বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং, ১০ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আবছার উদ্দিন অলি

ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য  বলতে পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতিকে বোঝায়। এগুলো মূলত ভোক্তার বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন- ফ্রিজ, ক্যামেরা, মাইক্রোওয়েভ, কাপড় ধোয়ার ও শুকানোর যন্ত্র, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের নিয়মনীতিহীন ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ থেকে মানবস্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং পরিবেশ দূষণ হতে পারে। কম্পিউটারের সিপিইউ বা কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রাংশটির মত কিছু কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে সীসা, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, ইত্যাদির মত ক্ষতিকর পদার্থ থাকা সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশের ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত শ্রমিক সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেক বেশি। এ সমস্ত বর্জ্য পুন:চক্রায়ন প্রক্রিয়াতে শ্রমিকেরা ভারী ধাতুর সংস্পর্শে যেন না আসে, সে ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান হওয়া উচিত। ২০১৪ সালে জাপানে অবস্থিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়  একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বলা হয় যে বিশ্বে প্রতিবছর ৪ কোটি টনেরও ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীন এই দুইটি দেশ সারা বিশ্বের ই-বর্জ্যরে এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। এইসব ই-বর্জ্যে অনেক অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ ধাতু ও অন্যান্য উপাদান আছে, যেগুলি পুন:চক্রায়ন করা সম্ভব। লোহা, তামা, সোনা, রূপা, অ্যালুমিনিয়াম, প্যালাডিয়াম ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য অন্যান্য উপাদানগুলির মোট মূল্য ৫২০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি।

দেশে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি, টিভি, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, মুঠোফোন, বিচিত্র ধরনের ইলেক্ট্রনিক খেলনা এখন আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি। এসব পণ্য ব্যবহারের পর এক সময় নষ্ট হয়ে যায়। বিক্রি করা হয় পরিত্যাক্ত জিনিসের ভ্রাম্যমাণ ক্রেতা তথা ভাণ্ডির কাছে। কখনও ফেলে দেয়া হয় বাড়ির আশপাশে। কখনও বছরের পর বছর পড়ে থাকে মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান ও ভাণ্ডারীর দোকানে। এসব বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোন ডাস্টবিন কিংবা ভ্যান গাড়ী নেই। এ বর্জ্যের নামকরণ করা হয়েছে ই-ওয়েস্ট বা ই-বর্জ্য। এগুলোর ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এদেশের ব্যবহারকারীদের ধারণা ও সচেতনতা খুবই সীমিত। আশঙ্কার বিষয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ই-বর্জ্য একটা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে, যা সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

ই-বর্জ্যর কারণে ঘটছে জলবায়ুর পরিবর্তন। এটা বিশ্বব্যাপীই ঘটছে। এই বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে যাচ্ছে। এসব যন্ত্রপাতিতে মানবস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বহু ক্ষতিকর উপাদান থাকে। সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, লিড অক্সাইড প্রভৃতি ধাতব ও রাসায়নিক উপাদান মানুষের স্বায়ুতন্ত্র, যকৃৎ, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, ত্বক ইত্যাদির জন্য ক্ষতিকর। উন্নত দেশগুলো ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনও তা কোন ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারেনি। দেশে এসব বর্জ্য পরিশোধনের সে রকম কোন ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। এমনকি বছরে কী পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে তারও নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য নেই। তাই ই-বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরী। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ই-বর্জ্যকে একটি সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সচেষ্ট। এজন্য একটি খসড়া নীতিমালাও তারা প্রণয়ন করেছে। যাতে প্রয়োজন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। যাতে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়। প্রথমেই প্রয়োজন ই-বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ নিরূপনের ব্যবস্থা করা। এগুলোর জন্য স্থায়ী ভাগাড় ও রিসাইক্লিং কারখানা স্থাপন করা দরকার। জনসচেতনতা বাড়ানো এক্ষেত্রে খুবই জরুরী।

সবার আগে দরকার ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি উৎপাদন, আমদানি, বিপণন, ব্যবহার এবং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইন প্রণযন। ই-বর্জ্যর মধ্য অনেক বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিক যৌগ আছে, যা রোদে এবং তাপে নানাভাবে বিক্রিয়া করে। অনেক সময় রোদে ফেলে দেয়া ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ (আইসি) থেকে নির্গত হয় ক্ষতিকর বিকিরণ। এই ই-বর্র্জ্য পানিতে ফেলে দিয়ে ও মাটিতে পুঁতে রেখে দেয়ার পরও বিষাক্ত থাবা বন্ধ থাকে না। পলিব্যাগ যেমন মাটির নিচেও বিষক্রিয়া করে। এসব ই-বর্জ্য তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে বিক্রিয়া করে, যা মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বিপজ্জনক। অটিজম ও মানসিক বিকাশ না হওয়ার কারণও ই-বর্জ্য। শিশুদের মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ছে।

মায়েদের স্তনের ক্ষতি হচ্ছে। উন্নত দেশে ই-বর্জ্যরে পন্ডাস্টিক অংশ আলাদা করে রিসাইক্লিং করা হয়। বাকি বর্জ্য বিশেষায়িত ভাগাড়ে ফেলা হয়।

উন্নত দেশে কোন ইলেকট্রনিক পণ্য সামান্য নষ্ট হলে বাড়ির বাইরে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলা হয়। দরিদ্র দেশের লোকজন তা সংগ্রহ করে নিজেদের দেশে পাঠায়। এভাবেও উন্নত দেশের লোকজন কৌশলে বর্জ্য পার করে দিচ্ছি। বাংলাদেশে রিসাইক্লিং ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। বিলম্বে হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা করা হচ্ছে। বর্জ্য ঝুঁকি থেকে উত্তরণের পথ দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে হবে।

আরো খবর

Leave a Reply