বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৮ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রের উচ্চতায়, ডুববে বাংলাদেশের বড় অংশ

মাহমুদুল হক আনসারী
পৃথিবীতে জলবায়ুর অব্যাহত পরিবর্তনে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে। কার্বন নির্গমনে লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ধারণার চেয়ে ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা করছে বিজ্ঞানীরা। এ পরিণতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের বড় একটি উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের। ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ সাগরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। হুমকিতে পড়বে নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মতো বড় বড় শহরের নাগরিক জীবন। গবেষণায় বলা হচ্ছে বৈশ্বিক উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা যে পরিমাণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তা বাস্তবতার চেয়ে অনেক কম। কারণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, প্রচলিত হিসেবে গ্রীনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার বিষয়টি এক রকম উপেক্ষা করা হয়েছে। বাস্তবে বরফ গলার হিসেবের সঙ্গে গ্রীনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার নাম যোগ করলে বিশ্বের পরিণতি আরো ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হবে। ২০১৩ সালে একটি ধারণাপত্র প্রকাশ করে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ইন্টারগর্ভানমেন্টাল প্যানেল(আইপিসিসি)। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বর্তমান হারে কার্বন নির্গমন অভ্রাহত থাকলে বৈশ্বিক উচ্চতা ২১০০ সাল নাগাদ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৫২ থেকে ৫৮ সেন্টিমিটার। কিন্তু প্রসিডিংস অব দ্যা ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এ গবেষণার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরো ভয়াবহ চিত্র। গবেষকরা বলছেন, বর্তমান হারে কার্বন নির্গমন ঘটতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে ৬২ থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার। গবেষকরা বলছেন, ২১০০ সাল নাগাদ তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে শুধু গ্রীনল্যান্ডই প্রভাব ফেলবে। কিন্তু ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি বাড়লেই অ্যান্টার্কটিকার বরফও ব্যাপক হারে গলতে শুরু করবে। গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক জনাথন ব্যাম্বার বলেন, এটা শুধু একটা অনুমান নয়। পূর্ব ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার বাস্তবিক আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার মানে হলো পৃথিবীর জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। কার্বন নির্গমন না কমলে বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ বর্গকিলোমিটার স্থলভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে, যা লিবিয়ার আয়তনের সমান। গবেষকরা আরো বলছেন, এসব জমির বেশির ভাগই আবাদি। বিশেষ করে, বাংলাদেশের বড় একটা অংশ এ ক্ষতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা কঠিন হয়ে পড়বে। এ হুমকিতে পড়বে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও সাংহাইয়ের মতো শহরের জনজীবনও। বিজ্ঞানীরা আরো বলেন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে ইউরোপে ১০ লাখের অধিক শরণার্থী প্রবেশ করেছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২ মিটার বেড়ে গেলে বিশ্বকে এর চেয়ে ২০০গুণ বেশি শরণার্থীর মোকাবিলা করতে হবে। আগামী কয়েক দশকে কার্বন নির্গমন কমাতে পারলে এই পরিণতি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা জানান। তারা আরো আশঙ্কা করছে, প্রতিবেদনটি সত্যি হওয়ার ৫ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে। তারা বলছেন, গবেষণায় আশঙ্কার কথা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবিকভাবেই হুমকি হিসেবে বিশ্বকে গ্রহণ করা উচিত। পৃথিবীর মানুষ যেখানে ঝুঁকি থাকে সেখান থেকে সাবধানে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। প্রতিবেদনটি বাস্তবে পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি সতর্কতা। এ সতর্কতাকে আশঙ্কা হিসেবে গ্রহণ করে পৃথিবী সাবধানে পরিচালিত হলে দুনিয়া নিরাপদ হবে। আর যদি এভাবে বৈশ্বিক উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে পৃথিবীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সাথে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা তলিয়ে যাবে। এ আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বের পরিবেশবাদী নেতৃবৃন্দকে পরিবেশ রক্ষার সঠিক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণের সঠিক ও বাস্তব কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। বৈশয়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্থ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পাশে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। তার সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিরাট চাপ বাংলাদেশকে সইতে হচ্ছে। পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকা জুড়ে তাদের বসবাস। উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশে তারা আশ্রয় পেলেও তাদেরকে নিজ ভূমি মায়ানমারে ফেরত নিয়ে যাওয়ার বাস্তব প্রস্তুতি দেখছি না। এসব উদ্বাস্তু এবং বাংলাদেশের উপকূলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জীবনের আশঙ্কা কোনো অবস্থায় উড়িয়ে দেয়া যায় না। বাংলাদেশ সরকারকে জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কায় এদেশের ব্যাপক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবী করতে হবে। যাদের কারণে বাংলাদেশের মতো ছোট ছোট দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা আছে, এখন থেকেই আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনের শরণাপন্ন হতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও নিজস্ব পরিবেশ রক্ষায় সঠিকভাবে কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবেশ বিরোধী কোনো ধরনের কর্মকান্ড প্রশ্রয় এবং সুযোগ দেয়া যাবে না। উপকূলীয় জনগণকে সুরক্ষা দিতে স্থানীয় বেড়িবাঁধ রক্ষা ও সংস্কার করতে হবে। বৈশয়িক জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে বছরে কয়েক দফা ঝড়, সাইক্লোনের আশঙ্কা ও হুমকি প্রতিনিয়ত জনগণ মোকাবিলা করছে। সুতারাং ওই প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিশাল একটি অংশের জন্য অবশ্যই হুমকি। এটাকে কোনো অবস্থায় ছোট করে না দেখে দেশ ও জনগণকে নিরাপদে রাখার সঠিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করাটাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

আরো খবর

Leave a Reply