বাংলাদেশ, রবিবার, ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পতিতাবৃত্তি রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

কাজী অমিত হাসান

পতিতালয় শব্দটি শুনলেই গায়ের লোম শিউরে উঠে তাই না।কারো উঠেছে ভয়ে,লজ্জায়, ঘৃণায় আর কারো উঠেছে কাম উত্তেজনায়। আচ্ছা,পতিতা কি ?যারা প্রত্যক্ষ টাকার বিনিময়ে যৌনসেবা প্রদান করে,তাদেরকে পতিতা বলা হয়।আবার এদেরকে অনেক ক্ষেত্রে গণিকা,নটী,ছিন্না,কসবী,সেক্স ওয়ার্কার ও বেশ্যা ইত্যাদি বলা হয়। আর যেখানে পতিতারা থাকে, তাকে পতিতালয় বলা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পেশাগুলোর একটি হলো পতিতাবৃত্তি। সারারণত সকল পতিতারাই বাধ্য হয়ে কিংবা ভাগ্যের সন্ধানে পতিতাবৃত্তি শুরু করে।কোনো কোনো পরিবার, বোবা, অন্ধ ও শারীরিকভাবে অক্ষম মেয়েদের বোঝা মনে করে পতিতালয়ের দালালের কাছে বিক্রি করে দেন।আবার এক শ্রেণীর প্রতারক আছে,যারা স্বল্প-শিক্ষিত ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের সাথে প্রেম করে কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাসা থেকে ভাগিয়ে নিয়ে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেন। বাংলাদেশে অপহরণ কিংবা দালালের মাধ্যমে পতিতাবৃত্তি শুরু করা মেয়েদের বয়স ও চেহারা অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষ ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা দেওয়া হয়।আমাদের সমাজে সবচেয়ে নিগৃহীত মানুষদের মধ্যে পতিতারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মৃত্যুর পর এদের লাশের সৎকারটা পর্যন্ত ঠিকভাবে হয় না।কোনো-রকমে মাটিচাপা দিয়ে লাশ পুতে রাখা হয়।অথচ সমাজের এই মানুষগুলোই সমাজকে প্রতিনিয়ত নানারকম যৌন অনাচার থেকে রক্ষা করে আসছে।প্রতিটি জেলা,উপজেলা কিংবা অলিগলিতে এদের অস্তিত্ব থাকলেও অনেকেই জানেন না পতিতাবৃত্তি শুরু হয় কিভাবে ?পতিতা পল্লিতে যে সব পতিতারা থাকে তাদের জীবন পদ্ধতি মূলত ৩ ধরনের।সবচেয়ে উচুস্তরে থাকেন মা, মাসী, খালা,সর্দারনী ও বাড়িওয়ালা। প্রাক্তন পতিতা যারা স্বাধীন, স্হানীয়,রাজনীতিবিদ কিংবা প্রশাসনের সাথে ভালো হাত-পরিচিতি রয়েছে,তারা উচ্চ পদ ধারণ করেন।আর সবচেয়ে নিচুস্তরের হল ছুরকি কিংবা এই লাইনে নতুন আসা পতিতারা।পণ্যস্ত্রী,গণিকা যৌনকর্মী কিংবা পতিতা যে সম্ভাষণেই ডাকা হোক না কেনো, পেশা তাদের একটাই। থাকার জায়গাও আছে নির্ধারণ করা নাম পতিতালয়। অন্ন সংস্হানের জন্য টাকার বিনিময়ে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যকে যৌনতৃপ্তি দেওয়া এই মানুষগুলোকে, আমরা পতিতা বা যৌনকর্মী বলে ডাকি।আইনগত ভাবে এদের পেশাকে স্বীকৃতি দিলেও তাদের পেশাকে সত্যিকারের পেশা হিসেবে মেনে নিতে হলেও সমাজের কাছে তারা অন্ধকার অস্পূশ্য অংশ বিশেষ বৈ আর কিছুই না।তবে এটা জেনে আপনাকে ঠিকেই অবাক হতে হবে যে, বাংলাদেশে পতিতালয়ের বৈধতা আছে।হ্যা ঠিকেই শুনেছেন।বাংলাদেশে ২০ টি বৈধ পতিতালয় রয়েছে।এগুলো হলো: ১. দৌলদিয়া পতিতালয় ২.কান্দাপাড়া  ৩.টানবাজার ৪.ভাঙ্গিনাপাড়া ৫.রথখোলা  ৬.সন্ধ্যাবাজার  এগুলো হলো রেজিস্ট্রার পতিতালয়। এ ছাড়াও দেশে এ রকম প্রায় হাজার খানেক পতিতালয় রয়েছে। এ গুলো হয়ত আপনার আমার চোখে পড়ে না।কারণ এটা যে অন্ধকার জগৎ। আমরা এবার পরিসংখ্যানে দেখবো কোন কোন কারণে কত শতাংশ পতিতা এই ব্যবসায়ে এসেছে। ১.