বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

লামা প্রেসক্লাব সফলতার ২৯ বছরে পদার্পণ

মো.কামরুজ্জামান
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতণা, গণতন্ত্রচর্চা, সমাজ সচেতনতাসহ এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯১ সালে লামা-আলীকদম প্রেসক্লাব গঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে আলীকদম প্রেসক্লাব গঠিত হলে, “লামা-আলীকদম প্রেসক্লাব” নাম পরিবর্তন হয়ে “লামা প্রেসক্লাব” নাম করণ হয়।
অনেক চড়ই উৎরায় পার করে লামা প্রেসক্লাব ২৯ তম বছরে পা রেখেছে। সমাজ-সভ্যতার কাল পরিক্রমায় লামা প্রেসক্লাব এখানকার মফস্বল সাংবাদিকতায় অত্যান্ত নিষ্টার সাথে গণমূখি ভুমিকা রেখে চলেছে। গ্রামীণ সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে লামা-আলীকদম উপজেলার সংবাদকর্মীরা অর্জন করেছে ব্যাপক সুনাম। সমস্যা, দুর্নীতি, উন্নয়ন- সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিনিয়ত এখানকার সাংবাদিকরা লেখা-লিখি করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে লামা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক, স্থানীয় দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকার পাশাপাশি ইলিক্ট্রনিক মিডিয়িায় নিজেদের পেশাগত অবস্থান দৃড় করে নিয়েছে।
“সাংবাদিকতা দেশ জাতির কল্যানে নিবেদিত” এটা যেমন চিরন্তন সত্য, তেমনি লিখনি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ দর্পনে বাস্তবতা চিত্রায়িত করাও সাংবাদিকদের কাজ। বিবেক, মনষ্যত্ব, নৈতিক চেতণা ও দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সাংবাদিকরা বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের লেখায় প্রতিফলিত হয় জীবনের কথা, উন্নয়নের কথা, সত্য-সুন্দর ও বৈচিত্রময় জীবন ঘনিষ্ট নানা দিক।
সংবাদপত্র শিল্পে সর্বজন স্বীকৃত যে, মফস্বলে তথা উপজেলা শহরে যাঁরা সাংবাদিকতা করেন, তাঁরা প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিকুলতার মূখমুখি হন। জেলা ও বিভাগীয় শহরের সাংবাদিকরা তথ্য প্রযুক্তিতে অনেক আগ থেকে সমৃদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে মফস্বলেও আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়াঁ লেগেছে। লামা উপজেলার ক্ষেত্রে সংবাদ কর্মিদের নিজস্ব প্রচেষ্টার বাহিরে প্রযুক্তিগত উন্নতির ছোয়াঁ লাগেনি। একদা বাংলাদেশ সেনাবহিনীর পক্ষ থেকে কিছু সহযোগিতা পেলেও লামা উপজেলার সাংবাদিকরা কখনো সরকারি অন্য প্রতিষ্ঠানের পৃষ্টপোষকতা বা আনুকুল্য পায়নি। এর উপর সত্য প্রকাশে অনেক সময় প্রশাসন ও নেতা-পাতি নেতাদের চোখ রাঙানী সইতে হয়। কারো ন্যর্য-অন্যর্য অনুরোধ রাখা না রাখার বিষয়েও কষ্ট পেতে হয় সাংবাদিকদের।
এখানকার সংবাদ কর্মিরা প্রায় এক দশক আগেও সংবাদ প্রেরণে পার্শ্ববর্তী উপজেলা চকরিয়া গিয়ে ফ্যাক্স-এর মাধ্যমে, এর আগে সরকারি টিএন্ডটিতে টেলিফোনে সময়মত সংবাদ বার্তা প্রেরনেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো। এসব প্রতিকুল পরিবেশ মোকাবেলা করে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে সংবাদ কর্মিরা।
প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত:
১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মাহমুদল হাসান পিএসসি ও ৬৯ ব্রিগেড কমান্ডার বি: জে: এম শাখাওয়াত হোসেন লামা প্রেসক্লাব ভবনের নীচতলার উদ্বোধন করেছিলেন। জায়গা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো: আলীমিয়া। এর আগে ৮০’র দশক থেকে এম রুহুল আমিন, প্রিয়দর্শী বড়–য়া, ইবনে আমিন, ইব্রাহীম, দীলিপ দাশ, উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গা, নটুকান্তি, মো: রফিক আহমেদ লামা-আলীকদম নাম করণে প্রেসক্লাবটির প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেন।
পরবর্তীতে মা: আমিনুল হক আযাদ, বীর শহীদ আবদুল হামিদের ভাই মঞ্জুরুল কাদের, জয়নাল আবেদীন, মু: কামলুদ্দিন, তাজুল ইসলাম, তানফিজুর রহমানসহ আরো ক’জন যুক্ত হন এই পেশায় ও প্রেসক্লাবে। একই সময় এই এলাকায় মফস্বল সাংবাদিকতার স্বীকৃতি অর্জনের পথ প্রসারিত হয়। নানামূখি প্রশাসনের আধিপত্যতা সেইসব সংবাদ কর্মিদেরকে পড়তে হতো নানা জটিল পরিস্থিতিতে। কম্ভুকর্ণের খুশি করতে না পেরে অনেক সময় জগন্য ষডযন্ত্রের শিকার হয়ে নাজেহাল হওয়ার নজির ও রয়েছে প্রবীন সেসব সাবাদিকদের। তৎসময়ে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতেও বাধ্য হয়েছিলেন।
মাতামুহুরী নদী বিধৌত, দু;খিয়া- সুখিয়া পাহাড় পাদদেশে ছোট্ট লামা শহরটি নদী তীরে অবস্থিত। মাতামুহুরীর মিঠাপানির উৎসকে কেন্দ্র করে নদী উপত্যকাকে ঘীরে মূলত: প্রাচীনকালে গড়ে উঠে এখানকার সভ্যতা। আরাকান রাজ কন্যা লামা সুন্দরীর নামানুসারে এই স্থানের নাম করণ “লামা” হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর ৮০’র দশক থেকে লামায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস সূচিত হয়ে- তিন দশক পার করতে চলেছে লামা প্রেসক্লাব।
নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বলিষ্ট লেখনীকে ধারণ করে “আধাঁর টুটির বাঁধন” ছিন্ন করেছে কলম সৈনিকেরা। নৈরাজ্যকর সমাজ ব্যবস্থা ও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেও লেখনীতে এখানকার সংবাদকর্মীরা পিছপা হননি। সতত প্রাণের বন্যায় উজ্জ্বীবিত থেকেছে তারা। ফলে এখনো পর্যন্ত সাংবাদিকদের সংগঠন লামা প্রেসক্লাব বিভিন্ন দিক থেকে সু-নাম বজায় রেখে চলছে। সকল চোখ রাঙ্গানো ও ষড়যন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ রয়েছে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।
সংবাদকর্মীদের সমন্বয়, সেনাবাহিনী, সিভিল প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় প্রেসক্লাবটি আজ ত্রিতল ভবন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবান জেলা পরিষদ-এর আর্থিকানুকুল্যতায় আধুনিক আসবাবপত্র ও পার্বত্য মন্ত্রীর সু-দৃষ্টি রয়েছে এ প্রেসক্লাবে। একটু একটু করে এখন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ হয়েছে লামা প্রেসক্লাব।
স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা ও মান বৃদ্ধিতে এ প্রেসক্লাব সচেতনতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। লামা প্রেসক্লাবে প্রতি তিনবছর পর পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর/১৭ সালে বর্তমান কমিটি গঠিত হয়। কমিটিরি, সভাপতি- প্রিয়দর্শী বড়–য়া, সহসভাপতি তানফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো.কামরুজ্জামান, যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মো: ফরিদ উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: নুরুল করিম আরমান, কোষাধ্যক্ষ এম বশিরুল আলম, মো: নবীর উদ্দিন, মো: সাহাব উদ্দিন রিটু, মংচিংপ্রু মার্মা ও মো: রফিক সরকার প্রেসক্লাবের সদস্য।
গঠনতন্ত্রের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে গঠিত কার্য নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যদের সুচিন্তিত মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হয় প্রেসক্লাবে। ক্লাবের প্রত্যেক সদস্য পরস্পর ভ্রতৃত্বের বন্ধনে থেকে অত্যান্ত দায়িত্ব ও সচেতনতার সাথে লেখা-লিখি করে চলছেন। প্রেসক্লাবে রয়েছে সাংবাদিকদের নিজস্ব ডিজিটাল তথ্য প্রক্তুক্তি। এছাড়াও রয়েছে ক্লাবের সভাকক্ষ-অত্যাধুনিক মিডিয়া সেন্টার, রিপোর্টিং রুম, লাইব্রেরী শাখা টেলিফোন, কালার টিলিভিশন, বিকল্প বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা সোলার প্যানেল। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি ক্লাবের তৃতীয়তল অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক মানের আসবাবপত্র দিয়েছেন।

