঁচার আকুতি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। মরনব্যাধী কিডনি রোগ একটি আত্মসামাজিক এবং মানবিক বিপর্যয়ের অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। এমন বিপর্যয় কোন একক ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভভ নয়। এজন্য প্রয়োজন মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্রের অফুরান সহযোগিতা। এ দায়িত্ববোধ থেকেই কিডনি রোগী কল্যাণ সংস্থা বা দরিদ্র হতদরিদ্রসহ সকল কিডনি রোগীর পক্ষে এবং দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নততর করার অনুভুতি থেকে নিম্নলিখিত প্রস্তাবনা সমূহ রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং জনসাধারনের অবগতির জন্য পেশ করা হলো-
(১). জাগো মানবতা জাগো :- কিডনি-বিকল একটি মরণব্যাধি রোগ। এ রোগ দীর্ঘস্থায়ী, চিকিৎসাও (মৃত্যুর দিনক্ষণ পর্যন্ত) দীর্ঘমেয়াদি। প্রতিবছর মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র-হতদরিদ্র শ্রেণির অসংখ্য রোগী ব্যয়বহুল চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করছে। উচ্চবিত্ত ও ধনাঢ্য রোগীরাও চিকিৎসার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে একসময় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী পরিবার না-পারে চিকিৎসা ব্যয় টানতে; না-পারে প্রিয়জনের মৃত্যু ঠেকাতে। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর লিভার, ফুসফুস, হৃদ্রোগসহ শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। এমনিতেই কিডনি চিকিৎসা অসম্ভব ব্যয়বহুল। তার উপর বহুমাত্রিক রোগব্যাধির চিকিৎসা কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। এ দায়িত্ববোধ থেকেই বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনে “কিডনি রোগী কল্যাণ সংস্থা তথা কর এর সৃষ্টি।
(২). কিডনি রিসার্চ সেন্টার ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা :- পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬-১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। সে হিসেবে ২ কোটিরও অধিক মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত তার উপর প্রতিবছর ৪০ হাজারেরও অধিক মানুষ য্ক্তু হচ্ছে কিডনি-রোগীর তালিকায়, যা খুবই উদ্বেগজনক। এই বিশাল সংখ্যক কিডনি-রোগীর তুলনায় চিকিৎসা-সুবিধা খুবই অপ্রতুল, বিশেষ করে চট্টগ্রামে। কিডনি-চিকিৎসায় দরিদ্র ও হতদরিদ্র রোগীদের সামর্থ্যের মধ্যে চিকিৎসা, কিডনির সকল চিকিৎসায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কিডনি রিসার্চ সেন্টার এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা।
(৩). কিডনি রোগ প্রতিকারে জনসচেতনতা কর্মসূচি :- প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল আলোচনা, র‌্যালি, মানববন্ধনসহ সংস্থার নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে এবং অসচেতনতা, অসাবধানতা, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে ধারণার অভাব, কিডনি রোগ প্রতিকারক ও আক্রান্ত রোগীর করণীয় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানের যাবতীয় তথ্যাবলি সম্প্রচারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ।
(৪). কিডনি চিকিৎসায় ব্যয়হ্রাসে উদ্যোগ :- প্রবাদ আছে ‘কিডনি রোগী মরেও যায় মেরেও যায়’। অসম্ভব ব্যয়বহুল এ-রোগের চিকিৎসা। দীর্ঘমেয়াদি এ-চিকিৎসা চালাতে হয় মৃত্যুর দিনক্ষণ পর্যন্ত। চিকিৎসা-ব্যবস্থায় কোথাও মিলে না এক কানাকড়ি ছাড়। এমন বাস্তবতায় ডাক্তার ভিজিট, নিরীক্ষা রিপোর্ট, ফেষ্টুলা স্থাপন, ডায়ালাসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় ও ওষুধের উচ্চমূল্যসহ কিডনি চিকিৎসায় সর্বক্ষেত্রে ব্যয়হ্রাস ও কিডনি-চিকিৎসায় জীবন রক্ষাকারী যাবতীয় ওষুধ দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা, দেশী বিদেশী উদ্যোক্তাদের সুযোগ ও প্রণোদনা যোগানের মাধ্যমে সাশ্রয় মূল্যে ওষুধ সহ প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সুলভমূল্যে পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জীবন রক্ষাকারী কিডনি রোগের ওষুধের যাবতীয় আমদানী শুল্ক মওকুফ করা। সরকারী এবং বেসরকারী হাসপাতাল, কিডনি চিকিৎসার যাবতীয় ওষুধ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং উপকরণ এর উপর ভ্যাট প্রত্যাহার করে দরিদ্র হতদরিদ্রদের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ।
