বাংলাদেশ, বুধবার, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাতে ফুটপাতে ওদের কি পরিচয়

মাহমুদুল হক আনসারী
ফুটপাতে রাতে নগরীর বিভিন্ন অলি গলিতে বৃদ্ধ মহিলা, পুরুষ ও নানা বয়সের শিশুদের দেখা যায়। ওরা কারা, ওদের কি পরিচয় ? ওরা কি এ দেশের নাগরিক, নাকি অন্য দেশের মানুষ। নিশ্চয় তারা এদেশেরও কোনো না কোনো অঞ্চলের বাড়ি ভিটা হারা জনগণ। এক সময় হয়তো তাদের ঘরবাড়ি জমি জমা ছিলো। কোনো কারণে তাদের বাড়ি ঘর নদী সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। অথবা অর্থাভাবে তারা তাদের ঘরবাড়ি বিক্রী করে পথে বসেছে। কোনো না কোনো কারণে তারা পৈত্রিক ঘরবাড়ি হারিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় না পেয়ে সারা দেশের শহর নগরে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আশ্রয় হচ্ছে ফুটপাত। সারা দিন কেউ ভিক্ষা করে, অথবা দোকান মার্কেট বাসা বাড়িতে দু’বেলা অন্নের জন্য কাজ করে আর রাত কাটায় ফুটপাতে। তাদের কোনো ঠিকানা নেই। তারা স্বাধীন দেশে ঠিকানাহীন জনগণ বলা যায়। তাদের কয়েকজনের সাথে আলাপ চারিতায় জানা যায়, এক সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের সব ছিলো। কিন্তু এখন তাদের কিছু নেই। তাদের পরিচয় ভিক্ষুক ও ফুটপাতের মানুষ। তাদের কারো কারো ছেলে সন্তান থাকলেও অর্থের প্রয়োজনে সন্তান বিক্রী করে নি:সন্তান হয়ে তারা বেঁচে আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এদেশের জাতীয় স্থানীয় নির্বাচন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। তাদের নাগরিক পরিচয় দেখা যায়। বলা যায়, তারা জন্মগতভাবে দেশের নাগরিক। তাহলে তাদের এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কি দায়িত্ব। সমাজ তাদের প্রতি কি অনুভূতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে, সেটায় আমার লেখায় পরিষ্কার করার উদ্দেশ্য। যদি তারা এদেশের জন্মগতভাবে নাগরিক হয়, তাহলে তারা দু:সহ জীবন নিয়ে ফুটপাতে ঝড়,বৃষ্টি, রোদে জ্বলবে কেন ?

বাংলাদেশ ৬৮ হাজার বর্গ কিলোমিটারের একটি দেশ। এখানে বিদেশি মানুষ এদেশের নাগরিক না হয়েও যদি তারা আশ্রয় ও সুযোগ সুবিধা পায়, তাহলে এদেশের নাগরিক হয়ে এ মানুষগুলো কেনো এভাবে বছরের পর বছর ফুটপাতে জীবন কাটাবে। রাষ্ট্রের নিকট তাদের জন্য কি কোনো আশ্রয় পাওয়ার অধিকার নেই ? নিশ্চয় তারা সমাজ ও রাষ্ট্র হতে তাদের অন্ন, বাস স্থানের নিশ্চয়তা অধিকার পেতে পারে। সারা দেশে শহর নগরের অলিগলিতে আশ্রয়হীনভাবে থাকা এ মানুষগুলোর সংখ্যা অর্ধ কোটির কম হবে না। রাষ্ট্রের সমাজ সেবা অধিদপ্তর এবং দেশি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার কাছে তাদের সঠিক তথ্য আরো পরিচ্ছন্নভাবে থাকতে পারে। সংখ্যায় তাদের হিসেব যতই হোক না কেনো, যেহেতু বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর বুকে উন্নয়ন অগ্রগতিতে এগিয়ে থাকা একটি দেশ। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান করে নিচ্ছে। পৃথিবীর নানা দেশ ও রাষ্ট্র প্রধান বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করছে। দেশের মানুষ শিক্ষা দীক্ষায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ছাত্র সমাজ উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা বাণিজ্য, কৃষি, খাদ্য সবকিছুতে বাংলাদেশের সফলতা প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান দেশের সার্বিক উন্নয়ন যেভাবে জনগণ দেখছে এবং সেবা পাচ্ছে সেক্ষেত্রে দেশ নাগরিক সেবায় ক্রমেই এগিয়ে চলছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের এ প্রেক্ষাপটে এ দেশেরই একটি শ্রেণী এভাবে মানবেতর জীবনযাপন ও ফুটপাতে তাদের জীবন কাটাবে সেটা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর একটি শ্রেণীর কাছে অগাধ অর্থ পুঞ্জিভূত হয়েছে। অনৈতিক আর অবৈধ অর্থ একটি মহলের কাছে অর্থের পাহাড় বলা যায়। রাষ্ট্রীয় অর্থ নানাভাবে ওইসব মহল অবৈধ পথে হাতিয়ে নিয়ে নিজেরাই অর্থের পাহাড় গড়েছে। আর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করে বিদেশের মাটিতে ব্যবসা করার সংবাদ ও এদেশের মানুষ জানে।

বলা যায়, বাংলাদেশ এখন আর গরিব দেশের তালিকায় নেই। সুতারাং একশ্রেণীর জনগণ এবং রাষ্ট্রের নিকট অর্থের অভাব নেই। ফুটপাতের ওই মানুষগুলোর সুস্থ মানবিক জীবন প্রতিষ্টার জন্য রাষ্ট্র সঠিক পন্থায় উদ্যোগ নিলেই কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাবে বলে সচেতন মহলের অভিমত। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ও আয়কর আইনজীবি আমির হোসেন বলেন, ফুটপাতের ওই মানুষগুলোর পুন:বাসনের জন্য সরকার ইচ্ছে করলে সরকারের পড়ে থাকা অসংখ্য খাস পাহাড় টিলায় তাদের পুন:বাসন করা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদেরকে সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করে স্থায়ী পুন:বাসন করা যায়। সরকারের সমাজ সেবা অধিদপ্তর এবং যেসব এনজিও দুস্থদের কল্যাণে কাজ করে তারাও যদি, এ মানবিক কাজে এগিয়ে আসে তাহলে ওই মানুষগুলোর পুন:র্বাসন করা কঠিন ও বড় কোনো সমস্যা হবে না। সরকারের সদিচ্ছা ও মানবিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই এটা করা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। দেখা যায়, রাতের আধাঁরে ফুটপাতে পড়ে থাকা এসব মানুষগুলো দেখলে সমাজের হৃদয়বান মানুষদের হৃদয় কম্পন করে। কিন্তু যাদের হৃদয় ও অন্তর ব্যাথিত হয় তারা তো দু’চারটি টাকা পয়সা ছাড়া আর কোনো সাহায্য দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে না। কোনো ব্যক্তি বিশেষ ওইসব মানুষগুলোর জন্য একা কিছু করা সম্ভব হয় না। ওদের জন্য স্থায়ী পুন:র্বাসন সমাজ ও রাষ্ট্রকেই করতে হবে। তাহলে বাস্তবে বিশাল এ আশ্রয়হীন ফুটপাতের মানুষগুলো হয়তো তাদের একটা স্থায়ী ঠিকানা পেতে পারে। আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রের সহযোগীতায় তাদের পাশে দাঁড়াই। লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী গবেষক, প্রাবন্ধিক।

আরো খবর

Leave a Reply

Close