বাংলাদেশ, বুধবার, ১০ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মহান মে দিবস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

 

আবছার উদ্দিন অলি

শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার আদায় নিয়ে কোন রাজনীতি করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অধিকার আদায়ের নামে দেশের সম্পদ নষ্ট করা কাম্য নয়। শ্রমিক-মালিক-সরকার তিনপক্ষ যে কোন সমস্যা সমাধানে একটেবিলে আন্তরিক ভাবে বসলে সমাধান হয়ে যায়। ভাংচুর, হট্টগোল, নৈরাজ্য করে সমাধান মিলবেনা। প্রতিষ্ঠানের মালিক যেমন শ্রমিকদের দিকে নজর দিবেন, তেমনি শ্রমিকরাও প্রতিষ্ঠান কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেতন-ভাতা নিয়ে এখনো গার্মেন্টস গুলোতে অসন্তেুাষ দেখা যায়। এখনো শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা অব্যাহত আছে। এসব সমস্যার সমাধান খুবই জরুরী। একদিন ঘটা করে মে দিবস পালন করলাম, বক্তব্য রাখলাম, মিছিল করলাম, তারপর সারা বছর আর খরব থাকে না, এটা হওয়া উচিত না। প্রতিষ্ঠান বাঁচলে মালিক তার ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে। আর মালিক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারলে শ্রমিক বাঁচবে। এই সহজ ও সত্য কথাটি সবাইকে বুঝতে হবে।

শ্রমিকদের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারলে তাদের বিনামূল্যে পড়ার ব্যবস্থা করবে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের সব খাতের শ্রমিকদের সন্তানদের এই সুবিধা দিতে ‘শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতদিন শ্রমিকদের সন্তানদের বিভিন্ন পরীক্ষার ফি সহ আনুষাঙ্গিক কিছু সুবিধা দেয়া হত। বিধিমালা সংশোধন করে উচ্চ শিক্ষায় যেসব শ্রমিকদের সন্তান ভর্তি হবে সরকার তাদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়তে পারছে। কোনো শ্রমিকের সন্তান যদি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে সরকার তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাবে।

বর্তমানে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালার আওতায় একজন শ্রমিককে এককালীন ২০ হাজার দেয়া যায়। বিধিমালা সংশোধন করে শ্রমিকদের এককালীন এক লাখ করে টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান শ্রম সচিব। গোষ্ঠী বীমার আওতায় মটরযান শ্রমিক মটরযান শ্রমিকদের জন্য গোষ্ঠী বীমা স্কিম চালু করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর উপস্থিতিতে ১৫এপ্রিল সচিবালয়ে মোটরযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ইসমাইল এবং শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ফয়জুর রহমান নিজ নিজ পক্ষে গোষ্ঠী বীমা স্কিম চুক্তিকে সই করেন।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন-২০০৬ এর আওতায় গত বছরের ১৮ নভেম্বর নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য গোষ্ঠী বীমা স্কিম চালু করে সরকার। ওই স্কিমের আওতায় ইতোমধ্যে ৩০৩ জন নির্মাণ শ্রমিক বীমার আওতাভুক্ত হয়েছেন। মটরযান শ্রমিকদের মধ্য থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে এক হাজার জনকে এই বীমা স্কিমের আওতায় আনা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি স্কিমে বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ হবে দুই লাখ টাকা। প্রিমিয়ামের পরিমাণ হবে বছরে এক হাজার তিনশত টাকা। এর মধ্যে মেকানিক শ্রমিক দেবে সাড়ে চারশ এবং শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন দেবে সাড়ে আটশ টাকা। চুক্তির মেয়াদ শেষে মটর যান শ্রমিকরা প্রিমিয়ামে জমাকৃত ৫০ শতাংশ ফেরত পাবে।

মে দিবসের অঙ্গীকার হোক সুস্থ ভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা চাই। পহেলা মে, মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও ৮ঘন্টা শ্রম সময় নির্ধারণ সহ অন্যান্য দাবিতে এক সাধারন ধর্মঘট ডাকা হয়। হে মার্কেটে গণজমায়েতেরও আয়োজন করে। এ সময় শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। পরবর্তীতে শ্রমিকদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পহেলা মে কে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর পহেলা মে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার ও ঐক্য সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে লাল হরফে লেখা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে এ দিনটি। বিশ্বের শ্রমজীবি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় দিন। বিশ্বের সকল মেহনতি মানুষের মুক্তি ও অধিকার অর্জনের অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ পহেলা মে। শ্রমিক শোষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে আত্মত্যাগের এক মহান আদর্শে উজ্জীবিত এ দিন। দুঃখজনকভাবে একশ বছর আগেকার সেই সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। বরং সেই একই কায়দায় এবং কৌশলে শ্রমিকরা নিগৃহীত শোষিত বঞ্চিত বিশেষ বছর তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোর শ্রমিকদের অবস্থা সত্যিই নিদারুণ কষ্টের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরও শ্রমিকরা এখনো অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে রাত্রি যাপন করে। অনেক দেশে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেয়া হয় না।

আমাদের দেশেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন তাদের মজুরি সংক্রান্ত দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি আমাদের দেশে এখনো শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশেও প্রতি বছর মহান মে দিবস, পালিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে। এই উপলক্ষে থাকে সভা সমাবেশ। এই উপলক্ষে আয়োজিত সভা-সমাবেশে সারগর্ভ বহু বাণী প্রদান করেন জাতীয় পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। কিন্তু পরদিন থেকেই আবার গতানুগতিক জীবন স্রোতে ভেসে চলে সবাই। তাই আজও দেশের সরকারী অফিস আদালত প্রতিষ্ঠান আর কলকারখানার উৎপাদনমুখি কর্মকান্ডের চেয়ে দিনগত ঝরে যাচ্ছে বহু অমূল্য প্রাণ, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কলকারখানা। অন্যদিকে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না। ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান এর প্রকৃত উদাহরণ। অন্যদিকে শিশু শ্রমের প্রথা ও প্রচলিত। বিভিন্নক্ষেত্রে নিয়োজিত এ সমস্ত শ্রমিকেরা নানাভাবে শোষিত হচ্ছে। তাদের জীবন হচ্ছে হুমকির সম্মুখীন। তারা অপুষ্টির শিকার, অমানবিক ব্যবহারের শিকার অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যেরও শিকার। আমাদের শ্রমিক সমাজ এখনো কতটা যে নিগৃহীত তা বিভিন্ন শিল্প কারাখানার দিকে লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। গার্মেন্টস শিল্পে এ মাত্রাটা বেশি। কিন্তু এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আস্থা খুবই শোচনীয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ অরুচিসম্পন্ন জায়গায় শ্রমিকরা এখানে গতর খাটুনি খাটে। কিন্তু মজুরির বেলায় কর্পদহীন। দেশে এখানো গার্মেন্টস রয়েছে যেখানে শ্রমিকদের তিন মাসের পারিশ্রমিক বাবদ এক মাসের বেতন ধরিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া গার্মেন্টস পেশায় নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। এখানে শ্রম দিতে এসে নারীরা ধর্ষিত হওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে এবং আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে প্রাণহানী ঘটে চলেছে। এ অবস্থা গার্মেন্টস শিল্প হতে শুরু করে অনেক জায়গা পর্যন্ত বি¯তৃত। এই যদি হয় শ্রমিকদের অবস্থা তাহলে মে দিবস পালনের স্বার্থকতা কোথায়। যদিও সরকারিভাবে বারবার বলা হচ্ছে আইনানুগতভাবে কারখানা পরিচালনা করার কথা, তবুও আজ পর্যন্ত এই অসংগতিপূর্ণ ব্যবস্থা দূর হয়নি। আমাদের অধিকাংশ কলকারখানয় মে দিবসের জাতীয়ভাবে স্মরণ করার পেছনে শ্রমিকদের সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেও কাজ করেছে। এই সঙ্গে মালিকদেরও যাতে শ্রমিকের ন্যায্য দাবির প্রতি সচেতনতা থাকার তাগাদা তাও মে দিবস থেকে উৎসারিত। তাছাড়া দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে হরতাল নির্ভর সংস্কৃতির চর্চা সেখানে মেহনতি মানুষ বিশেষ করে যাদের দিনে এনে দিনে খাওয়ার অবস্থা তাদের জীবিকা নির্বাহ করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

শ্রমজীবি মানুষ এখনো পূঁজির শোষণ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। প্রতি বছর তারা মে দিবসে নতুন করে শপথ নেয় তাদের নিজ নিজ দেশে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়ার মওদুর এক হও এক হও এটা নিছক একটা শ্লোগান হয়। এটা শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবি মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত ব্যঞ্জনাময় ধ্বনি। আমরাও চাই দুনিয়ার মজুদুর ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্ব শান্তি সমৃদ্ধির পথে হোক সহায়ক শক্তি। বঞ্চনার মাঝে সব পাওয়ার পরিপূরক দুর হোক শ্রমিক মালিক বিশাল ব্যবধান আর বৈষম্য। সাম্যের পতাকাতলে সামিল হোক সবাই ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের জয়গান গেয়ে। নানা আয়োজনে মে দিবস উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম ডি.সি হিলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান মালার আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভা, র‌্যালী, সম্মাননা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হবে মে দিবস। শ্রমিক হয়রানী, শ্রমিক অসন্তেুাষ, পাওনা আদায়ে অফিসে দিনের পর দিন দৌড়ঝাপ এখনও বিদ্যমান। অফিসার কোন কাজের জন্য গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা বিভিন্ন অজুহাতে কাল বিলম্ব করা এখনও বন্ধ হয়নি। দুষ্ট চক্রের থাবায় আমাদের শ্রমিক যেন নির্যাতিত না হয়, যেন কোন অনিয়ম না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরদারী খুব বেশি প্রয়োজন।

আরো খবর

Leave a Reply

Close