বাংলাদেশ, সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

প্রসঙ্গ: দূরারোগ্য চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় সাহায্য

মাহমুদুল হক আনসারী
প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা, সরকারি, বেসরকারিভাবে সাধ্যের মধ্যে চলছে। যাদের পক্ষে অর্থ বিনিয়োগ করে শিক্ষা, চিকিৎসা গ্রহণ করার মতো সামর্থ্য আছে তাদের কথা বলার উদ্দেশ্য নয়। বিশাল জনগণের এদেশ, এখানে ধনী গরিব, দরিদ্র, হতদরিদ্র অসংখ্য মানুষের বসবাস। যারা দৈনন্দিন কর্ম করে আয় রোজগারের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে তাদের পক্ষে জটিল কঠিন দূরারোগ্য রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করা সোনার হরিণের মতো।

দেশে চিকিৎসা ও শিক্ষা কার্যক্রম দিন দিন অগ্রসর হলেও দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য তা দুষ্প্রাপ্য। অর্থ আছে তো শিক্ষা আর চিকিৎসা মিলবে। অর্থ যার নাই তার জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা কোনোটাই নাই। এটা বাস্তব এবং সত্য কথা। তাহলে দেশে যে পরিমাণ আধুনিক উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠছে সেখানে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী ছাড়া অপরাপর মানুষগুলো অর্থ কষ্টে চিকিৎসা নিতে পারছে না। শিক্ষার ক্ষেত্রেও মুষ্টিময় কিছু সম্পূর্ণ সরকারি প্রতিষ্টানে যেসব ছাত্রছাত্রী সুযোগ পায়, অন্যরা হয়তো ঝরে পড়ে অথবা বাড়ি ভিটা বিক্রি করে বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে হয়। কিন্তু এটা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরিবারের পক্ষে হয়ে উঠে না। ফলে ঝরে পড়া যুবকরা হতাশায় নানা সমাজবিরোধী রাষ্ট্র পরিপন্থি কর্মকান্ডে জড়িয়ে যায়। হয়ে পড়ে তারা পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের আশঙ্কা।

একইভাবে যাদের কঠিন জটিল রোগের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার সামর্থ্য থাকে না তারা ধুকে ধুকে মৃত্যু কোলের যাত্রী হয়। তখন রোগির সহায়, সম্বল, পরিবার সব নি:শেষ হয়ে পড়ে। রোগির পরিবার পরিজন সন্তানাদি থাকলে তখন তারা সম্পূর্ণভাবে নি:স্ব হয়ে যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে দু:খ ও বেদনাদায়ক আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। রোগ ব্যাধি এটা কাউকে বলে কয়ে আসে না। কার কখন কি রোগ হয়ে যায় সেটা কেউ বলতে পারে না। বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা কর্মকান্ড, খাদ্য গ্রহণ ও ত্যাগসহ সামাজিক নানা নিয়ম অনিয়মের কারণে দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জটিল রোগের সম্মুখীন হচ্ছে। এটা রোগির কারণে হচ্ছে সেটা বলা যাবে না। পরিবেশ পরিস্থিতি সবকিছুর নানা কারণে এসব রোগ ব্যাধির জন্ম। সুতারাং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকেও এসব জটিল রোগিদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা চায়। রাষ্ট্র যেভাবে জনগণের জন্য নানামুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড করে থাকে, অনুরূপ জটিল রোগিদের চিকিৎসা প্রাপ্তি সহজ ও আর্থিক সাহায্যের অনুকূলে রাখা চায়। দেশে রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি জেলা শহরে দূরারোগ্য ও কঠিন রোগের চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা নেয়ার মতো দেশের কয় পার্সেন্ট মানুষের সামর্থ্য আছে সেটা রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে। সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি যদি কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়, তখন তাকে চিকিৎসার জন্য দেশে ও বিদেশে প্রচুর অর্থ খরচ করতে দেখা যায়। হয়তো তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের মানুষ। তাই তার জন্য এতো প্রাপ্তি। কিন্তু যিনি এদেশের নাগরিক যার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সরকার, সে নাগরিকের চিকিৎসা প্রাপ্তি কতটুকু রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারল সেটাও সরকারকে গভীরভাবে ভাবা দরকার। তাদের জন্য কতটুকু চিকিৎসা ও উচ্চতর শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়ন করা গেল এসব জনগণের গভীর ভাবনা।

দেশের গাঁ গ্রামের হাজারো মানুষ চিকিৎসা অভাবে শয্যাশায়ী হয়ে বছরের পর বছর মৃত্যুর প্রহর গুণছে। এটা গুরুত্ব সহকারে ভাববার বিষয়। গ্রাম এলাকায় যেসব চিকিৎসা বর্তমানে প্রচলিত আছে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসায় পাওয়া যায়। উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হলে একজন রোগিকে শহরে আসতে হয়। আর শহরে আসা যাওয়া চিকিৎসা নেয়া দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে পড়ে না। রাষ্ট্রের অনেকগুলো উন্নয়ন খাতে লাখো কোটি টাকা খরচ করা হয়। সেক্ষেত্রে দূরারোগ্য রোগিদের চিকিৎসায় একটা বাজেট রাখা যেতে পারে। তাদের জন্য সরকারি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্টানে সহজতর চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে। যেভাবে সরকারি চিকিৎসায় ও শিক্ষা প্রতিষ্টানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর একটি শ্রেণীর জন্য সুযোগ সুবিধা রাখা হয়েছে, সে ধরনের সুযোগ যেনো এদেশের গরিব দু:খী অসামর্থ্য রোগিদের জন্য রাখা হয়। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে সামর্থ্যহীন রোগিদের যেনো চিকিৎসা দেয়া হয়। রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে তার নাগরিকের কঠিন রোগের চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশে বড় বড় রোগের জন্য রোগিকে আর্থিক সাহায্য ও চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা রেখেছে।

আমাদের দেশে দু একটি সংস্থা অনেক আবেদন নিবেদনের পর দু একজনকে সামান্য সাহায্য দিতে দেখা যায়। কিন্তু এটা বলার মতো কোনো সাহায্যের মধ্যে পড়ে না। একজন কিডনী রোগি তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। তাকে যদি ৫০ হাজার টাকার সাহায্য দেয়া হয় সেটা কোনো হিসাবের মধ্যে পড়ে না। এ জাতীয় জটিল রোগিদের জন্য সরকারি বেসরকারিভাবে চিকিৎসা ও অর্থ প্রাপ্তি থাকা চায়। রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ যেভাবে অর্থের জোরে চিকিৎসা এবং উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে সেটা আরো সম্প্রসারণ সহজলভ্য করতে হবে। দেশের আপামর জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে জনগণের নাগালে আনতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা চিন্তা চেতনা আরো গতিশীল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্টিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যেভাবে পাচ্ছে সে অধিকার রাষ্ট্রের সব শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য নিশ্চিত হওয়া চায়। তবেই রাষ্ট্রকে সব মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বলা যাবে। দেশ আজকের দিনে যে পরিমাণ উন্নয়ন অগ্রগতির দাবি করছে সে সুফল বাস্তবায়ন করতে হলে সার্বজনীন চিকিৎসা ও শিক্ষার অগ্রগতি ঘটাতে হবে।

আরো খবর

Leave a Reply

Close