বাংলাদেশ, বুধবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বপ্ন পূরণের সিড়িঁ হল বাবা

তন্নি দাশ

“মা আমার সানগ্লাসটি হারিয়ে গেছে আরেকটা কিনতে হবে।”
আমার কথায় মা বলে আচ্ছা কিনবি আরকি। এই ঘটনার কয়েকদিন পর বাবার সাথে একটা অনুষ্ঠানে যায়। ফেরার পথে দেখি বাবা পরিচিত এক চশমার দোকানে ঢুকে বলে, “মেয়ের পছন্দ মত সানগ্লাস দেখাও।” আমি তো পুরো অবাক, তাও পছন্দ করলাম। বাবা কিনে দিলো। জানতে চাইলাম দাম কত? বাবা উত্তরে বলে হবে আরকি একটা, পরে জানলাম সানগ্লাসটির দাম ৯০০ টাকা। আমার বুকের ভিতর কেমন জানি করে উঠলো! কিছুদিন আগে বাবার ঘড়ি নষ্ট হয় আর টাকা নেই তাই বাবা ঘড়ি ঠিক করালো না, কেনা তো দূরে থাক। বাবা ২ বছর ধরে জুতা কিনছে কিন্তু তার কেনা এখনও হলো না। গত মাসে বাবা আমাদের দুই বোনকে প্রায় ৪০০০ টাকা দিয়ে জুতো কিনে দিলো, কিন্তু বাবা টাকার অভাবে নিজের জুতো কিনতে পারলো না। এইদিন দেখি বাবা মা শপিং করতে গেলো বাবার নাকি শার্ট লাগবে। তারা বাসায় আসার পর দেখলাম আমার আর বোনের জন্য জামা। আমাদের জামা আর বাবার শার্টের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আমার একটা জামার দাম আর বাবার ৩টা শার্টের দাম একই। বাবাকে বলাতে বাবা বলে দামি শার্ট পরার টাকা কই? বাবা কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায় না, আসলে সময় পায় না নাকি। শুক্রবারেও অফিসে যায়, আর যদি বলি ছুটি নিতে বাবা বলে ওভার টাইম না করলে মাস শেষে সমস্যা হবে। পহেলা বৈশাখ বা পুজোতে আমি বোন, ঠাকুরমা, মা সবার জন্য কিছু না কিছু নিবে, কিন্তু নিজের বেলায় টাকা নাই। আচ্ছা সত্যিই কি বাবার টাকা নেই, তাই নিজের জন্য কিছু নেয় না, নাকি আমাদেরটা কম দামি হবে বলে নেয় না? মাস শেষে সমস্যা হবে তাই কি ওভার টাইম করে নাকি আমার একটু বিলাসিতা করবো খুশি মনে থাকবো তাই ওভার টাইম করে? এই প্রশ্নগুলো কখনও নিজেদের করি না আমরা। কিন্তু আমরা চেয়েছি আর বাবার দিতে দেরি হয়েছে সাথে সাথে মেজাজ খারাপ করি আমরা কেন দিল না সেটা নিয়ে। আমার বাবার মতো এমন সব বাবারাই হয়। যারা নিজের সব কিছুর বিনিময়ে পরিবারের মুখে হাসি দেখতে চায়। তাই সারাদিন পরিশ্রম করে আর একটু একটু করে পরিবার সন্তানের কাছ থেকে দূরে সরে যায় বাবারা। আমরা মায়ের সাথে যতটা সময় কাটায় বাবার সাথে তা পারি না, আর মনে মনে ধরে নিই বাবারা বুঝি এমনি হয়, রাশভারী। প্রয়োজন ছাড়া নিজে থেকে বাবার কাছে যায় না কেউ। আর বাবারাও বুঝে যায় প্রয়োজন হলেই তার কাছে যাব । হয়তো বুক ভরা অভিমান নিয়ে আমাদের আর ডাকে না। এইভাবে পরিবারে থেকে হারিয়ে যায় বাবারা। প্রিয়জন থেকে হয়ে উঠে প্রয়োজন। আর প্রয়োজন মেটাতে না পারলে বাবার মতো খারাপ আর কেউ হয় না। প্রয়োজন মেটাতে না পারলে জন্ম দিয়েছে কেন? এমন কথা বলতেও মুখে আটকায় না। তাও বাবারা সব সহ্য করে আবার ছেলে মেয়ের জন্য সব করে। আর যখন এই বাবা বৃদ্ধ হয় তখন এক সময় যার প্রয়োজন ছিল সে হয়ে উঠে বোঝা। প্রিয়জন থেকে প্রয়োজন আর প্রয়োজন থেকে বোঝা হয়ে উঠা মানুষগুলো ছিল বলে আমরা পাই একটা পরিচয়, আমরা পাই সম্মান, পরিবার সব কিছু।যা আমরা আমাদের অর্জন মনে করি। ভুলে যায় ওই বোঝায় একদিন আমাদের জীবনটা সাজানোর জন্য নিজের জীবনের স্বপ্ন, ভালোলাগা আনন্দকে নিজ হাতে নষ্ট করেছে। আর সে বাবার উপর ভর করেই আমার নিজেদের ভালোবাসার, স্বপ্নের সাজানো জীবন গড়ে তুলি। একজন বাবা একজন সন্তানের কাছে স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি ছাড়া আর কিছুই না হয়তো। যদি সত্যি বাবা আমাদের প্রিয়জন হত তাহলে কেন আমরা তার কাছ থেকে নিয়ে যায়? কেন কিছু দিতে পারিনা? কেন বৃদ্ধ বাবা আজ অসহায়? কেন সংসারের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া মানুষটা একা ?কেন তাকে বলা যায় না বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি? কেন প্রয়োজন ছাড়া সেই বাবা আমাদের জীবনে অপ্রয়োজনীয়? ছোট বেলায় বাবার আদরে মেয়েটা বড় হবার পর বাবার সাথে কথা বলতে কেন লজ্জা পায়, সংকোচ হয়? কেন বাবার আদুরে ছেলের কাছে সেই বাবার ফোন রিসিভ করাটা বিরক্তির কারন হয়? এইভাবে বাবারা আজীবন একা থেকে যায়, এমনভাবেই নীরবে হারিয়ে যায়। আর আমাদের বাবাকে হয়তো কখনো বলাও হয় না বাবা ভালোবাসি তোমায়।

আরো খবর

Leave a Reply