বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১২ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জন্মাষ্টমী ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা

 

বিপ্লব কান্তি নাথ

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী একটি হিন্দু উৎসব। এটি বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়। এর অপর নাম কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণ জয়ন্তী ইত্যাদি।

হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। উৎসবটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, প্রতি বছর মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো এক সময়ে পড়ে। কৃষ্ণের জীবনের নাটকীয় উপস্থাপন রাসলীলা মথুরা, বৃন্দাবন, মণিপুর ইত্যাদি স্থানে এই উৎসবের সাথে করা হয়। রাস লীলায় কৃষ্ণের ছোট বয়সের কর্ম-কাণ্ড দেখানো হয়, অন্যদিকে, দহি হাড়ি প্রথায় কৃষ্ণের দুষ্ট স্বভাব প্রতিফলিত করা হয় যেখানে কয়েকজন শিশু মিলে উচ্চস্থানে বেঁধে রাখা মাখনের হাড়ি ভাঙতে চেষ্টা করে। এই পরম্পরাকে তামিলনাডুতে উরিয়াদি নামে পালন করা হয়। কৃষ্ণের জন্ম হাওয়ায় নন্দের সকলকে উপহার বিতরণের কাহিনী উদ্যাপন করতে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর পর বহু স্থানে নন্দোৎসব পালন করা হয়।

কৃষ্ণ দেবকী এবং বাসুদেবের অষ্টম সন্তান ছিেেলন। পুরানো পুঁথির বর্ণনা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের গণনা অনুসারে কৃষ্ণের জন্মর তারিখ হল খ্রীষ্টপূর্ব ৩২২৮ সালের ১৮ জুলাই এবং তাঁর মৃত্যুর দিন খ্রীষ্টপূর্ব ৩১০২ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারী। কৃষ্ণ মথুরার যাদববংশের বৃষ্ণি গোত্রের মানুষ ছিলেন। মানবরূপের পৃথিবীর আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কে গীতায় বলেছেন :

‘যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানম ধর্মস্য তদাতœানং সৃজাম্যহম।

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।

ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।

(জ্ঞানযোগ ৭/৮)

সমগ্র ভারতবর্ষে যখন হানাহানি, রক্তপাত, সংঘর্ষ, রাজ্যলোভে রাজন্যবর্গের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ তথা পৃথিবী যখন মর্মাহত, পাশে অবনত, ঠিক সেই গৃষ্টি স্থিতি-পলয়ের যুগ সন্ধিক্ষণে তার আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়ে। মানবতাবাদী চরিত্রে চিত্রিত পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নেন মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে। ঘোর অমানিশার অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করায় কৃষ্ণের গায়ের রং শ্যামল, অন্য অর্থে ধূসর, পীত কিংবা কালো। শ্রীকৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্তের পটভূমি একটু ভিন্ন ধরনের। এর জন্মের রয়েছে ঐতিহাসিক অনেক কারণ। ইতিহাসের আলোকে জানা যায়, আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে মগধের অধিপতি জরাসন্ধ ছিলেন এক রাজ্যলোভী রাজা। তিনি ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করেও ব্যর্থ হন। আর সেই ব্যর্থ রাজা জরাসন্ধ গ্লানিতে অস্থির উন্মাদ হয়ে শেষে আশ্রয় নেন এক কূটকৌশলের, মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংসকে নিজ দলে ভিড়িয়ে তার নিজ দুই মেয়েকে অত্যাচারী কংসের সঙ্গে বিয়ে দিলেন হীনস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার স্বরূপ। কংসের সিংহাসন লাভের দুর্বিনীতি আকাক্সক্ষার ফলে জরাসন্ধের সঙ্গে এ আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন হলে জরাসন্ধ ও কংস দুজনেই অনেকাংশে বলশালী হয়ে ওঠেন। তাদের এ উত্থানে মথুরাবাসী উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। কারণ মথুরাবাসী ছিল অত্যন্ত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। বিশেষ করে যাদবরা তাদের চিরশত্র“ জরাসন্ধের সঙ্গে কংসের আত্মীয়তার বন্ধনকে মনে মনে ধিক্কার জানায়। মনেপ্রাণে তারা হয়ে ওঠে আরও বিদ্রোহী।

এদিকে ক্ষমতালোভী কংস পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে মথুরার সিংহাসন দখল করে। তখন আত্মীয়স্বজন ও বিশেষ করে যাদবকুল বিদ্রোহী হয়ে উঠলে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ প্রশমনে কৌশল হিসেবে কংস যাদবকুলের শুর সেনের পুত্র তার বিশ্বস্ত বন্ধু বাসুদেবের সঙ্গে তার বোন দেবকীর বিয়ে দেন। কংসের আশা-দুরাশায় পরিণত হল। সদ্যপরিণীতা বোন দেবকীকে বাসুদেবসহ রথে করে নিয়ে যাওয়ার সময় কংস দৈববাণী শুনতে পান : ‘তোমার এই বোনের অষ্টম সন্তানই হবে মৃত্যুর কারণ।’ মৃত্যুর আশংকায় উত্তেজিত কংস দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলে বসুদেব কংসকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, দেবকীর উদরে যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে কংসের হাতে তুলে দেবেন। কংস বোন দেবকীকে তখন হত্যা থেকে বিরত থাকলেও বোন ও ভগ্নিপতিকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে দ্বিধা করেননি। এ অবস্থায় বাসুদেব ও দেবকীর বিবাহ বাসর হল কংসের কারাগারে।