লামা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা দেশের শীর্ষ স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা ও ইলিক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিকতায় তাদের পেশাগত যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। দেশের প্রায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংবাদপত্রে এই উপজেলার যে কোন চালচিত্রের সংবাদ অতি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পাচ্ছে।
সাংবাদিকতার মহান পেশায় ঐতিহ্য ও সুনামকে অক্ষুন্ন রেখেই সততার সাথে, অনেক ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে সংবাদকর্মীরা। এই কর্ম তৎপরতায় সুফল পাচ্ছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী। অগ্রগতির পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতাও বিদ্যমান। ইতোমধ্যে জগন্য, জটিল ও কুটিল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে প্রেসক্লব সদস্যরা। রক্তচক্ষুর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করতে হয়েছে ক্লাবের সদস্যদের। সমাজ ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের গভীর ও হীন ষড়যন্ত্রে সাংবাদিকদের ওপর হয়েছে হামলা, সৃজন করা হয় মিথ্যা মামলা। এখনো সক্রিয় রয়েছে ওই সব উন্নয়ন ও সমাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা।
গণকল্যাণমূখী মফস্বল সাংবাদিকদের এই প্রতিষ্ঠন লামা প্রেসক্লাব ভবনের দ্বিতীয়তলায় সাংবাদিকদের জন্য ১০টি ডেস্ক তৈরি ও স্থানীয় সকল সাংবাদিকদের জন্য লেপটপ প্রদানকল্পে প্রয়োজনীয় বরাদ্দদানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি’র সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন প্রেসক্লাব সদস্যসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা।
বর্তমানে সফলতার ২৯ বছরে পা রেখেছে লামা প্রেসক্লব। লামা প্রেসক্লাব স্বরণ করছে সেসব গুনিজনদের, যাদের মেধা-শ্রম ও নানা আনুকল্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই উপজেলার গণমাধ্যম কর্মিদের মেলবন্ধন লামা প্রেসক্লাব।

আরো খবর

Leave a Reply

Close