বাংলাদেশ, রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২০ ইং, ২২শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে রায় বাস্তবায়ন হোক

মাহমুদুল হক আনসারী

পৃথিবীতে মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী চরমভাবে নিফড়িনের শিকার হয়েছে, সেটা আরেকবার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো। রাখাইনে দফায় দফায় নির্মমভাবে সে অঞ্চলের শত বছরের একটি জাতিগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র ২০১৭ সালে পরিচালনা করেন সে দেশের সেনাবাহিনী। তখন শিশু, নারী , পুরুষ ও সব বয়সের মানুষের উপর চরমভাবে নির্যাতন পরিচালিত হয়। নারী পুরুষকে জলন্ত আগুনে পুড়ে মারা হয়। যুবতি নারীদের শ্লীলতাহানি করা হয়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। অসংখ্য মানুষকে তখন কেটে কেটে টুকরো টুকরো করে উল্লাস পর্যন্ত উদযাপন করেছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগণের কোনো দিকে আশ্রয় পাওয়ার মতো জমি ছিল না। পুরো মায়ানমার জুড়ে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গেরাও করে পাড়ায় মহল্লায় তাদের ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। সহায় সম্পত্তি সবকিছুর কিছুই তাদের হাতে ছিল না। তখন তারা হয়ে পড়ছিল অসহায় নির্যাতিত বস্তুভিটা হারা এক অভাগা জাতি। আশপাশের প্রতিবেশী দেশ তখন শুধু তামাশাই দেখছিল। কেউ তাদের পাশে এগিয়ে আসে নি। সে করুণ মানবতাবিরোধী জঘন্য জাতি বিধ্বংসী ইতিহাসের বর্বোচিত এ কার্যকলাপের গভীর নিন্দা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। সেদিন আশ্রয়হীন লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশু নারী বস্তুভিটাহারা মজলুম মানুষগুলোকে মানবিক কারণে বাংলাদেশ বর্ডার খুলে দিয়ে তাদের আশ্রয় প্রদান করে। বাংলাদেশ ভ্রাতুপ্রতিম দেশের সাথে সর্বদা সু সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। সর্বদা দ্বিপাক্ষীক আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সু সম্পর্ক রাখতে চায়। বাংলাদেশ কারো সাথে বৈরী আচার আচরণ করার মাধ্যমে সম্পর্কের অবনতি আশা করে না। সেদিন যদি লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় না দিত তাহলে হয়তো একজন রোহিঙ্গা মানুষকেও জীবন্ত দেখা যেতো না। নিষ্টুর আমানবিক অত্যাচারী জালিম অং সান সুচি যে বর্বোচিত নির্যাতনের ও নিপীড়নের মাধ্যমে যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর চালিয়েছে সেটা একটু সময় বেশি হলেও পৃথিবীর শাসকগোষ্ঠী দেখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার, সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবতার দরদী বঙ্গবন্ধু কন্যা ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গা লাখ লাখ নারী শিশুকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর বুকে মানবতাবাদী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে রোহিঙ্গাদের যে ঢল এবং শিবির তৈরী হয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজার টেকনাফ অঞ্চলে, সেটা দেখতে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যারা তাদের দেখে যায় নি। মজলুম এ মানুষগুলোর খাওয়া দাওয়া স্বাস্থ্য চিকিৎসা সেনিটেশনসহ সব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার অতি যতœ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে তাদের পরিচর্যা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নৈপুণ্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কক্সবাজার এলাকার জনগণ তথা বাংলাদেশের জনগণ রোহিঙ্গা জনগণের পাশে সার্বিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে নয়, মানবিক কারণে একটি জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতেই বাংলাদেশ ও তার জনগণ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সেদিন থেকে অদ্যাবধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝাতে চেষ্টা করেছে যে, রোহিঙ্গারা নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার। ধর্মীয় কারণে তাদের উপর এ নির্যাতন। শত বছরের কাগজে দলিলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মায়ানমারের বৈধ নাগরিক সেটা প্রমাণিত ও দালিলিক। তবুও তারা যখন নির্যাতিত সে দেশের অত্যাচারী সামরিক জান্তার শোষনে। বাংলাদেশ সরকার উদ্বাস্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে মায়ানমার সরকারের প্রতিনিধির সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। কয়েক দফা বৈঠকে প্রস্তাব আর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার উপর। কিন্তু মায়ানমারের সামরিক জান্তা সেসব চুক্তি ও বক্তব্য বাস্তবায়ন করছে না। চালবাজ কূটচাল মায়ানমার যেনো তেনোভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশেই রেখে দিতে চায়। নানা কর্মকৌশলে রোহিঙ্গা বিশাল এ জমিকে জন বিচ্ছিন্ন করে মায়ানমার ইতিমধ্যে সেখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে শক্তিশালী কয়েকটি দেশের সাথে চুক্তি করারও তথ্য জানা যায়। উন্নত উর্বও এ জমি খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ একটি এলাকা বলে জানা যায়। সে যাই হোক, কিছু সময় দেরীতে হলেও বিশ্ব বিবেক এখন মায়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতিত জনগণের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মায়ানমারকে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। সাথে রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে যে সখল রোহিঙ্গা বাস করছেন তাদের সুরক্ষা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ ও দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডের হ্যাগে স্থানীয় সময় সকাল দশটায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল তিনটায়) আন্তবর্তী নির্দেশ বিষয়ক এ রায় দেন আইসিজের প্রেসিডেন্ট আব্দুল কাওয়াই আহমেদ ইউসুফ। এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে তিনি রায় ঘোষণা করেন। আইসিজের অফিসিয়াল ওয়েবাসাইটে রায়টি সম্প্রচার করা হয়। গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর ৩ দিনব্যাপী নেদারল্যান্ডসের হ্যাগে এ মামলার শুনানি হয়। এতে মিয়ানমারের পক্ষে স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি উপস্থিত ছিল। সেসময় সুচি রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে। আদালতের মাধ্যমে জানা যায়, গণহত্যা কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরোদ্ধে মামলা করার অধিকার রাখে। ডিসেম্বরে মামলার শুনানিতে সুচি বলেন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির বিরোদ্ধেই মূলত ২০১৭ সালে রাখাইনে সেনা অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এসব বক্তব্য অং সান সুচির ছিল। মূলত আত্মপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে সুচির উপরোক্ত বক্তব্য। সেটা আদালত গ্রহণ করে নি। আদালত বলেছে ২০১৭ সালে মিয়ানমার যে সেনা অভিযান চালায় তাতে হাজার হাজার নিরীহ শান্তিকামী মানুষ শিশু নারী নির্মমভাবে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের বক্তব্য সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা জনগণ পাশ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। ব্যাপক হারে হত্যা ধর্ষণ খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য ও গণহত্যা কনভেনশনে উল্লেখিত গণহত্যার সংজ্ঞা অনুসারে মিয়ানমারে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর যে নিপীড়ন নির্যাতন সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে তা গণহত্যার সাথে সাদৃশ্য পূর্ণ বলে জানান আদালত। এখনো মিয়ানমারে ৬ লাখের অধিক বিপন্ন রোহিঙ্গা আছে বলে আদালত জানিয়েছে। আদালত ৪টি অন্তবর্তী নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ বাস্তবায়ন চায় বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ। বাংলাদেশ উদ্বাস্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অন্যায় করে নি। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু মানবপ্রিয় মানবদরদী ছিলেন। তিনি বাঙালী জাতিকে মুক্ত করতে স্বাধীণতার ডাক দিয়েছিলেন। এবং ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ বাংলাদেশ শোষণ জুলুম আর নিযার্তন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বাংলাদেশ সবসময় নির্যাতিত নিষ্পেষিত মজলুম ও মানবতার পক্ষে কথা বলে। বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরী তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও মানবতার পক্ষের একটি আদর্শের নাম। তাই তিনি নির্যাতিত রোহিঙ্গা মজলুম মানুষের পক্ষে থেকে তাদেরকে বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় দিয়েছেন। আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব। গোটা পৃথিবীর মালিক সৃষ্টিকর্তা। সমস্ত সৃষ্টির রক্ষাকারী তিনিই। তাঁর হুকুম ইশারা ছাড়া কিছুই এদিক ওদিক হবে না। সুতরাং পৃথিবীর মানুষ সে যে অঞ্চলেই থাকুক না কেনো, তাকে নিরাপত্তা, মানবতা ও নাগরিক অধিকার দেয়া সে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই উদ্বাস্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক নৈতিক ও নাগরিক সব ধরনের অধিকার দিয়ে তাদের ফেরত নেবেন সে প্রত্যাশা রাখছি মায়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply