বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২০শে জুন, ২০১৯ ইং, ৬ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

চট্টগ্রামে ইতিহাস বিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনা

সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ
চট্টগ্রামের প্রত্নসম্পদসমূহ সংরক্ষণ করুন

ঐতিহাসিক চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি রচিত “চট্টগ্রামের ইতিহাস” গ্রন্থ প্রকাশের শতবছর পুর্তি উপলক্ষে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি) ও শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি স্মৃতি সংসদের যৌথ উদ্যোগে ১১ জানুয়ারী শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর কাশফুল রেস্তোরাঁয় ইতিহাসবিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র ২০১৯ অনুষ্টিত হয়। চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি ইতিহাস গবেষক সোহেল মো. ফখরুদ-দীনের সভাপতিত্বে এই আলোচনা চক্রের উদ্বোধন করেন ভারতবর্ষের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. আশিস কুমার বৈদ্য। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম নটরডেম স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শিক্ষাবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হোসেন মুরাদ। প্রধান আলোচক লেখক-গবেষক ও ব্যাংকার বাবু দুলাল কান্তি বড়ুয়া। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও লেখক এ কে এম আবু ইউসুফ এর সঞ্চালনায় আলোচনা চক্রে অংশগ্রহণ করেন কক্সবাজার ইতিহাস চর্চা পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউনুছ কুতুবী, প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নুরুল আলম, প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট তরণী কান্তি সেন, প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া, অধ্যক্ষ হেকিম শিহাব উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক শামসুল আলম টগর, মানবাধিকার কর্মী ও লেখক উদয়ন বড়ুয়া ঝন্টু, লেখক ও প্রাবন্ধিক প্রকৌশলী সৌমেন বড়ুয়া, প্রাবন্ধিক ইমাদ উদ্দিন, কবি ও ছড়াকার অধ্যাপক তপন চক্রবর্তী, ছড়াকার সৈয়দ শিবলী ছাদেক কফিল, লেখক ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক বাবুল কান্তি দাশ, প্রাবন্ধিক সাফাত বিন সানাউল্লাহ, প্রবীণ রাজনীতিক প্রাবন্ধিক সিদ্দিকুল ইসলাম, কবি প্রকৌশলী সঞ্চয়ন দাশ, লেখক এস এম ওসমান, সাংবাদিক সমীর কান্তি দাশ, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী, ইমাম মোহাম্মদ আবদুল হালিম, সাগর বড়ুয়া, অধ্যাপক দিদারুল আলম, অধ্যাপক রিপন চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ স্বদেশ পাল, প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন চৌধুরী, কবি শাহনুর আলম প্রমুখ। আলোচনা চক্রে ঐতিহাসিক খানবাহাদুর হামিদ উল্লাহ খাঁ (১৮০৯-১৮৮০), স্যার আশুতোষ চৌধুরী ( ১৮৮৮-১৯৫৪); বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন (১৮৯৪-১৯৩৪), ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৮-১৯৮০); আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩); নলিনীকান্ত ভট্টাশালী (১৮৮৮-১৯৪৭); চৌধুরী শ্রীপূর্নচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি (১৮৬৭-১৯৪৫)-এর জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা হয়। উল্লিখিত ব্যক্তিদের জীবনকর্মের উপর লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন ভারত থেকে আগত ঐতিহাসিক ড. আশিস কুমার বৈদ্য। আলোচনা চক্রে বক্তারা বলেছেন, প্রাচীন বন্দর নগরী চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত। চট্টগ্রাম শিক্ষা, সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন, লোকজ ঐতিহ্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সিপাহী বিপ্লব, মহান ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বোপরি চট্টগ্রামের পরিচিত জনপদ দর্শনীয় স্থান, সংবাদপত্র, ভাষা ও সাহিত্য সবকিছুতেই রয়েছে গৌরবদীপ্ত ঐতিহ্য ও ইতিহাস। আমরা আমাদের আজকের আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিষয়ক আলোচনাচক্রে খ্যাতিসম্পন্ন চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, প্রাচীন স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থানসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দিয়ে চট্টগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছি। লক্ষণীয় বিষয়, ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম এখনো সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাসের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এ অঞ্চলের প্রাচীন প্রত্ন সম্পদ এখনো অবহেলায় অনাদরে। ইতিমধ্যে সরকারের প্রত্ন তত্ত্ব অধিদপ্তরকে চট্টগ্রামের প্রাচীন স্থাপনাসমূহ প্রত্ন আইনে সংরক্ষণের জন্য তাগিদ দেওয়া হলেও অদৃশ্য কারণে কোন প্রত্ন এখনো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আলোচনা চক্রে বক্তারা আরো বলেছেন, এই ইতিহাসবিমুখতা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস সচেনতায় আগ্রহী করে গড়ে তুলতে হবে। তরুণ প্রজন্ম যদি ইতিহাস জানতে পড়তে আগ্রহী হয় তাহলে আমাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস রক্ষা করা সম্ভব হবে। বক্তারা আরো বলেছেন, চট্টগ্রাম একটি প্রাচীন জনপদ ও নগরী। এই চট্টগ্রামে সাড়ে চার হাজার বছর আগেও মানববসতি ছিল, যা ইতিহাস গবেষণা ও প্রত্ন বস্তু আবিষ্কারের মাধ্যমে আজ প্রমাণিত। প্রাচীন গ্রিক, মিশরীয় ভৌগোলিকদের বর্ণনা এবং মহাভারত রামায়ণের গবেষণায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের খ্যাতনামা গ্রিক ভৌগোলিক প্লিনির গ্রন্থ পেরিপ্লাসে ক্রিস নামে যে স্থানটির বর্ণনা পাওয়া যায় তাকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ বলে মত দিয়েছেন ঐতিহাসিক ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী। অন্যদিকে ল্যাসন মনে করেন, পেন্টাপোলিস চট্টগ্রামেরই ক্ল্যাসিক্যাল নাম। এ বিষয়দ্বয়ের উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার উৎপত্তি অনুসন্ধান করতে হলে চট্টগ্রাম নগরী কত পুরানো তা জানা প্রয়োজন। এ অঞ্চলটিকে সুদীর্ঘকাল থেকে অনেকে শাসন ও শোষণ করেছেন এবং এখানে অনেকের আগমন-নির্গমন ঘটেছে। বলা বাহুল্য, চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ের প্রয়োজনে বহু দেশের ব্যবসায়ী ও পরিব্রাজকরা এখানে এসেছে এবং তাঁদের লেখনির মাধ্যমে এই চট্টগ্রামের হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান পাওযা যায়। বক্তারা আরো বলেছেন, আজ থেকে শত বছর পূর্বে শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধির চট্টগ্রামের ইতিহাস ও একশত ষাট বছর আগে খানবাহাদুর হামিদ উল্লাহ খাঁ আহাদিসুল খাওয়ানিন (তারিখে হামিদ) নামে গ্রন্থের মাধ্যমে এই চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস রচনার মাধ্যমে আমাদেরকে আলোকিত পথ দেখিয়েছেন। তাঁদের গ্রন্থ ও জীবনকর্ম স্মরণের মাধ্যমে প্রজন্মকে প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান দেওয়া সম্ভব। আসুন আমরা সকলে প্রাচীন গৌরবগাথা ইতিহাসগুলো স্ব-স্ব অবস্থান থেকে চর্চা ও নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরি।

আরো খবর

Leave a Reply