১০ মাস ১০ দিন পর দেবকী এক পুত্রসন্তান জন্ম দেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বসুদেব কংসের হাতে তুলে দেন সদ্যোজাত সন্তান। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন কংস। এভাবে একে একে কংসের নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার হন বসুদেব-দেবকী দম্পতির আরও ছয়টি সন্তান। এদিকে গোকুলে বাস করতেন বাসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী। তার উদরে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান, নাম তার বলরাম। একে একে দেবকীর সাতটি সন্তানকে হত্যার পর মৃত্যুর চিন্তায় উৎকণ্ঠিত কংস হয়ে ওঠে দিশেহারা। এরপর দেবকী অষ্টমবারের মতো সন্তান সম্ভবা হলে কারাগারে বসানো হয় কঠোর নিরাপত্তা। চারদিকে আলোয় উদ্ভাসিত করে অষ্টমী তিথিতে অরাজকতার দিন অবসান করতে গভীর অন্ধকার রাতে জন্মগ্রহণ করেন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ যুগ অবতার।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বসুদেব দেখলেন শিশুটি চার হাতে শংখ, চক্র, গদা ও পদ্ম ধারণ করে আছেন। নানারকম মহামূল্য মণি-রতœখচিত সব অলংকার তার দেহে শোভা পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণবক্ষ নারায়ণই জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের ঘরে। বসুদেব কড়জোর প্রণাম করে তার বন্দনা শুরু করলেন। বসুদেবের বন্দনার পর দেবকী প্রার্থনা শেষে একজন সাধারণ শিশুর রূপ ধারণ করতে বললেন শ্রীকৃষ্ণকে। নিপীড়িত মানুষ মুক্তির আশায় কানুর তথা কৃষ্ণের অনুসারী হয়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে কংসবধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কংস অবশেষে কৃষ্ণবধের জন্য মথুরায় মল্লক্রীড়ার আয়োজন করে। আমন্ত্রণ জানানো হয় কৃষ্ণ ও বলরাশকে। মল্লক্রীড়ায় উপস্থিত হন চারপাশের রাজন্যবর্গ। কৃষ্ণবধের অলীক আশায় কংস তখন আহারা। ক্রীড়া প্রাঙ্গণের সামনে পাগলা হাতি রাখা হয় কৃষ্ণকে পিষে মারার জন্য। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কংস চানুর ও মুষ্টির নামে দুই খ্যাতিমান অত্যন্ত বলবান মল্লবীরকে কৃষ্ণকে হত্যার জন্য উপস্থিত রাখেন। কিন্তু অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। তার মুষ্টির আঘাতে মারা যায় হাতি, মুষ্টিক ও চানুর। হতভস্ব কংস রাজন্যবর্গ সেনাদল সহচর সবাইকে তার পক্ষে অস্ত্র ধারণ করতে বলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। তখন নিরুপায় কংস যুদ্ধনীতি লংঘন করে অস্ত্র ধারণ করা মাত্র কৃষ্ণ রক্তপিপাসু হিংগ্র সিংহের মতো প্রবল বিক্রমে কংসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে কৃষ্ণের লৌহমুষ্টির আঘাতে কংসকে ভূমিতলে শয্যা নিতে হল।

শ্রীকৃষ্ণের জীবনী পাঠ ও কর্মকাণ্ড মানবসমাজকে শিক্ষা দেয় যে, সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্ব সমাজকে আবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার দর্শন ও প্রেমেরবাণী রাখতে পারে কার্যকর ভূমিকা। তাই তো শুধু দুষ্টের দর্শনই নয়, এক শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি বছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন তথা জন্মাষ্টমী আমাদের মাঝে নিয়ে আসে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে এক শুভ আনন্দময় বার্তা।

জন্মাষ্টমী কিভাবে পালন করা হয়

হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৈষ্ণবদের কাছে জন্মাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসব নানা ভাবে উদ্যাপন করা হয়। যেমন – ভগবত পুরাণ অনুযায়ী নৃত্য, নাটক যাকে বলা হয় রাসলীলা বা কৃষ্ণ লীলা, মধ্যরাত্রি তে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের মুহূর্তে ধর্মীয় গীত গাওয়া, উপবাস, দহি হান্ডি প্রভৃতি। রাসলীলা তে মূলত শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা দেখানো হয়।

অন্যদিকে দহি হান্ডি প্রথায় অনেক উঁচুতে মাখনের হড়ি রাখা হয় এবং অনেক ছেলে মিলে মানুষের পিরামিড তৈরি করে সেই হাড়ি ভাঙ্গার চেষ্টা করে। তামিলনাড়ুতে এ প্রথা উড়িয়াদি নামে পরিচিত।

এই দিন মানুষ কৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করার জন্য অভুক্ত থাকে, ধর্মীয় গান গায় এবং উপবাস পালন করে।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথিতে মধ্যরাতে তার ছোট ছোট মূর্তি কে স্নান করিয়ে কাপড় দিয়ে মোছা হয় এবং দোলনায় সাজানো হয়। তারপর উপাসক মন্ডলী নিজেদের মধ্যে খাদ্য ও মিষ্টান্ন বিনিময় করে উপবাস ভঙ্গ করে।

গৃহস্ত মহিলারা বাড়ির বিভিন্ন দরজার বাইরে, রান্নাঘরে শ্রী কৃষ্ণের পদচিহ্ন এঁকে দেন যা শ্রীকৃষ্ণের যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কৃষ্ণ : কৃষ্ণ হলেন হিন্দু ধর্মানুসারীদের আরাধ্য বিশিষ্ট একজন দেবতা। তিনি ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার রূপে খ্যাত। কখনো কখনো তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর (‘পরম সত্ত্বা’) অভিধায় ভূষিত করা হয় এবং হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্গীতারপ্রবর্তক হিসাবে মান্য করা হয়। হিন্দু বর্ষপঞ্জী অনুসারে প্রতিবছর ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী (জন্মাষ্টমী) তিথিতে তাঁর জন্মোৎসব পালন করা হয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৈষ্ণবদের কাছে জন্মাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসব নানা ভাবে উদযাপন করা হয়। যেমন – ভগবত পুরাণ অনুযায়ী নৃত্য, নাটক যাকে বলা হয় রাসলীলা বা কৃষ্ণ লীলা, মধ্যরাত্রি তে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের মুহূর্তে ধর্মীয় গীত গাওয়া, উপবাস, দহি হান্ডি প্রভৃতি। রাসলীলা তে মূলত শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা দেখানো হয়।

বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি ধর্মরাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দানকারী একজন প্রাচীন ভারতীয় রাজপুত্র ও রাজা। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর পূর্বযুগে প্রচলিত কৃষ্ণধর্ম প্রাচীন বৈদিক ধর্মজ হয়েও খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকেই ভক্তিবাদের মায়াবী চেতনায় “ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী” হয়ে উঠেছেন উপাস্য অবতার। ভিন্ন ধর্মের লোকেরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণের পূজা করে থাকে। বেদ কিংবা উপনিষদে কৃষ্ণ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না, কারণ কৃষ্ণের জন্ম অনেক পরে। একাধিক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তাঁকে বিষ্ণুর অবতাররূপে গণ্য করা হয়; অন্যদিকে কৃষ্ণধর্মের অন্যান্য সম্প্রদায়গুলিতে তাঁকে স্বয়ং ভগবান মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু এই কৃষ্ণের অনুসারীগণ সনাতন হিন্দু শাস্ত্রের মূল বেদ এর মূল কান্ডারীউপনিষদ ।

কৃষ্ণ শব্দের অর্থ কালো বা ঘন নীল। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রে, অনেকেই কৃষ্ণ শব্দটি সর্বাকর্ষক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করেন। ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে প্রায়শই বংশী-বাদনরত এক কিশোরের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার ভগবদ্গীতায়, তিনি এক পথপ্রদর্শক এবং সহায়ক তরুণ রাজপুত্র। সমগ্র মহাভারত কাব্যে, তিনি একজন কূটনীতিজ্ঞ হিসাবেপাণ্ডবপক্ষে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথিরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। হিন্দু দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি বহুধা পরিব্যাপ্ত। তিনি একাধারে: শিশুদেবতা, রঙ্গকৌতুক প্রিয়,আদর্শ প্রেমিক, দিব্য নায়ক ও সর্বোচ্চ ঈশ্বর। কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি মূলত লিখিত আছে মহাভারত, হরিবংশ, ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থে।

চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই বাসুদেব, কৃষ্ণ ও গোপাল প্রভৃতি কৃষ্ণের নানা রূপের পূজাকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতেই দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণভক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর ভারতে কৃষ্ণধর্ম সম্প্রদায়গুলি সুপ্রতিষ্ঠিত হয় মোটামুটি একাদশ শতাব্দী নাগাদ। দশম শতাব্দী থেকেই ভক্তি আন্দোলনের ক্রমবিস্তারের ফলে কৃষ্ণ শিল্পকলার এক মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠেন। ওড়িশায় জগন্নাথ, মহারাষ্ট্রে বিঠোবা, রাজস্থানে শ্রীনাথজি প্রভৃতি কৃষ্ণের রূপগুলিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ভক্তিসংস্কৃতিও বিকাশলাভ করে। তার দার্শনিক ঞ্জান ও আদর্শের উপর নজরদারি করলে সহজেই বুঝতে পারা যায় তিনি এক জন সয়ং ভগবানের অবতার ।

কৃষ্ণের নাম ও উপাধির তালিকা

সংস্কৃত কৃষ্ণ শব্দটির অর্থ কালো, ঘন বা ঘন-নীল। কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কৃষ্ণের মূর্তিগুলিতে তাঁর গায়ের রং সাধারণত কালো এবং ছবিগুলিতে নীল দেখানো হয়ে থাকে।

কৃষ্ণ নামের অর্থ-সংক্রান্ত একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মহাভারতের উদ্যোগপর্বে (৫।৭১।৪)বলা হয়েছে কৃষ্ণ শব্দটি কৃষ এবং ণ এই দুটি মূল থেকে উৎপন্ন। কৃষ শব্দের অর্থ টেনে আনা বা কর্ষণ করা; সেই সূত্রে শব্দটি ভূ (অর্থাৎ, অস্তিত্ব বা পৃথিবী) শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ণ শব্দটিকে নিবৃত্তি শব্দের প্রতিভূ ধরা হয়। মহাভারতের উক্ত শ্লোকটি চৈতন্য চরিতামৃত ও শ্রীল প্রভুপাদের টীকায় ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ভূশব্দটির নিহিত অর্থ আকর্ষণীয় অস্তিত্ব; অর্থাৎ কৃষ্ণ শব্দের অর্থ সকল দিক থেকে আকর্ষণীয় ব্যক্তি। ভাগবত পুরাণের আত্মারাম স্তবে কৃষ্ণের গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে। বল্লভ সম্প্রদায়ের ব্রহ্মসম্ভব মন্ত্রে কৃষ্ণ নামের মূল শব্দগুলিকে বস্তু, আত্মা ও দিব্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পাপের বিনাশশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত হয়েছে।

বিষ্ণু সহগ্রনামের ৫৭তম নামটি হল কৃষ্ণ, যার অর্থ, আদি শঙ্করের মতে আনন্দের অস্তিত্ব। কৃষ্ণের একাধিক নাম ও অভিধা রয়েছে। কৃষ্ণের সর্বাধিক প্রচলিত নামদুটি হল গোবিন্দ (গো-অন্বেষক) ও গোপাল (গো-রক্ষাকারী)। এই নামদুটি ব্রজে কৃষ্ণের প্রথম জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো কোনো নামের আঞ্চলিক গুরুত্বও রয়েছে। যেমন, জগন্নাথ নামটি। ওড়িশায় এই নামে একটি বিশেষ মূর্তিতে পূজিত হন কৃষ্ণ।

মূর্তিতত্ত্ব

কৃষ্ণের মূর্তি ও ছবিগুলি সহজেই চেনা যায়। কৃষ্ণের অধিকাংশ মূর্তিতেই তাঁর গায়ের রং কালো দেখানো হয়ে থাকে; অন্যদিকে ছবিগুলিতে প্রধানত তাঁর গায়ের রং ঘন নীল। তাঁর রেশমি ধুতিটি সাধারণত হলুদ রঙের এবং মাথার মুকুটে একটি ময়ূরপুচ্ছ শোভা পায়। কৃষ্ণের প্রচলিত মূর্তিগুলিতে সাধারণত তাঁকে বংশীবাদনরত এক বালক বা যুবকের বেশে দেখা যায়। এই বেশে তাঁর একটি পা অপর পায়ের উপর ঈষৎ বঙ্কিম অবস্থায় থাকে এবং বাঁশিটি তাঁর ঠোঁট পর্যন্ত ওঠানো থাকে। তাঁকে ঘিরে থাকে গোরুর দল; এটি তাঁর দিব্য গোপালক সত্ত্বার প্রতীক। কোনো কোনো চিত্রে তাঁকে গোপী-পরিবৃত অবস্থাতেও দেখা যায়।

কৃষ্ণের অপর একটি পরিচিত চিত্র হল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ভগব˜্গীতায় অর্জুনকে পরমার্থ উপদেশ দেওয়ার ছবি। এই চিত্রে তাঁর যে বিশ্বরূপ দর্শিত হয় তার অনেকগুলি বাহু ও মাথা। এর মধ্যে সুদর্শন চক্র-ধারী বিষ্ণুরএকটি ছায়া বিদ্যমান। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অঙ্কিত একটি গুহাচিত্রে অশ্বচালিত রথচালনার চিত্র আছে; সেই চিত্রে একটি চরিত্র রথের চাকা ছুঁড়তে উদ্যত। এই চরিত্রটিকে কৃষ্ণ বলে অভিহিত করা হয়।

মন্দিরে পূজিত কৃষ্ণমূর্তিগুলি প্রধানত দণ্ডায়মান অবস্থার। কোথাও কোথাও কৃষ্ণ একা; আবার কোথাও কোথাও তাঁর অন্যান্য সঙ্গীরাও তাঁর সঙ্গে পূজিত হন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রা অথবা তাঁর প্রধানা মহিষী রু´িণী ও সত্যভামা।

কৃষ্ণ কখনও কখনও তাঁর সহচরী গোপিনী রাধার সঙ্গেও পূজিত হন। মণিপুরী বৈষ্ণবরা একা কৃষ্ণের পূজা করেন না; তাঁদের আরাধ্য রাধা ও কৃষ্ণের যুগলমূর্তি রাধাকৃষ্ণ। রুদ্র ও নিম্বার্ক সম্প্রদায় এবং স্বামীনারায়ণ মতেও এই প্রথা বিদ্যমান। গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা রাধারমণমূর্তিটিকে রাধাকৃষ্ণের প্রতিভূ মনে করেন।

কোথাও কোথাও শিশুর মূর্তিতেও পূজিত হন কৃষ্ণ। এই মূর্তিতে তাঁকে হামাগুড়ি দিতে, অথবা নৃত্যরত অবস্থায়, অথবা মাখন হাতে দেখা যায়। অঞ্চলভেদেও কৃষ্ণের বিভিন্ন প্রকার মূর্তি দেখা যায়। যেমন ওড়িশায় জগন্নাথ, মহারাষ্ট্রে বিঠোবাও রাজস্থানে শ্রীনাথজি।

শাস্ত্রীয় উৎস

ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতাররূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থই প্রাচীনতম গ্রন্থ যেখানে ব্যক্তি কৃষ্ণ বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই গ্রন্থের অনেক উপাখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন কৃষ্ণ। এর ষষ্ঠ পর্বের (ভীষ্ম পর্ব) আঠারোটি অধ্যায় ভগব˜্গীতা নামে পৃথক ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পেয়ে থাকে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধা অর্জুনকেপ্রদত্ত কৃষ্ণের উপদেশাবলির সংকলনই হল ভগবদ্গীতা। মহাভারতে কৃষ্ণকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ রূপে দেখানো হলেও, কোথাও কোথাও তাঁর বাল্যলীলারও আভাস দেওয়া হয়েছে। মহাভারতের পরবর্তীকালীন পরিশিষ্ট হরিবংশ গ্রন্থে কৃষ্ণের বাল্য ও কৈশোরের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রচিত পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থে এই শ্লোকে বলা হয়েছে: “সঙ্কর্ষণের সহচর কৃষ্ণের শক্তি বৃদ্ধি হউক!” অন্য একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, “কৃষ্ণ স্বয়ং যেন চতুর্থ” (তিন সহচর সহযোগে কৃষ্ণের কথা বলা হয়েছে, তিন সহচর সম্ভবত সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ)। অপর এক শ্লোকে রাম (বলরাম) ও কেশবের (কৃষ্ণ) মন্দিরে যে সকল বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়ে থাকে সেগুলির উল্লেখ রয়েছে। পতঞ্জলির রচনা থেকে বাসুদেবের কংসবধ (কৃষ্ণ-কংসোপাচারম্) উপাখ্যানের নাট্যাভিনয় ও মূকাভিনয়ের বিবরণ পাওয়া যায়।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে পাঁচজন বৃষ্ণি নায়কের পূজার প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এঁরা হলেন বলরাম, কৃষ্ণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ ও শাম্ব। মথুরার নিকটবর্তী মোরা থেকে পাওয়া একটি শিলালিপিতে মহান সত্রপরাজুভুলার পুত্রের উল্লেখ এবং এক বৃষ্ণির চিত্র পাওয়া গেছে। ইনি সম্ভবত বাসুদেব এবং পঞ্চযোদ্ধার অন্যতম। ব্রাহ্মী লিপিতে লিখিত এই শিলালিপিটি বর্তমানে মথুরা সংগ্রহালয়ে রক্ষিত আছে।

