বাংলাদেশ, বুধবার, ১২ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পাখি নিধন :মনুষ্যত্বহীনতা ও অমানবিকতার নিদর্শন

 

আজহার মাহমুদ

শীত এলেই অতিথি পাখি বা পরিযায়ী পাখি জীবন বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশেও আসে। কিন্তু প্রতিবছর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে পাখিগুলো আমাদের দেশে বাঁচতে আসে, সেই পাখিদের নিরাপত্তা সরকারিভাবে দেওয়ার বিধান থাকলেও কার্যত তা হয় না। শিকারিদের শ্যেনদৃষ্টির কারণে প্রতি বছর এসব অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। শরত্ ও হেমন্তে ইলিশ ধরার জন্য আমাদের দেশে জেলেপাড়ায় যেমন সাজ সাজ রব পড়ে যায়, তেমনি শীত এলে চোরাগোপ্তা পাখি শিকারিদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। শিকারিরা হাজার টাকার ফাঁদ, জাল তৈরি করে প্রস্তুত থাকে শীতের আগে থেকেই। বিভিন্ন উপায়ে তারা শিকার করে অতিথি পাখি। বিভিন্ন চরাঞ্চলে ধানের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে, কারেন্ট জাল দিয়ে পাখি নিধন করা হচ্ছে। কেউ কেউ মাছের ঘেরে ফাঁকা যায়গায় দেশি হাঁস পানির ওপর জড়ো করে রাখে, পাখি হাঁসের ডাক শুনে পানিতে নামতে শুরু করে, তখন পেতে রাখা ফাঁদে আটকে যায়। অনেকে এখন বিভিন্ন হাইড্রোলিক হর্ন পাখি ধরার কাজে ব্যবহার করছে। মুক্ত ফাঁকা জলাশয়ে ফাঁদ পেতে তারা হর্ন বা বাঁশি বাজালে পাখি জলাশয়ে নামতে শুরু করে এবং ফাঁদে আটকে যায়। এ ছাড়া বড়ো বড়ো বাঁশবাগান, গোলবাগানে রাতে পাখি বসে থাকলে এয়ারগান অথবা সুচালো শিক দিয়ে পাখি শিকার করা হয়। এমনিভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার অতিথি পাখি আর ফিরতে পারে না তাদের নিজস্ব বাসভূমে। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে এসে তারা রসনাতৃপ্তির জন্য উঠে যায় বাঙালির ভাতের থালায়। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে! আসলে অমানবিকতার সবচাইতে বড়ো নিদর্শন এখানেই!

হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসতে অনেক পাখি অসুস্থ হয়ে এমনিতেই মারা যায়। তার ওপর রয়েছে শিকারির লোলুপ দৃষ্টি। সম্প্রতি জানা যায়, অতিথি পাখির মাংসের চাহিদাও দিনে দিনে নাকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিপজ্জনক চাহিদা থেকে খাদকদের ও পাখি নিধনকারীদের দূরে না রাখতে পারলে মারাত্মক হুমকিতে পাড়বে অতিথি পাখি। বাড়বে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা। একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে অতিথি নামক পাখিগুলো। তাই আইন শুধু কাগজে-কলমে থেকে গেলে হবে না। এদের রক্ষা করার জন্য জনসচেনতামূলক কার্যক্রম এখন থেকেই বাড়াতে হবে। তা না হলে ক্রমান্বয়ে অতিথি পাখির আগমন আমাদের দেশে কমে যাবে। পাখি ও পরিবেশবিষয়ক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় আমাদের দেশে অতিথি পাখির সংখ্যা কমেছে ৪০ শতাংশ। অনেকেই আবার এর কারণ হিসেবে দায়ী করছেন ঘনবসতি, দূষিত পরিবেশ, শিকারিদের থাবা এবং খাদ্যের অভাবকে।

‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ অনুযায়ী পাখি শিকার, হত্যা, আটক ও ক্রয়-বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ। এর শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু এর প্রয়োগ আমরা খুব একটা দেখতে পাই না বললেই চলে। তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশও হতে পারে পাখির বড়ো অভয়াশ্রম।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অতিথি পাখিরা আমাদের মেহমান। তাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এরা অন্যান্য প্রাণীর উপকারেও আসে। প্রাকৃতিক ভারসম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে অতিথি পাখি বিরাট ভূমিকা রাখে। প্রকৃতিবান্ধব এসব পাখি শুধু নিজেরা বাঁচতে আসে না, এরা জলজ পোকা, ধানের পোকা খেয়ে কৃষকের উপকার করে থাকে। পাখি প্রকৃতি ও মানুষের পরম বন্ধু। পাখির ডাকে ভোর হয় আবার পাখির কলকাকলিতে পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে। কোনো কোনো পাখি প্রহরে প্রহরে ডেকে আমাদের প্রকৃতির ঘড়ির কাজ করে থাকে। তাই আসুন, সবাই মিলে পাখি নিধন রোধ করি। অতিথি পাখিদের বিচরণের জন্য আমাদের দেশে অভয়ারণ্য সৃষ্টি করি। মনে রাখতে হবে, অতিথি পাখি রক্ষার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply