বাংলাদেশ, রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিপদে পড়ার আগেই হতে হবে সচেতন বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এনে দেবে সুফল – সনাতন চক্রবর্তী বিজয়

 

নদীমাতৃক বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশে পানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার প্রায় সবটাই নির্ভর করছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে সহজে পানি পাওয়া নিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহর মারাত্মক ভূমিধসের ঝুঁকির মুখেও পড়ছে। অথচ সত্তরের দশকের আগে দেশের মানুষের কাছে সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল ভূপৃষ্ঠ, পুকুর, নদী-খাল, বৃষ্টি আর জমিয়ে রাখা পানি। সত্তরের দশকের শুরুতে কৃষিকাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপকতা পায়। সেই যে শুরু এরপর আর থামেনি। গত চার দশকে দেশে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় শতভাগ। খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচ, এমনকি দৈনন্দিন কাজেও ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নিভর্রশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। এখন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পানিই মেটাতে হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে। আর অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে এই পানি উত্তোলনের ফলে রাজধানী ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।

পানির মূল উৎস বৃষ্টি, আর গৌণ উৎস ভূগর্ভস্থ পানি। বৃষ্টির পানি মাটির নিচে যাওয়ার আগে সংরক্ষণকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) বলে। আর্সেনিক এলাকায় বৃষ্টির পানির ব্যবহার জরুরি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা থেকে রক্ষা পেতে হলে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে হবে। বৃষ্টির পানির সুবিধা হচ্ছে, এর মান ভালো ও হাতের নাগালে পাওয়া যায়। যদি আমরা আমাদের মূল উৎসকে অবহেলা করে গৌণ উৎসের পানি ব্যবহার করতেই থাকি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে এক হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। এসব অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ সুফল দেবে। আমাদের বেশির ভাগ পানির কাজই বৃষ্টির পানি দিয়ে করতে পারি। বাংলাদেশে গড়ে ২৪৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ঝুঁকি বিবেচনায় দেখা গেছে, বৃষ্টির পানিতে অসুখ-বিসুখের ভয় কম। ভবনের নিচে অথবা ছাদে টেকইস রিজার্ভার স্থাপন করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা সহজেই ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে জমিয়ে রাখা পানির একটি অংশ পাইপের মাধ্যমে মাটির গভীর স্তরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। পাশের দেশ ভারতের আহমেদবাদসহ ইউরোপের অনেক দেশে এই পদ্ধতির সফলতা রয়েছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে। ভারতের রাজস্থানসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে পানির স্বল্পতা রয়েছে। তবে ভারত সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে আইনও সেভাবে করা হয়েছে। চেন্নাইসহ অনেক রাজ্যে অনেক ক্ষেত্রে এর সুফলও এসেছে ।

পানি ভূগর্ভে যাওয়ার উপায় দুটি। একটি বৃষ্টির পানি আর অন্যটি ভূ-উপরিভাগের জমে থাকা (পুকুর, খাল, নদী প্রভৃতি) পানি চুইয়ে চুইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করা। বাংলাদেশ এবং ভারতে আগে বৃষ্টির পানি থেকেই ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হতো। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। নানান প্রতিবন্ধকতার কারনে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে কম মাত্রায় প্রবেশ করে। সেক্ষেত্রে একমাত্র উপায় ভূ-উপরিভাগের জমে থাকা পানি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি শহরগুলোতে এখন পুকুরের সংখ্যা নিতান্তই কম। আমরা প্রায় সকল পুকুর ভরাট করে ফেলেছি। বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ করতে পারলে বর্ষাকালে বন্যা এড়ানোও সম্ভব। এমতাবস্থায় ভূ-গর্ভস্থ পানির উপরে চাপ কমানো এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করার বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট। সম্প্রতি রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে সরকার উপায় খুঁজছে বলে সাংবাদিকদের জানান মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। সরকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। রাজধানীসহ সব বড় বড় শহরে বহুতল ভবনগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা যাতে রাখা হয় তার জন্য আইন করা হচ্ছে। সরকারের স্বদিচ্ছা থাকা সত্তেও ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবে এ সমস্যা ক্রমশঃ ঘনিভূত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবহার জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ভাবনা একটা সময়োপযোগী বিষয়। গ্রামাঞ্চলে পুকুরে এবং শহরে বাড়ির ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বহুতল ভবনগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিষয়ে বেশ কয়েকটি ডেভেলোপার প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে ঢাকা ও চট্রগ্রামে। কিন্তু এ সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া সম্ভবপর আবাসন প্রকল্পগুলোতে জলাশয় ও খোলা জায়গার পরিমান বাড়ানো যেতে পারে। এর ফলে ভূ-গর্ভে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারে। পুকুর, জলাশয়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাগুলোতেও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হলেও সেগুলোর ঠিক মতো ব্যবহার হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। অনেকের মতে এটি ব্যয় সাপেক্ষ। কিন্তু বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা খুব ব্যয় সাপেক্ষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটা জেনারেটর স্থাপনের খরচের চেয়েও এর খরচ কম হয়। এ বিষয়ে আরো ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা দরকার।

আমাদের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৫টি জেলার পানির স্তরই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ করা ছাড়া উপায় নেই। শুধুমাত্র সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে কিংবা দোষারোপ না করে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং মাটিতে বৃষ্টির পানির প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা ক্রমাগত পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারনে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিধ্বস হতে পারে। বিপদে পড়ার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন ।

আরো খবর

Leave a Reply