দারিদ্র্যের কারণে প্রত্যক্ষ বা প্ররোক্ষভাবে এ পেশায় এসেছে ৫৫.১২ শতাংশ। ২.প্রেমিক কর্তৃক প্রতারিত ও বিক্রি হয়ে এসেছে ১৭.০৮ শতাংশ। ৩. স্বামী কর্তৃক বিক্রিত ১.৪৭ শতাংশ। ৪. সৎমা কর্তৃক বিক্রিত ২.৭২ শতাংশ। ৫. গুণ্ডা কর্তৃক অপহরণ ও বিক্রিত ১৫.১২ শতাংশ। স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত ছোট বেলা থেকে রয়েছে, সিনেমায় নামতে এসে এখানে এসে পরেছে, চাকরি করতে করতে এসে এখানে ছিটকে পড়েছে ইত্যাদি কারণে ৮.২৯ শতাংশ। ( সুত্র: সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ঢাকার পতিতালয়) কোন পেশায় কতজন পুরুষ পতিতালয়ে গমন করে থাকে,তা উক্ত পত্রিকার জরিপ থেকে নিচ্ছি। ১.এদিক থেকে ছাত্রদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪৩.৮৩ শতাংশ। ২.ব্যবসায়ী ১৬.৪ শতাংশ। ৩.পুলিশ ১২.৩৩ শতাংশ। ৪.চাকুরীজীবী ১৩.৭০ শতাংশ।৫.রিকশাওয়ালা ৫.৪৮ শতাংশ। ৬.বাস ড্রাইভার ১.৩৭ শতাংশ। ৭.মজুর ১.৩৭ শতাংশ। ৮.নাবালক ও অন্যান্য ৫.৪৮ শতাংশ।বাংলাদেশের পতিতাবৃত্তি আইন অনুযায়ী বৈধ, তবে তা নিয়ন্ত্রিত। পতিতা হিসেবে কাজ করতে হলে তাকে অবশ্যই নিবন্ধন হতে হবে এবং আদালতে উপস্থিত হয়ে একটি হলফনামা জমা দিতে হবে এই মর্মে যে,তারা তাদের নিজস্ব পছন্দ ও জোর-জবরদস্তি ছাড়াই পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং তারা অন্য কোন পেশা খুঁজে পেতে অসমর্থ। বাংলাদেশের পতিতাদের প্রায়ই অত্যন্ত দরিদ্র সামাজিক অবস্থার শিকার এবং ঘন ঘন সামাজিকভাবে নিগ্রহের সম্মুখীন হয়।বাংলাদেশ পতিতাবৃত্তি আইনি,তবে বাংলাদেশের সংবিধান বলছে যে, “রাষ্ট জুয়া ও পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধ করবে”। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল শিশু পতিতাবৃত্তি, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, ও অবৈধ পতিতালয় ইত্যাদির বিরুদ্ধে আইন বলবৎ আছে।২০০০ সালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত রায় দেয় যে, দেশে ১০০ জন পতিতা গ্রেফতার অভিযানী ছিল বেআইনী এবং পতিতাবৃত্তি একটি বৈধ পেশা।বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭২,৩৭৩,৩৬৪(ক) ও ৩৩৬(খ) ধারায় পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ক্রয় বিক্রয়ের শাস্তির বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।স্হানীয় কিছু এনজিওর হিসেবে ২০০৮ সালে আনুমানিক মহিলা পতিতার সংখ্যা ছিল ১ লাখ।২০১৬ সালে ইউএন এইডসের হিসেবে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১ লাখ ৪০ হাজার।যেহেতু পতিতালয় একটি বৈধ পেশা তাই একে উচ্ছেদ করা সম্ভব না। সবশেষে এটাই সত্য যে পতিতালয়ে আসা মানুষগুলো আপনার আমার কারো বোন, কারো মা।তাই আমাদের উচিৎ তাদের মৌলিক অধিকার তাদেরকে নিশ্চিত করণে সাহায্য করা, সামাজিক ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করা। সত্যি বলতে কি কেউ স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তি শুরু করে না। আমাদের সমাজ বা দেশ বাধ্য করে এ পথ বেছে নিতে।এক সময় তারা বাধ্য হয়েই এই অন্ধকার জগৎ এ পা দেয়। তাই দেশ ও সমাজের কল্যাণের স্বার্থে তাদের বিকল্প কর্মসংস্খানের সুযোগ করে দিয়ে সমাজে মর্যাদার সাথে বেচেঁ থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই তারা হয়তো ঘুরে দাড়াঁনোর চেষ্টা করবে, স্বপ্ন দেখবে নতুন করে বাচাঁর।

আরো খবর

Leave a Reply