(৫) ডায়ালাসিস উপকরন শুল্কমুক্তকরন :- একদিকে ডায়ালাসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় লাগামহীন অপরদিকে রোগীদের আস্থার সংকটে দেশের ডায়ালাসিস ও প্রতিস্থাপন চিকিৎসা। ফলে চিকিৎসা খাতে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা। ডায়ালাসিস অসম্ভব ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেক রোগী অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাই ডায়ালাসিস মেশিনের সহজলভ্য এবং ডাইলেজার ও ডায়ালাসিস উপকরণ দেশে প্রস্তুত করার ব্যবস্থা করা। ডায়ালাসিস মেশিন এর যাবতীয় উপকরণ শুল্কমুক্ত আমদানীর সুবিধা পেলে সাধারণ জনগণ অত্যন্ত সূলভ মূল্যে ডায়ালাসিস নিয়ে জীবন বাঁচাতে (আল্লাহ চাহেতো) পারে।
(৫). জীবনের জন্য জীবন :- কিডনি আক্রান্ত রোগী সাধ্যের মধ্যে দেশেই জীবন সুরক্ষার উপযুক্ত চিকিৎসার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধির দিকে মনোযোগ আকর্ষণ। ক্রমবর্ধমান রোগীর জীবন বাঁচানোর প্রশ্নে নিকট-আত্মীয়ের পরিসর বৃদ্ধি এবং জোড়া দম্পতির মধ্যে কিডনি বিনিময়, মরণোত্তর কিডনি দান ও দুর্ঘটনায় নিহতদের কিডনি সংরক্ষণে সুরক্ষিত ডিজিটাল কিডনি ব্যাংক গঠনসহ বিদ্যমান প্রতিস্থাপন আইন জীবন সুরক্ষার উপযোগী করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
(৬). জীবনমান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে কর্মসূচি :- কিডনি রোগী ও পরিবারের বৃদ্ধ, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, কর্মক্ষম, শিক্ষার্থী এবং মেয়েদের বিয়েসহ জীবনমান সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্প গ্রহণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন-ভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন।
(৭). এককালীন অনুদান :- সংস্থার সদস্যভুক্ত রোগী ও হতদরিদ্র রোগীর মৃত্যুপরবর্তী তার পরিবারকে এককালীন অনুদান প্রদান।
(৮). প্রতি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কিডনি হাসপাতাল :- দেশের প্রত্যেক সরকারী বেসরকারী হাসপাতালে মানসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ কিডনি চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন, প্রতি বিভাগীয় শহরে মানসম্পন্ন কিডনি হাসপাতাল ও ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং জীবন সুরক্ষায় উপযোগী দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স তৈরী। প্রয়োজনে দেশ বিদেশে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা।
(৯). জীবন রক্ষাকারী ওষুধের উপর আমদানী শুল্ক হ্রাস :- দেশের রোগীদের বিদেশী ওষুধের উপর নির্ভরতা কমাতে দেশী বিদেশী উদ্যোক্তাদের জীবন রক্ষাকারী যাবতীয় ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহিত করা। তাছাড়া কিডনি, ক্যান্সার ও লিভার ডিসিস আক্রান্ত রোগীদের যাবতীয় ওষুধের উপর আমদানী শুল্ক মওকুফ এবং দেশে জীবন রক্ষাকারী সকল ওষুধের উপর সর্বোচ্চ ভতর্‚কি/ ছাড় মূল্যে ওষুধ প্রাপ্তির ব্যবস্থা।
(১০). জনবহুল এলাকায় শৌচাগার স্থাপন প্রস্তাব চাপ দীর্ঘমেয়াদী চেপে রাখা- অভ্যাসে পরিণত হলে কিডনি তার কার্যকমতা হারিয়ে ফেলে। একজন পুরুষ যতটা সহজে শোভন কিংবা অশোভনভাবে পয়-প্রস্তাব সাড়ার সুযোগ আছে, একজন মহিলার পক্ষে তা কখনো সম্ভব হয় না। ফলে মহিলা কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লেখ্য যে শৌচাগার একদিকে মানবসেবা অপরদিকে লাভজনক ব্যবসা সর্বশেষ স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম উপাদান। সে বিবেচনায় উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক জনবহুল এলাকায় সরকারী উদ্যোগে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ অতীব জরুরী।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply