বাংলাদেশ, শনিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ২রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আলীকদমে সেনা বাহিনীর মৈত্রি কার্যক্রম ও সন্ত্রাস দমনে সুফল পাচ্ছেন স্থানীয়রা

মো.কামরুজ্জামান, লামা-আলীকদম 
বাংলাদেশ সেনা বাহিনী আলীকদম জোনের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফলে পাল্টে দিয়েছে লামা-আলীকদমের চিত্র। অনেক অনিয়মের ভিত্তিমূলেও আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ সেনা বাহিনী আলীকদম জোনের তত্ত্বাবধানে লামা-আলীকদমের লক্ষাধিক বাঙ্গালী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকা থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড সমুলে নির্মূলে অব্যাহত প্রচেষ্টা, অবৈধ কাঠ, বাঁশ পাচার রোধ, শিক্ষা-চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি খোলা-ধুলা, সংস্কৃতি বিকাশে আলীকদম জোনের সেনা কার্যক্রম ইতোমধ্যে অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্ট- (২৩ বীর) আলীকদম জোনের দায়িত্ব পালন করছে। জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল সাইফ শামীম পিএসসি’র নেতৃত্বে আলীকদম জোনের শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে সার্বিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে।
তাছাড়া পাহাড় খুঁড়ে পাথর আহরণ বন্ধ, তামাক কিউরিং-এ পরিবেশ বান্ধব কার্যক্রমসহ সরকারী-বেসরকারী সকল প্রশাসনকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে সেনা বাহিনী। এলাকায় সড়ক নির্মাণ, ব্রীজ-কালভার্ট স্থাপনসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উনয়নে সেনাবাহিনী নগদ অনুদান প্রদানের পাশাপাশি আদা-হলুদ চাষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছে। শিক্ষা-সংস্কৃতিমূলক কার্যক্রমে সহায়তা, চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম, উদ্যান উন্নয়ন, বৃক্ষরোপন, এতিমখানা-অনাথালয়ে আর্থিক সহায়তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে অনুদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, মৈত্রী কার্যক্রমের আওতায় প্রেসকা¬ব নির্মাণ, বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষকদের বেতন ভাতা প্রদান, পাহাড়ী দুর্গম পল্লীগুলোতে ন্যায্যমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী প্রদান করে যাচ্ছে সেনা বাহিনী আলীকদম জোন।
এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকার রোগাক্রান্ত আদিবাসী-বাঙ্গালীদেরকে উন্নত চিকিৎসা প্রদানে দ্রুত যোগাযোগে সহায়তা দিয়ে আসছে সেনা বাহিনী। বিগত বছরে আলীকদম জোনের সহায়তায় লামা বন বিভাগ কোটি টাকারও বেশী মূল্যের বনজ সম্পদ চোরকাবারীদের কবল থেকে উদ্ধার করে রাজস্ব বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। বিগত দিনে উপজেলার কানামাঝি ঘাট এলাকার মিরিঞ্জা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শুক্রাপাড়ায় একটি সন্ত্রাসী আস্তানায় অভিযান চালিয়ে আলীকদম জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মোঃ আজিম উলল্লাহ বাহার, পিএসসি’র নেতৃত্বে একটি সি টাইপ সেনা টহল দল ১টি একে-৪৭ ও ১টি এম-১৬ রাইফেলসহ বিপুল পরিমাণ গুলি ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জমাদি উদ্ধার করেন। এর পাঁচদিন পর জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর নাহিদুল ইসলাম খাঁন, পিএসসি ও ক্যাপ্টেন মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে ৫টি একে-৪৭ রাইফেল ও ৩ হাজার রাউন্ড গুলিসহ বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে সেনা বাহিনী। এছাড়াও এ দু’টি অভিযানে রকেট লাঞ্চার, মটার সেল, এ্যান্টি পার্সোনাল মাইন, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। একই বছর লামা উপজেলার লুলাইন এলাকা থেকে সেনা বাহিনী দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে ৩টি হাতিসহ বিপুল পরিমাণ অবৈধ কাঠ উদ্ধার করে। উল্লেখ্য ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে কাঠ পাচার করে যাচ্ছিল হাতি বাহনের মাধ্যমে। অবশেষে সেনা বাহিনী হস্তক্ষেপে এ তৎপরতা রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় লামা বন বিভাগের মাতামুহুরী রেঞ্জের বিরানপ্রায় বিশাল বনাঞ্চলের বৃক্ষ নিধনও সেনা বাহিনীর নিভিড় নজরদারির কারণে বন্ধ রয়েছে। ২০১৬ সালে রুপসিপাড়ায় স্বশস্ত্র পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের সাথে সম্মুখ সংগ্রামে একজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। ১৭-১৮ সালে আলীকদম রোয়াম্ভু ও লামা গয়ালমারা এলাকা থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী আটক করেন জোনের সেনা সদস্যরা।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে এমএনপি’র ৪২ সদস্যস্যের একটি সশস্ত্র সংগঠনকে সেনাবাহিনীর আলীকদম জোনের পোয়ামুহুরী ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করাতে সক্ষম হন। পরে আরেক অভিযানে একই বছরের ৮ মে পোয়ামুহুরী ইয়াংরিং মুরুং কার্বারীপাড়া থেকে ৭টি গাদা বন্দুক, একটি পিস্তল, গান পাউডার ৩০০ গ্রাম, বল্লম/ছোরা ৮টি, গানপাউডার তৈরির কেমিক্যাল, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ এমএনপি সদস্য সন্দেহে সাত মুরুংকে আটক করেছিল। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এর আগে নিহত এমএনপি প্রধান মেনরুম মুরুং লাশের সন্ধান পায়। পরে পোয়ামুহুরীর মেনচিংপাড়ার দুর্গম অরণ্য থেকে নিহত মেনরুমের মাটিচাপা লাশের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিহত হওয়ার পর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ককুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী এলাকায় মেনরুম (ছোট) গ্রুপ ও দোছারী-তৈনখাল এলাকায় লৌহব গ্রুপ নামে এ দুই অংশের পরিচয় পায়। এই দুই গ্রুপ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আটক করে মুক্তিপণ আদায় করত। সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর/১৫ মোহাম্মদ আলী ও মো: সাইফুল ইসলাম নামে দুই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে এমএনপি সন্ত্রাসীরা।
অব্যাহত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে আলীকদম জোন এমএনপি বিরোধী অভিযান চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, নানামূখী কৌশলে; আর্থিক সঙ্কট, নিজ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অসহযোগিতাসহ নানামুখী টানাপড়েনে সংগঠনটির সদস্যরা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
এর ফলে সংগঠনটির মেনরুম গ্রুপের ৬৪ জন ও লৌহব গ্রুপের ১৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। তারা ৬০টির মতো স্থানীয় তৈরি অস্ত্রও জমা দেয়। সংগঠনটির অপতৎপরতায় অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর পাশাপাশি খোদ ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্যরা চিন্তিত ছিল। কেউই চাননি তাদের সন্তানেরা বিপথগামী হোক। পরে ম্রোদের সামাজিক সংগঠন ম্রো সোস্যাল কাউন্সিল বিপথগামী যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সফল উদ্যোগ নেয়।
বিপদগামী এ কজন যুবককে সাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে যাদের অবদান ছিল; জনপ্রতিনিধি ম্রো নেতা রাংলাই ম্রো, খামলাই ম্রো, জেলা পরিষদের সদস্য সিংইয়ং ম্রো, অংপ্রু ম্রো, অ্যাডভোকেট মাংইয়ং ম্রোসহ ম্রো সোস্যাল কাউন্সিলের অপরাপর নেতারা। এমএনপির দুইটি গ্রুপের মোট ৭৮ সদস্য ৬০টির মতো অস্ত্র জমা দিয়েছিল। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে তৈরি। অস্ত্রগুলো দিয়ে এমএনপির সদস্যরা বান্দরবানে লামা, আলীকদম ও থানছি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাত।
এছাড়া লামা-আলীকদমের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাথর কোয়ারী ইজারা নেয়ার নামে একটি প্রভাবশালী চক্র মাটি খুঁড়ে পাথর আহরণের ওপর সেনা বাহিনীর নজরদারির ফলে এই পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর ইঞ্জিয়ার দল আলীকদম-থানচি সড়কের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছেন। এ রাস্তার ফলে এতাদাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আলীকদম সেনানিবাস এলাকা ভাঙ্গণরোধে মাতামুহুরী নদীর পাড়ে ব্লক বসিয়ে ভাঙ্গনরোধের পাশাপাশি, সৌন্দর্য বর্ধন করেছেন। বর্তমানে আলীকদম পোয়ামুহুরী ৩৭ কি:মিটার সড়ক/ ব্রিজ-কালভার্ট, ধারক দেয়ালসহ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এর আগে ১৯৮০-৮৭ সাল নাগাদ বর্তমান লামা-আলীকদম-ফাঁসিয়াখালী ৪৪ কি: মিটার সড়ক নির্মাণ করেছিল সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবি। এছাড়া বিভিন্ন দুর্যোগকালীন সময়ে পরম বন্ধু হয়ে স্থানীয়দের পাশে এসে দাঁড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

আরো খবর

Leave a Reply