বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২৫শে জুন, ২০১৯ ইং, ১১ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

ঈদের সেকাল একাল

ঈদুল ফিতরে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায় আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই। ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে যার শুরু। এসময় রান্না ঘরেও নানা পদ রান্নার তোড়জোর শুরু হয়। একইসঙ্গে মার্কেটে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা চলে। শুরু হয়ে গেছে একসঙ্গে দল বেঁধে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার চল। ঈদের দিন নামাজ শেষে কোলাকুলি করা, বাসায় ফিরে গুরুজনদের পা ছুঁয়ে সালাম করা মুসলিম পরিবারগুলোতে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এরপর পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার চল রয়েছে বেশিরভাগ পরিবারে। অনেকেই মৃত মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে ছুটে যান কবরস্থানে। শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রায় এখন ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে বা জন্মস্থানে যাওয়ার ধারা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে। ফলে এই ঈদকে কেন্দ্র করে মফস্বল শহরগুলোতে, গ্রামে মিলনমেলা বসে যায়। আত্মীয়-স্বজন, স্কুলে বন্ধুদের একসঙ্গে সময় কাটানোর উপলক্ষ হিসেবে দেখা দেয় ঈদ। এসব কিছুই এখন ঈদ উদযাপনের নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে।

ঢাকায় ঈদের দিনে সিনেমা হলগুলোতে ভিড় জমে যায়। বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কে সিনেমা দেখার জন্য মানুষের ভিড় জমে। চিড়িয়াখানা, শিশু পার্কসহ নগরীর বিনোদনকেন্দ্রগুলো জমজমাট থাকে ঈদের দিনগুলোতে।

বর্তমানে সাধারণভাবে এভাবেই পালিত হয়ে থাকে ঈদ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের রং বদলায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় ঈদের আনন্দ উদযাপনের ধরন। তবে শৈশব, কৈশোরের ঈদ আনন্দের স্মৃতিই সবার মনে চিরজাগরুক থেকে যায়। এখনকার ঈদ আনন্দের নাকি সেকালেই ঈদে আনন্দের উপলক্ষ ছিল বেশি- এই প্রশ্ন জাগে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই মনে। ঢাকায় মোঘল ও নওয়াবদের আমলে ঈদ উদযাপনে ছিল রাজকীয় আমেজ। সে ঈদ দিনে দিনে হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের উদযাপনের উপলক্ষ। পুরানো ঢাকার উর্দু রোডের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব ইলিয়াস মোল্লা বললেন, ‘ঈদের আনন্দ আছিল আমাগো সময়। চকের মেলা ঈদের মিছিলের এহন আর সেই মজা নাই। চকের মেলায় মিষ্টির স্বাদ এহনো ভুলবার পারি না। মুখে লাইগা আছে।’ আর ধানমন্ডির বাসিন্দা কিশোর হাসান আবরার জানালো, ‘ঈদের দিনে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে বন্ধু, কাজিনদের সঙ্গে। লং ড্রাইভে যেতেও ভাল লাগে।’ তবে পুরানো ঢাকার ঈদের মিছিলের কথা শোনেনি সে। তাছাড়া গরমের মধ্যে মিছিলে যেতে সে পছন্দও করে না।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঈদ মিছিল: ঈদ উত্সবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঈদের মিছিল, যার শুরু সুবাদার ইসলাম খাঁর সময়ে। এই ধারাবাহিকতায় নিমতলী প্রাসাদে বসবাসকালীন নায়েব-নাজিমদের সময়েও হতো ঈদের মিছিল। উনিশ শতকের শুরুতে আলম মুসাওয়ার নামক চিত্রশিল্পীর আঁকা ছবিতে তার প্রমাণ মেলে। নায়েব-নাজিমদের বংশ লুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদের রাজকীয় মিছিলও হারিয়ে যায়। উনিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে ঢাকায় আবার ঈদের মিছিল চালু হয়।

মোঘল ও নওয়াবী আমলের ঈদ

মোঘল আমলে ঢাকায় ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথান তার বাহারীস্তান-ই-গায়বী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় যখন নতুন চাঁদ দেখা গেল, তখন শিবিরে বেজে উঠল শাহী তূর্য। একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী ছুঁড়তে থাকে গুলি, যেন তা আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলে এ আতশবাজি। শেষ রাতের দিকে বড় কামান দাগানো হয়। তাতে সৃষ্টি হয় ভূমিকম্পের অবস্থা।’ মোঘল আমল ছাড়াও ইংরেজ আমলেও ঢাকায় চাঁদ দেখার এমন আয়োজন অব্যাহত থাকে। তখন ঢাকার প্রতিটি ভবনের ছাদে ছোট-বড় সবাই চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করতো। চাঁদ দেখামাত্র চারদিকে আনন্দ-উত্সব শুরু হয়ে যেত। জানা যায়, নওয়াব স্যার খাজা আব্দুল গনির (১৮১৩-১৮৯৬) সময় থেকে চাঁদ দেখা, ঈদ উত্সব পালন ও ঈদ মিছিল জাঁকজমকের সঙ্গে শুরু হয়। এরপর নবাব আহসান উল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১) ও নবাব সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫) প্রমুখ ঢাকায় চাঁদ দেখার আয়োজন ও ঈদ মিছিল করেছেন। বুড়িগঙ্গা নদীর ঘাটে তাঁদের কিছু বজরা বাঁধা থাকতো। চাঁদ দেখার জন্য সেসব বজরা ব্যবহার করা হতো। নাজির হোসেনের লেখা ‘ঢাকার ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায়, ১৭০২ সালে মুর্শিদকুলি খান তার দেওয়ানি বিভাগ মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। এর কিছুদিন পর মোগল সুবে বাংলার রাজধানী নিয়ে যাওয়া হয় সেখানেই। ফলে ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়। তবে রাজধানীর মর্যাদা হারালেও নায়েবে-নাজিমদের আমলে ঢাকায় ঈদের চাঁদ দেখা, ঈদ জামাত, ঈদ মিছিল ও ঈদ মেলার জৌলুস বজায় ছিল। সে ধারাবাহিকতায় রং মিশিয়েছেন নওয়াবরা। প্রযুক্তির উত্কর্ষে আজ সেই উত্সবে যুক্ত হয়েছে নিত্যনতুন মাত্রা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দের ধরন বদলে যায়। তবে কিছু কিছু আয়োজন সময়ের গন্ডি পেরিয়ে পরিণত হয় ঐতিহ্যে। বাঙালিদের ঈদ উদযাপনেও রয়েছে ঢাকার নওয়াবদের ঈদ উদযাপনের প্রভাব।

মোগলরা যে ঈদের গুরুত্ব দিতেন তা বোঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় শাহী ঈদগাহর ধ্বংসাবশেষ দেখে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দ হিসেবে যুক্ত হয় লোকজ মেলা। সে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

ঈদ উদযাপনের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ মজাদার খাবারের আয়োজন। ঘরে ঘরে সেমাই রান্না তো আছেই, সেই সঙ্গে থাকে কোরমা-পোলাও, পায়েস, জর্দা, পিঠার আয়োজন। বিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশ দশকে ঢাকায় ঈদের দিন রমনা, আরমানিটোলা বা অন্যান্য মাঠে ‘খটক’ নাচ অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়া ছিল নৌকা বাইচ, ঘুড়ি ওড়ানো, ঘোড়দৌড়, হিজরা নাচ ইত্যাদি। ঘোড়দৌড় ও হিজরা নাচ ছিল ঢাকার বাবু কালচারের অঙ্গ, যা যুক্ত হয়েছিল ঈদ উত্সবের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাদেশে দুটি ঈদই জাতীয় ধর্মোত্সবে রূপান্তরিত হয়।

আরো খবর

Leave a Reply