একাধিক পুরাণে কৃষ্ণের জীবনকাহিনি বর্ণিত হয়েছে বা তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থদ্বয়ে কৃষ্ণের জীবনের সর্বাপেক্ষা বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই দুই পুরাণে বর্ণিত ধর্মতত্ত্বই গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদগুলির মূল ভিত্তি। ভাগবত পুরাণ গ্রন্থের প্রায় এক চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে কৃষ্ণ ও তাঁর ধর্মোপদেশের স্তুতিবাদ।

খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লিখিত যক্ষের নিরুক্ত নামক বুৎপত্তি-অভিধানে অক্রুরের শ্যামন্তক মণির একটি উল্লেখ পাওয়া যায়, যার মূল সূত্র কৃষ্ণ-সংক্রান্ত একটি সুপরিচিত পৌরাণিক কাহিনি। শতপথ ব্রাহ্মণ ও ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থদ্বয়ে কৃষ্ণকে বৃষ্ণিবংশজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে কৃষ্ণের কোনো উল্লেখ নেই। তবে রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকর ঋগ্বেদের একটি শ্লোকে (৮।৯৩।১৩) উল্লিখিত দ্রপ্স…কৃষ্ণ (কালো বিন্দু) কথাটিকে দেবতা কৃষ্ণের উল্লেখ বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ কয়েকজন প্রাগৈতিহাসিক দেবতার সঙ্গে কৃষ্ণের মিল খুঁজে পেয়েছেন। ১৯২৭-৩১ সাল নাগাদ ম্যাকে মহেঞ্জোদাড়োতে একটি চিত্রলিপি আবিষ্কার করেছিলেন। এই চিত্রে দুজন ব্যক্তি একটি গাছ ধরে আছে এবং বৃক্ষ দেবতা তাদের দিকে বাহু প্রসারিত করে রেখেছেন। আবিষ্কারক এই চিত্রটিকে কৃষ্ণের যমলার্জুন-লীলার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

জীবন

নিচে মহাভারত, হরিবংশ, ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থের ভিত্তিতে কৃষ্ণের জীবনের একটি বিবরণ দেওয়া হল। এই উপাখ্যানগুলির পটভূমি আধুনিক ভারতের উত্তরপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা, দিল্লি ওগুজরাট রাজ্য।

জন্ম

শাস্ত্রীয় বিবরণ ও জ্যোতিষ গণনার ভিত্তিতে লোকবিশ্বাস অনুযায়ী কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ৩২২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৮ অথবা ২১ আগষ্ট বুধবার। কৃষ্ণের জন্মদিনটি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা জন্মাষ্টমী নামে পালিত হয়। কৃষ্ণ যাদব-রাজধানী মথুরার রাজপরিবারের সন্তান। তিনি বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র। তাঁর পিতামাতা উভয়ের যাদববংশীয়। দেবকীর দাদা কংস তাঁদের পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। একটি দৈববাণীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে তাঁর মৃত্যু হবে। এই কথা শুনে তিনি দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাঁদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তাঁর সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে, বলরামের জন্ম হয়। এরপরই কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন।

কৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বসুদেব তাঁকে গোকুলে তাঁর পালক মাতাপিতা যশোদা ওনন্দের কাছে রেখে আসেন। কৃষ্ণ ছাড়া বসুদেবের আরও দুই সন্তানের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। প্রথমজন বলরাম (যিনি বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন) এবং সুভদ্রা (বসুদেব ও রোহিণীর কন্যা, যিনি বলরাম ও কৃষ্ণের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেন)। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, কোনো প্রকার যৌনসংগম ব্যতিরেকেই কেবলমাত্র “মানসিক যোগের” ফলে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, সেযুগে এই ধরনের যোগ সম্ভব ছিল।

বাল্য ও কৈশোর

নন্দ ছিলেন গোপালক সম্প্রদায়ের প্রধান। তাঁর নিবাস ছিল বৃন্দাবনে। কৃষ্ণের ছেলেবেলার গল্পগুলি থেকে জানা যায়, কিভাবে তিনি একজন রাখাল বালক হয়ে উঠলেন, শৈশবেই কৃষ্ণ এতটাই অপ্রতিরোধ্য প্রকৃতির ছিলেন যে তিনি তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টাগুলিকে চমকপ্রদভাবে বানচাল করে দিতে পারতেন এবং বৃন্দাবনবাসীর জীবনরক্ষা করতেন। কৃষ্ণের প্রাণনাশের জন্য কংশ পুতনা সহ অন্যান্য রাক্ষসদের প্রেরণ করলে সকলকে হত্যা করেন কৃষ্ণ।

কৃষ্ণের খোঁজ পাওয়া গেলে কংস পুতনা নামক এক রাক্ষসীকে পাঠান শিশুকৃষ্ণকে হত্যা করতে। মাত্র ৬ মাস বয়সেই পুতনা রাক্ষসীকে হত্যা করেন তিনি যাঁর উচ্চতা ছিল ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। কালীয় নামে একটি বিরাট সাপ যমুনার জল বিষাক্ত করে রেখেছিল। এই জল পান করে রাখাল ও গরুর মৃত্যু হত প্রায়শই। বালক কৃষ্ণ এই কালীয় নাগকে অপরাধের শাস্তি দেয়। হিন্দু চিত্রকলায় অনেক স্থানেই বহুফণাযুক্ত কালীয় নাগের মাথার উপর নৃত্যরত কৃষ্ণের ছবি দেখা যায়। এধরণের দৈত্যাকৃতির শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর একক হামলা ও তাদের পরাস্ত করার কৌশলাদি যে কোন চৌকশ মেধাবী সামরিক কর্মকর্তার দুর্ধর্ষতাকে হার মানায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, প্রথাগত বৈদিক ধর্ম ও তার দেবদেবীর বিরুদ্ধে কৃষ্ণের এই অবস্থান, আধ্যাত্মিক ভক্তি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।

বৃন্দাবনে গোপীদের নিয়ে কৃষ্ণের লীলাও ভারতীয় সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় বিষয়। রাধার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে গীতগোবিন্দম্ রচয়িতাজয়দেব সহ অসংখ্য কবি প্রণয়মূলক কবিতা রচনা করেছেন। রাধাকৃষ্ণ মূর্তিতে কৃষ্ণের পূজা কৃষ্ণভক্তি আন্দোলনের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

যৌবরাজ্য

যৌবনে মথুরায় প্রত্যাবর্তন করে কৃষ্ণ তাঁর মামা কংসের অনুগামীদের দ্বারা সংঘটিত বহু হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে আত্মরক্ষা করে কংসকে বধ করেন। তিনি কংসের পিতা উগ্রসেনকে পুনরায় যাদবকুলের রাজা হিসেবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং নিজে সেখানে অন্যতম যুবরাজ হিসেবে অবস্থান করেন। এই সময়ে তাঁর সাথে অর্জুনসহ কুরু রাজ্যের অন্যান্য পাণ্ডব রাজপুত্রদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তিনি যাদবদের নিয়ে দ্বারকা নগরীতে (অধুনা গুজরাত) চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর রাজত্ব স্থাপন করেন।

কৃষ্ণ বিদর্ভ রাজ্যের রাজকন্যা রু´িণীকে তাঁর অনুরোধে শিশুপালের সাথে অনুষ্ঠেয় বিবাহ মণ্ডপ থেকে হরণ করে নিয়ে এসে বিবাহ করেন। এরপরই কৃষ্ণ ১৬১০০ নারীকে নরকাসুর নামক অসুরের কারাগার থেকে উদ্ধার করে তাদের সম্মান রক্ষার্থে তাদের বিবাহ করেন। কৃষ্ণের মহিষীদের মধ্যে আটজন ছিলেন প্রধান, যাদের অষ্টভার্যা নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা হলেন রু´িণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, কালিন্দি, মিত্রবৃন্দা, নগ্নাজিতি, ভদ্রা এবং লক্ষণা। কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে সমস্ত বন্দী নারীদের মুক্ত করেন। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে বন্দী নারীদের সমাজে কোন সম্মান ছিল না এবং তাদের বিবাহের কোন উপায় ছিল না কারণ তারা ইতিপূর্বে নরকাসুরের অধীনে ছিল। বৈষ্ণব মতে কৃষ্ণের সমস্ত মহিষীগণই ছিলেন দেবী লক্ষ্মীর অবতার অথবা সেই সব নারী যারা বহু জন্মের তপস্যাবলে কৃষ্ণের স্ত্রী হওয়ার অধিকার লাভ করেছিলেন। এছাড়া তাঁর এক স্ত্রী সত্যভামা ছিলেন রাধার অংশ শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পতœী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর রচিত কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহের ভিত্তিহীন তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেওয়া আছে । কৃষ্ণচরিত্রে দেখা যায় যে, কৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পতœী শুধু পুরাণের একটি অংশে সীমাবদ্ধ। শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অন্য কোনো কার্যক্ষেত্রে এসবের উল্লেখ নেই। তিনি এটাকে নেহাতই উপকথা বা গল্প বলে উল্লেখ করেন। শ্রীকৃষ্ণের জীবনচরিতে রু´িনী ভিন্ন অন্য কোনো পতœীর কার্যক্রম দেখা যায় না।

যখন যুধিষ্ঠির সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি সমস্ত মহান রাজাদের সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। যখন তিনি তাঁদের প্রত্যেককে একে একে সম্মান জ্ঞাপন করতে আরম্ভ করলেন তখন তিনি সর্বপ্রথম কৃষ্ণকে সম্মান জ্ঞাপন করলেন কারণ তিনি কৃষ্ণকেই সমস্ত রাজাদের মধ্যে মহান হিসেবে গণ্য করেছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল রাজারাই তাতে সম্মত হলেও কৃষ্ণের আত্মীয় শিশুপাল তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কৃষ্ণের নিন্দা শুরু করেন। কৃষ্ণ শিশুপালের মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমা করবেন। তাই যখন শিশুপাল একশত অপরাধ অতিক্রম করলেন তখন তিনি তার বিরাট রূপ ধারণ করে সুদর্শন চক্রের দ্বারা শিশুপালকে বধ করলেন। সেইসময় অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও দিব্যদৃষ্টি লাভ করে কৃষ্ণের সেই রূপ দর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরাণ অনুসারে শিশুপাল এবং দন্তবক্র নামে অপর এক ব্যক্তি পূর্বজন্মে ছিলেন স্বর্গে দেবতা বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক জয় ও বিজয়। তাঁরা অভিশপ্ত হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং আবার বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের দ্বারাই স্বর্গে প্রত্যাগমন করেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ও ভগবদ্গীতা

যখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে তখন কৃষ্ণ পাণ্ডব এবং কৌরব উভয়পক্ষকেই সুযোগ দেন তাঁর কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে দু’টি জিনিসের মধ্যে যেকোন একটি নির্বাচন করতে। তিনি বলেন যে হয় তিনি স্বয়ং থাকবেন অথবা তাঁর নারায়ণী সেনাকে যুদ্ধের জন্য প্রদান করবেন, কিন্তু তিনি নিজে যখন থাকবেন তখন তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন না। পাণ্ডবদের পক্ষে অর্জুন স্বয়ং কৃষ্ণকে গ্রহণ করেন এবং কৌরবদের পক্ষে দুর্যোধন কৃষ্ণের নারায়ণী সেনা গ্রহণ করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় কৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথির ভূমিকা পালন করেন কারণ তাঁর অস্ত্র ধরার কোন প্রয়োজন ছিল না।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন যখন উপলব্ধি করলেন যে যাঁরা তাঁর প্রতিপক্ষ তাঁরা তাঁর আত্মীয়বর্গ এবং অত্যন্ত প্রিয়জন তখন তিনি যুদ্ধের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি সমস্ত আশা ত্যাগ করে তাঁর ধনুক গাণ্ডীব নামিয়ে রাখলেন। তখন অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে উপদেশ দেন যা ভগবদ্গীতা নামে খ্যাত।

কৃষ্ণ ছিলেন প্রখর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ এবং মহাভারতের যুদ্ধ ও তার পরিণতিতে তাঁর প্রগাঢ় প্রভাব ছিল। তিনি পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে যথাসম্ভব উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু দূর্যোধনের কূপ্রচেষ্টায় তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন তিনি ক্রূর কূটনীতিকের ভূমিকা গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালে পিতৃ-পিতামহের বিরুদ্ধে সঠিক মনোবল নিয়ে যুদ্ধ না করার জন্য তিনি অর্জুনের উপর ক্রুদ্ধ হন। একবার তাঁকে আঘাত করার অপরাধে কৃষ্ণ একটি রথের চাকাকে চক্রে পরিণত করে ভীষ্মকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। তখন ভীষ্ম সমস্ত অস্ত্র পরিত্যাগ করে কৃষ্ণকে বলেন তাঁকে হত্যা করতে। কিন্তু এরপর অর্জুন কৃষ্ণের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং পূর্ণ উদ্যম নিয়ে যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা করেন। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনকে নির্দেশ দেন যাতে তারা ভীষ্মের দেওয়া যুদ্ধজয়ের বর ফিরিয়ে দেয়, কারণ ভীষ্ম স্বয়ং সেই যুদ্ধে পাণ্ডবদের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভীষ্মকে এ কথা জানানো হলে তিনি এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে কীভাবে তিনি অস্ত্র পরিত্যাগ করবেন সে উপায় পাণ্ডবদের বলে দেন। তিনি বলেন যে, যদি কোন নারী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে তবেই তিনি অস্ত্রত্যাগ করবেন। পরের দিন কৃষ্ণের নির্দেশে শিখণ্ডী, অর্থাৎ যিনি পূর্বজন্মে অম্বা ছিলেন তিনি অর্জুনের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেন এবং ভীষ্ম তাঁর অস্ত্রসকল নামিয়ে রাখেন।

এছাড়াও কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা জয়দ্রথকে বধ করতে অর্জুনকে সহায়তা করেন। জয়দ্রথের কারণেই অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু দ্রোণাচার্যের চক্রব্যূহে প্রবেশ করেও বেরিয়ে আসার উপায় অজ্ঞাত থাকায় কৌরবদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ কৌরবদের সেনাপতি দ্রোণাচার্যের পতনও সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভীমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে বধ করতে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে দ্রোণাচার্যের পুত্রের নামও অশ্বত্থামা। এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যকে গিয়ে চতুরতার সাথে বলেন যে অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন এবং তারপর খুব মৃদুস্বরে বলেন যে সেটি একটি হাতি। কিন্তু যেহেতু যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যাচার করতেন না তাই দ্রোণাচার্য তাঁর প্রথম কথাটি শুনেই মানসিক ভাবে অত্যন্ত আহত হন ও অস্ত্র পরিত্যাগ করেন। এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের শিরচ্ছেদ করেন।

কর্ণের সাথে অর্জুনের যুদ্ধের সময় কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায়। তখন কর্ণ যুদ্ধে বিরত থেকে সেই চাকা মাটি থেকে ওঠানোর চেষ্টা করলে কৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কৌরবেরা অভিমন্যুকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে যুদ্ধের সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তাই তিনি নিরস্ত্র কর্ণকে বধ করে অর্জুনকে সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে আদেশ করেন।

এরপর যুদ্ধের অন্তিম পর্বে কৌরবপ্রধান দুর্যোধন মাতা গান্ধারীর আশীর্বাদ গ্রহণ করতে যান যাতে তার শরীরের যে অঙ্গসমূহের উপর গান্ধারীর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হবে তাই ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠবে। তখন কৃষ্ণ ছলপূর্বক তার ঊরুদ্বয় কলাপাতা দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেন। এর ফলে গান্ধারীর দৃষ্টি দুর্যোধনের সমস্ত অঙ্গের উপর পড়লেও ঊরুদ্বয় আবৃত থেকে যায়। এরপর যখন দুর্যোধনের সাথে ভীম গদাযুদ্ধে লিপ্ত হন তখন ভীমের আঘাত দুর্যোধনকে কোনভাবে আহত করতে ব্যর্থ হয়। তখন কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম ন্যায় গদাযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করেন ও তাকে বধ করেন। এইভাবে কৃষ্ণের অতুলনীয় ও অপ্রতিরোধ্য কৌশলের সাহায্যে পাণ্ডবেরা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয় করে। এছাড়াও কৃষ্ণ অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করেন, যাকে অশ্বত্থামা মাতৃগর্ভেই ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত করেছিলেন। পরবর্তীকালে পরীক্ষিতই পাণ্ডবদের উত্তরাধিকারী হন।

