বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২০ ইং, ১৯শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাংবাদিকতা

 

মাহমুদুল হক আনসারী

নাগরিক জীবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে তথ্য ও বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। শহর, উপ-শহর পেরিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ আজ তথ্য জানার জন্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তথ্য জানার জন্য মানুষ আগের মতো অপেক্ষার প্রহর গুণছে না। এক সময় তথ্য বা খবর জানার একমাত্র উৎস ছিল গণমাধ্যম। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া রূপান্তর ও বিকশিত হয়েছে। স্মার্ট ফোন ও আই ফোনের  বদৌলতে তথ্য ও খবর এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ অত্যাধুনিক সামাজিক যোগাযোগ  মাধ্যমে জনগণ তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বে যোগাযোগের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নাম ইন্টারনেট। ইন্টারনেট তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করছে। একযুগ পূর্বে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যা ছিল অসম্ভব, বর্তমান সময়ে তা চোখের পলকেই সম্ভব হচ্ছে। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনী সীমিত আকারে সর্ব প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ১৯৯৩ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ জুন বাংলাদেশে প্রথম অন-লাইন ইন্টারনেট চালু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করছে বলে জানা যায়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগের পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্ক এলিয়ট জাকারবার্গ ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক নামের নেটওয়ার্কটি প্রতিষ্টা করেন। জাকারবার্গ ছিলেন হাভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। প্রথম দিকে ফেসবুক নেটওয়ার্কটি হাভার্টের ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে এর পরিধি বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালের শুরুতে সারা বিশ্বে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল  ১৩৯ কোটি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত  সারা পৃথিবীতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৪ কোটি ৭০ লাখে। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী ইউটিউব ব্যবহারকালরি সংখ্যা হলো ১৫০ কোটি, হোয়াটসঅ্যাপ ১২০ কোটি, ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জার ১২০ কোটি এবং উইচ্যাট ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা ৯৩ কোটি ৮০ লাখ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অন্য দেশের তুলনায় মোটেই পিছিয়ে নেই বরং আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত ফেসবুক শুরু হহয় ২০০৬ সালে। আমাদের দেশে ২০০৯ সালের জানুয়ারীতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার। ২০১২ সালের জানুয়ারীতে ২৩ লাখ, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৩৩ লাখ, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৬৮ লাখ, ২০১৪ সালের অক্টোবরে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৪ লাখে। যার মধ্যে পুরুষ ব্যবহারকারীর সংখ্যা  ৮২ লাখ এবং মহিলা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ লাখ। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের জরিপ অনুযায়ী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করছে। ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০ কোটিতে। বর্তমানে সংবাদের অন্যতম উৎস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক। সংবাদের জন্য সংবাদপত্র, টেলিভিশনের উপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সংবাদের জন্য অনলাইন মিডিয়ার উপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের তিন চতুর্থাংশ নাগরিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই সংবাদ সংগহ করে থাকে। বাংলাদেশের মানুষও আজ আর আগের মতো সংবাদের জন্য সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারের উপর  একেবারে নির্ভরশীল নয়। অনলাইন মিডিয়া, ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম থেকে সংবাদ সংগ্রহের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ভার্চুয়াল জগতে এদেশের তরুণ সমাজ অনেক এগিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমের উপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করে চলছে। অনেক সময় দেখা যায় বহুল প্রচারিত ও প্রতিষ্টিত সংবাদপত্র  টেলিভিশনগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ না করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত আগ্রহে সংবাদ বা ঘটনাটি প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এক পর্যায়ে জনমতের চাপে মূল ধারার গণমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত সংবাদটি তথ্যবহুল করে প্রকাশ ও প্রচার করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক  সময়ের চাঞ্চল্যকর সংবাদগুলো মানুষ সর্বপ্রথম জানতে পেরেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে। ফেসবুকের মাধ্যমেই সাড়া জাগানো খবরগুলো সবার আগে মানুষ জেনে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে নৃশংস ও লোমহর্ষক ঘটনা গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা। জঙ্গিদের নারকিয় তান্ডব  ও জঘন্য হত্যাকান্ডের দৃশ্য এদেশের  মানুষ সবার আগে জানতে পেরেছে ফেসবুকের মাধ্যমে। পাশের এক ভবন থেকে কোরিয়ার নাগরিকের ফেসবুকে প্রচারিত ছবি সারাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে এ তথ্য গণমাধ্যম লুফে নেয়। সিলেটে কিশোর রাজনের কথা এখনো কেউ ভুলে যায় নি। পাষন্ডরা পায়ুপাথে পাম্প  করে বাতাস ঢুকিয়ে রাজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজনের হত্যাকান্ড নিয়ে সবার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সোচ্চার ও প্রতিবাদি হয়ে ওঠে। ফেসবুকে এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হয়। সৃষ্টি হয় সামাজিক প্রতিক্রিয়া। ফেসবুকের কারণেই পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো রাজন হত্যাকান্ড নিয়ে সিরিজ সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে অপরাধিরা বিচারের আওতায় আসে। কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যা, পুলিশ সুপারের স্ত্রীকে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা-দুর্ঘটনা মানুষ প্রথম জানতে পারে সামাজিক যোগযোগের মাধ্যমে। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের হাতে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মার্ট ফোন  ও আই ফোন শোভা পাচ্ছে। এসব স্মার্ট মোবাইল ব্যবহারকারী স্বাধীনভাবে যেকোন তথ্য, ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণ করে  ফেসবুকে তাৎক্ষণিক শেয়ার করতে পারছেন।  কোন টেলিভিশন বা পত্রিকার সংবাদ কর্মীদের জন্য অপেক্ষা না করে নিজের মতো করে নিজ দায়িত্বে প্রতিনিয়তই নানা ঘটনা ফেসবুকে প্রচার করছেন। ফেসবুকের এসব তথ্য সাংবাদিকদের নিউজের জন্য অন্যতম উৎস।  মূল ধারার সাংবাদিকদের চেয়ে দ্রততম সময়ের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা তথ্য প্রচার করছেন।  পত্রিকা বা টেলিভিশনের পক্ষে নানা কারণে তাৎক্ষনিকভাবে অনেক খবর প্রচার করা যায় না। মিডিয়ার কর্মীদের ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই ফেসবুকের কল্যাণেই মানুষ জানতে পারে খবর।  ফেসবুকের কল্যাণে তোলপাড় ও ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার কওে পাঠকদের আরো তথ্য দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। আর সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল, টেলিভিশন, চ্যানেলে প্রচারিত বা প্রকাশিত সংবাদ ভিডিও স্থিরচিত্র  শেয়ার, লাইক, কমেন্ট করে প্রচার করছে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে নানা চাপ ও সীমাবদ্ধতা থাকে। এসব কারণে গণমাধ্যম ইচ্ছা করলে সব ঘটনা তুলে ধরতে পারে না। পত্রিকা ও টেলিভিভশন চ্যানেলের মালিক পক্ষের স্বার্থের কারণে অনেক ঘটনা পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাপ ও কর্তৃপক্ষের কারণে প্রচার ও প্রকাশে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা স্বাধীনভাবে যেকোনো তথ্য বা ঘটনা বন্ধুদের নিকট শেয়ার করতে পারে। তাই ফেসবুক তথা সোস্যাল মিডিয়া বর্তমানে সংবাদ প্রচার ও প্রকাশের জন্য জনপ্রিয় মাধ্যম। বর্তমান যুগ সোস্যাল মিডিয়ার যুগ। সামাজিক যোগযোগের কারণেই ঠিকে থাকা পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বর্তমানে নিজস্ব পেইজ খুলছে। পাঠক ফেসবুকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খবর জানছেন এবং প্রয়োজনীয় শেয়ার, লাইক, কমেন্ট করতে পারছেন। প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে সোস্যাল মিডিয়া দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন গণমাধ্যমের বিকল্প হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। পাঠক শ্রোতা ধরে রাখার জন্য অনলাইন খুলতে বাধ্য হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ার প্রভাব জানতে পেরে হয়তো অনেকের প্রশ্ন জাগতে পারে গণমাধ্যমের প্রভাব কি শেষ হয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমাদের যৌথ পরিবার নিয়ে দু’টি কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। বর্তমানে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার সৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন জাগতে পারে পরিবার প্রথা কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? এ প্রশ্নের জবাবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী জোর দিয়ে বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার সৃষ্টি হলেও পরিবার আদিতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষৎতেও মানুষের প্রয়োজনে টিকে থাকবে। এ কথার সূত্র ধরে বলতে চাই, মানুষের প্রয়োজনে ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম  পরিবর্ধিত  পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞানের আলোকে আপন মহিমায় ঠিকে আছে এবং ঠিকে থাকবে। সোস্যাল মিডিয়ার কারণে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতারের জনপ্রিয়তা ভবিষৎতে ভাটা পড়বে এমন চিন্তার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। কারণ গণমাধ্যমের এই অবস্থা একদিনে গড়ে ওঠেনি। শত শত বছরের সাধনা এবং অনেক প্রচেষ্টায় সংবাদকর্মীর নিরলস কন্টকাকীর্ণ পথ পরিক্রমা অতিক্রম করে প্রচেষ্টায় চলতে হচ্ছে। পেশাধারী সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি  ও নতুন নতুন কর্ম কৌশলের উপর ভিত্তি করে  গণমাধ্যম সমহিমায়  সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।  তবে গণমাধ্যমকে আরো জনবান্ধব হওয়া চাই। তথ্য প্রযুক্তিকে নির্ভূল ভাবে জনসম্মুখে তুলে আনতে হবে। এক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ট সংবাদের বিকল্প নেই। সরকারি বেসরকারি সবগুলো সঠিক খবর জনগণকে জানানো সংবাদ মাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব। সংবাদে পক্ষপাতিত্ব ও ভুল তথ্য পরিবেশণ থেকে বিরত থাকা চায়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জনবান্ধব প্রচার ও প্রচারণা জনগণের কাম্য। সংবাদ মাধ্যমে  বিনোদন  উন্নয়নমূলক অগ্রগতি জাতীয় স্বার্থকে অবশ্যই গুরুত্বে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশীয় সংস্কৃতি ও অগ্রগতি তুলে ধরা চায়। যেহেতু সংবাদ সাংবাদিকতা দেশ ও জাতির স্বার্থে, সেহেতু সাংবাদিক পেশার সাথে যুক্ত সকলকেই জাতীয় স্বার্থ অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply