বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২১শে মে, ২০১৯ ইং, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

আহলান ওয়া সাহলান রামজানুল মোবারক

মাহমুদুল হক আনসারী
স্বাগতম মাহে রামজানুল মোবারক। আহলান ওয়া সাহলান রামজানুল মোবারক। বারো মাসের শ্রেষ্ঠ মাস রামজানুল মোবারক। পবিত্র রোজা পালনের মাস রমজানুল মোবারক। সেহরী ও ইফতারের মাস রামজানুল মোবারক। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে করে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো। আল কোরআনের বাণীতে মহান আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার নর-নারীদের উদ্দেশ্য করে পবিত্র কোরআনের ওই বাণীতে তাদেরকে তাক্বওয়া অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি অর্জন করতে রোজা পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা পালন পৃথিবীর আদিকাল সমস্ত নবী রাসূলের সময়কালে ছিলো। রোজা এমন একটি ইবাদত যে ইবাদতের পুরষ্কার স্বয়ং আল্লাহ তাঁর বান্দাকে দিবেন। এমন প্রতিশ্রুতি পবিত্র হাদিসে কুদসির মাধ্যমে মুসলিম সমাজ জানতে পারে। অন্যসব ফরজ ইবাদত আর রোজার মধ্যে কতিপয় বিষয়ে তফাৎ রয়েছে। নামাজ, হজ্ব ও যাকাত দৃশ্যমান ফরজ ইবাদত। কিন্তু রোজা দৃশ্যমান কোনো ফরজ ইবাদত নয়। রোজা যিনি আদায় করবেন তিনি ছাড়া প্রকৃতভাবে কেউ জানবার সুযোগ নেই, আসলে কে রোজাদার মানুষ আর কোন মানুষটি রোজা রাখেননি। রোজা রাখার যে বিধান শরিয়তে বিদ্যমান সে নিয়মেই একজন রোজাদারকে রোজা পালনের নিয়ম। এখানে নিয়ম বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়। রোজার গুরুত্ব, হক, গাম্ভির্য্য, তাক্বওয়া অর্জনই হচ্ছে বান্দার অন্যতম দায়িত্ব কর্তব্য। রোজা মুসলিম সমাজের জন্য কতিপয় বিষয় থেকে বিরত থেকে ত্যাগ ও ভোগ বিলাস বর্জন করে অধিকভাবে আল্লাহর প্রেমে বান্দাকে তৈরী করায় রোজার মূল উদ্দেশ্য। অন্যসব ফরজ ইবাদত দৃশ্যমান হলেও রোজা অদৃশ্য একটি মহৎ ও মহান ইবাদত। যার পুরষ্কার স্বয়ং আল্লাহর হাতেই। রোজাদারের কথা বার্তা আহার আরাম আয়েশ ও বিশ্রাম সবকিছুই ইবাদতের মধ্যে গণ্য। রমজান মাসের চাঁদ উঠার পর থেকেই সব ধরনের ইবাদতের হিসেব পালটে যায়। একটি ফরজের সাওয়াব সত্তরটি ফরজের সমতুল্য। আর একটি নফল ইবাদতের মূল্য সত্তরটি নফলের সমান। এভাবে একটি দানের প্রতিদান সত্তরটি দানের সমান। একটি টাকার সাওয়াব সত্তর টাকা দান করার প্রতিদান মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দার আমলনামায় দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রমজান মাসের রোজা আর সেহরী, ইফতার সবকিছু অধিক ইবাদত। সেহরী খাওয়া সুন্নাত আর সাওয়াব। ইফতার করা সুন্নাত আর অসংখ্য সাওয়াব ফেরেশতাগণ আল্লাহর বান্দার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করেন। তার বিপরীত রমজান মাসে একটি গুণাহ সত্তরটি গুনাহের মধ্যে তার হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। রোজাদারকে তার জিহ্বা, আচার, ব্যবহার সংবরণ করতে বলা হয়েছে। পরনিন্দা, চুগলখুরী, গিবত, থেকে রোজাদারকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অহেতুক আড্ডা, অযাচিত গল্পগুজব না করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রোজার ফযিলত বরকত যেমনিভাবে দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অনূরূপ ভাবে রোজার ফযিলত তাক্বওয়া মর্যাদা বিরোধী কর্মকান্ড হতে বিরত থাকতে রোজাদার ও মুসলিম সমাজকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রোজার ফজিলত রহমত, নাজাত ও মাগফেরাত। রোজা পালনকারী সত্যিকারভাবে রোজা পালন করলে তিনি রহমত, নাজাত ও মাগফেরাতের অধিকারী হবেন। রোজা পালনকারীকে মহান আল্লাহ তাঁর গুণাহ মাফ করবেন। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দান করবেন। ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি প্রাপ্ত হবেন। রোজা পালনকারীকে অবশ্যই তার আচার ব্যবহার লেনদেন, ক্রয় বিক্রয় সবকিছুতেই আল্লাহর ভয় অর্জন করতে হবে। কোনো অবস্থায় রোজা পালনকারী তার সতীর্থ অথবা সমাজের অন্যকোনো জাত গোষ্ঠীর উপর জুলুম নির্যাতন ব্যাভিচার অন্যায় আচার ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো সৃষ্টির উপর কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ করা রোজার আদর্শের পরিপন্থি। রোজা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ে কতিপয় বিষয় বিরত থাকলেই হলো না। মানুষের হক, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার যে পরিমাণ দায়িত্ববোধ আদায় করার কর্তব্য রয়েছে, তা পরিপূর্ণভাবে পরিশোধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। তার চেষ্টা সেটা মহান সৃষ্টিকর্তা দেখবেন। আর চেষ্টা না করে ইবাদতের পোশাক পরে যেকোনো ধরনের জুলুম নির্যাতন ব্যাভিচার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব অবহেলা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য রোজাদারের আদর্শেও মধ্যে তিনি গণ্য হবেন না। অবশ্যই একজন মুসলিম রোজাদারকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাথে সাথে সমাজের যেকোনো গোত্র মানুষের প্রতি ন্যায় পরায়ণ আচার ব্যবহার করতে হবে। ব্যবসা, লেনদেন নেতৃত্বে তার যথাযথ দায়িত্ব পালন থাকতে হবে। একজন সাধারণ জনগণ থেকে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যার যার স্থান থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ন্যায় পরায়ণতা দেখাতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকার অন্যায়ভাবে ব্যবহার ও লুটপাট করা যাবে না। দুর্নীতি আর ঘুষের অবৈধ অর্থের দাপট দেখিয়ে যেকোনো ইবাদত বন্দেগীতে আধিপত্য বিস্তার করার নাম ইবাদত নয়। ইবাদত অবশ্যই বিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন হতে হবে। রোজার বিশুদ্ধ ইবাদতে অন্যের অধিকার ও হক ধ্বংস করা যাবে না। ব্যাক্তি পরিবার ও সামাজিকভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষকে সঠিকভাবে তার মর্যাদা দিতে হবে। সকল মানুষের নাগরিক অধিকার মর্যাদা পাওয়া রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক অধিকার। রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে মানুষের প্রতি শৃঙ্খলা ও দায়িত্বনুভূতি জাগ্রত করার শিক্ষা দিচ্ছেন। রোজা শুধুমাত্র কতিপয় বিষয় থেকে বিরত থাকা আর কিছু বিষয় অনুসরণ করার নাম রোজা নয়। রোজা সামষ্টিকভাবে একটি সমাজকে শৃংখলাপূর্ণভাবে তৈরি করার নামই রোজার সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এভাবে একজন রোজা পালনকারী থেকে পুরো মুসলিম সমাজ রোজার তাৎপর্য অনুধাবন করলেই বাস্তবে রোজার সঠিক উদ্দেশ্য ও কল্যাণ সমাজে প্রতিষ্ঠা হবে।

আরো খবর

Leave a Reply