গার্হস্থ্য জীবন

কৃষ্ণের ১৬১০৮ জন স্ত্রী ছিলেন । যাদের মধ্যে বৈবাহিকসূত্রে প্রধান স্ত্রী ছিলেন আটজন এবং বাকি ১৬১০০ জন ছিলেন নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া ধর্মাবতার কৃষ্ণে সমর্পিত ও তাঁর অধিকারপ্রাপ্ত নারী । কিন্তু এদের প্রত্যেককে দেবী লক্ষ্মীর অবতার হিসেবে মনে করা হয়।

প্রত্যেক রমণীর গর্ভেই কৃষ্ণ দশটি পুত্র এবং একটি কন্যার জন্মদান করেছিলেন। কৃষ্ণের প্রধান আট মহিষীর গর্ভজাত পুত্রদের নাম:

কৃষ্ণ এবং মহিষী রু´িণীর প্রথম পুত্র হল প্রদ্যুম্ন। এছাড়া রু´িণীর গর্ভজাত কৃষ্ণের অন্যান্য পুত্রেরা হলেন চারুদেষ্ণ, সুদেষ্ণ, চারুদেহ, সুচারু, চারুগুপ্ত, ভদ্রচারু, চারুচন্দ্র, বিচারু ও চারু। কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন এবং রু´িণীর ভ্রাতা রু´ীর কন্যা রু´াবতীর পুত্র হল পুরাণে উল্লিখিত বীর অনিরুদ্ধ।

কৃষ্ণের আরেক মহিষী সত্যভামার গর্ভে কৃষ্ণ যে দশটি পুত্র লাভ করেছিলেন তারা হলেন ভানু, সুভানু, স্বরভানু, প্রভানু, ভানুমান, চন্দ্রভানু, বৃহদ্ভানু, অতিভানু, শ্রীভানু এবং প্রতিভানু।

জাম্ববানের কন্যা জাম্ববতীর গর্ভে কৃষ্ণ যে দশটি পুত্র লাভ করেছিলেন তারা হলেন শাম্ব, সুমিত্র, পুরুজিৎ, শতজিৎ, সহগ্রজিৎ, বিজয়, চিত্রকেতু, বসুমান, দ্রাবিড় ও ক্রতু। এই পুত্রেরা কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।

কৃষ্ণ ও নগ্নাজিতির মিলনে জন্ম হয় বীর, চন্দ্র, অশ্বসেন, চিত্রাগু, বেগবান, বৃষ, অম, শঙ্কু এবং কুন্তী (কৃষ্ণের পিসি ও পাণ্ডবদের মাতা কুন্তী নন), এই দশটি পুত্রের।

শ্র“ত, কবি, বৃষ, বীর, সুবাহু, ভদ্র, শান্তি, দর্শ, পূর্ণাংশ এবং সোমক হলেন কৃষ্ণ ও কালিন্দির পুত্র।

মদ্রা নামক মহিষীর গর্ভে কৃষ্ণের ঔরসজাত পুত্রেরা হলেন প্রঘোষ, গাত্রবান, সিংহ, বল, প্রবল, উর্ধগ, মহাশক্তি, সাহা, ওজ এবং অপরাজিত।

মিত্রবিন্দা ও কৃষ্ণের মিলনে যে দশ পুত্রের জন্ম হয়, তারা হলেন বৃক, হর্ষ, অনিল, গৃর্ধ, বর্ধন, উন্নাদ, মহাংশ, পবন, বহ্নি এবং ক্ষুধী।

ভদ্রার গর্ভজাত কৃষ্ণের পুত্রেরা হলেন সংগ্রামজিৎ, বৃহৎসেন, সুর, প্রহরণ, অরিজিৎ, জয়, সুভদ্র, বাম, আয়ুর ও সাত্যক।

কৃষ্ণের আরেক মহিষী রোহিণীর গর্ভে কৃষ্ণ লাভ করেছিলেন দীপ্তিমান, তাম্রতপ্ত ও অন্যান্য আটজন পুত্র।

পূজা ও আরাধনা

কৃষ্ণের পূজা হল বৈষ্ণব ধর্মের একটি অঙ্গ। বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারে দেবতা বিষ্ণুকে পরমেশ্বর জ্ঞান করা হয়ে থাকে এবং তাঁর অন্যান্য অবতারসমূহ, তাঁদের পত্নী এবং তৎসম্বন্ধীয় গুরু ও সাধকদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। কৃষ্ণকে মূলত বিষ্ণুর পূর্ণাবতার হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু কৃষ্ণের সাথে বিষ্ণুর প্রকৃত সম্বন্ধ অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্রপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন কখনও স্বয়ং কৃষ্ণকেই একমাত্র পরমেশ্বর রূপে আরাধনা করা হয়। বহু আরাধ্য দেবদেবী ও তাদের অবতারদের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কৃষ্ণের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণ এবং বিষ্ণুকেই কেন্দ্র করে বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্য চলে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে হিন্দুধর্মের যে শাখায় স্বয়ং কৃষ্ণ প্রধান আরাধ্য রূপে বিবেচিত হন সেই শাখাকে “কার্ষ্ণ্য ধর্ম” এবং যে শাখায় কৃষ্ণকে শুধুমাত্র বিষ্ণুর অবতার রূপে চিহ্নিত করা হয় সেই শাখাকে “বৈষ্ণব ধর্ম” আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

আরো খবর

Leave a Reply

Close