বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রনিদের জন্ম কি সড়কে হত্যা হওয়ার জন্য?

আজহার মাহমুদ
বিশৃংখল সমাজ আর অমানবিক মানসিকতার জালে আবদ্ধ আমাদের জীবন। জীবন এখন সড়কের চালকদের জন্য। তারাঁ চাইলেই আমাদের জীবন মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারছে। আর দিন শেষে এর নাম হবে সড়ক দুর্ঘটনা। এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে একটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে চট্টগ্রামের এক বাস চালক। গত সোমবার প্রকাশ্য দিবালোকে এবং শত শত মানুষের সামনে রেজাউল করিম রনিকে (৩৫) বাসের চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করেছে ওই চালক। লুসাই পরিবহন লিমিটেডের বাসটিতে চড়ে রেজাউল করিম রনি সিটি গেইট এর কালির হাট এলাকায় ফিরছিলেন। পথে ভাড়া নিয়ে বাসের হেল্পারের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গ্লাস্কো অফিসের সামনে হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেল্পার। যাত্রীদের চিৎকার ও অনুরোধে কান না দিয়ে চালক প্রথমে বাসটিকে পিছিয়ে আনে এবং তারপর সোজা রনির শরীরের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু ঘটে রনির। ঘটনার আকস্মিকতায় গাড়ীর যাত্রীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলে চালক এবং তার হেল্পার বাস থামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। যাত্রীদের অনেকে ধাওয়া করলেও দু’জনের কাউকেই আটক করা সম্ভব হয়নি। যাত্রী হত্যার এ ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ ওই সড়ক অবরোধ করেছে। পরের দিন তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় সিটি গেইট মোস্তফা হাকিম কলেজ মাঠে। অন্যদিকে রনির পরিবারের সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। ২৯ তারিখ তার হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধনও করেন রনির এলাকাবাসী। সকলের একটাই দাবী, আর যেনো কোনো রনি এভাবে সড়কে হত্যা না হয়। ভাবতে অবাক লাগে সামান্য ভাড়া নিয়ে একটি মানুষকে এভাবে হত্যা করতে তাদের একটুও চিন্তা হয়নি। এরা কি সত্যি মানুষ? নকি মানুষ নামক পশু। কখনো কখনো মনে হয় পশু জাতিও অনেক ভালো। রনি ভাই চলে গেলেও রেখে গেছেন তার সন্তান আর স্ত্রী সহ বাবা-মা, ভাই-বোন এবং অসংখ্য বন্ধু প্রিয়জনকে। আমি তখনই বড় কষ্ট পাই যখন দেখি তার ২ বছরের মেয়েটিকে। যে মেয়েটি পৃথিবী কি সেটাই এখনো জানেনা, অথচ তার আগেই হারিয়ে ফেলেছে তার বাবাকে। ঘাতকরা শুধু রনিকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে একটি কোমল শিশুর হৃদয়কে। হত্যা করেছে একটি সন্তানের বাবার আদরকে, হত্যা করেছে একটি নারীর সাজানো সুন্দর সংসারকে, হত্যা করেছে প্রিয়জন আর বন্ধুর ভালোবাসাকে, হত্যা করেছে এলাকাবাসীর হৃদয়কে। একজন মানুষ কতটা ভালো হলে তার জন্য একজন অচেনা মানুষ কান্না করতে পারে তা আমি রনি ভাইকে দেখে বুঝেছি। কতটা র্নিমম আর জঘন্য হলে এমন হত্যা সম্ভব! আসলে এসব বলে আর কি হবে। হত্যা কি বন্ধ হবে? হবে না। এটা চলছে আর চলবে। কাল হয়তো আমার জন্যও আমার পারিবারকে কাঁদতে হবে। এখন গাড়ী চালকদের হাতে জিম্মি আমরা। তারা চাইলেই আমাদের যেখোনো মুহূর্তে হত্যা করতে পারে। কারণ ধাক্কা দিয়ে ফেলার এবং হত্যা করার এটাই প্রথম ঘটনা নয়। মাত্র মাস খানেক আগে, গত ২১ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া এলাকায় বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুরকে। তার বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহরে। এর পরদিন ধাক্কা দেয়ার প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় এক ট্রাক চালক একজন বেকারি শ্রমিককে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু তারও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এভাবেই সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর তথা হত্যাকান্ডের ঘটনা বেড়ে চলেছে। তথ্যমতে বিগত ৫৫০ দিনে মারা গেছে চার হাজার ৯৮৩ জন। দুর্ঘটনাকে দৃশ্যমান কারণ বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই চালক ও হেল্পাররা প্রথমে ধাক্কা দিয়ে ফেলে এবং তারপর গাড়ি চাপা দিয়ে যাত্রীদের হত্যা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর কারণে অনেক পথচারীর ওপর দিয়েও গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছে চালকেরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, রেজাউল করিম রনিকে যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে তা সকল বিচারেই ক্ষমার অযোগ্য। হত্যাকারিকে যদি ফাঁসিও দেওয়া হয় তবু এই অপূরণ কখনো পূরণ হবে না। এমন একজন মানুষকে এভাবে হত্যা হতে হবে এটা কল্পনায়ও আনতে পারছি না আমি। আসলে হত্যাকান্ড গুলো দিন দিন বেড়েই চলছে। গত ২৯ জুলাই ঢাকার কুর্মিটোলায় একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারাদেশে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা হয়েছিল চালকরা যথেষ্ট সতর্ক ও মানবিক হবে। কিন্তু আমরা তার উল্ট চিত্র দেখছি এখন। অন্যদিকে সরকারও আশ্বাস দিয়েছিলো কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ফলে দুর্ঘটনা এবং হত্যাকান্ড অনেক কমে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দুটি আশার কোনোটিই বাস্তবে পূরণ হয়নি। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর চালকরা বরং আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের দাবি ও আহ্বানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখানো, সেখানে চালকরা তখন হঠাৎ ধর্মঘট করে বসেছে। তিনদিনের সে ধর্মঘটে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন চালকদেও বিচার করলেই তারা ধর্মঘট ঢেকে সাধারণ মানুষকে যাতায়তের ভোগান্তি দেয়। বলা যায় তারা এখন একরকম আমাদেও রাজা। তাদের দয়া হলে আমরা বাচঁবো, নয়ত্ রনির মতো আমাদেরও ধাক্কা দিয়ে মেওে ফেলবে। আর বিচার করতে গেলে ধর্মঘট। এ যেনো এক “মঘের মুল্লক”। যা ইচ্ছা তাই করবে পরিবহন শ্রমীক। আর সাধারণ মানুষ তাদেও হাতের পুতুল। আর কতদিন? কতদিন এই কষ্ট নিয়ে জীবন চালাতে হবে? এই হত্যাকান্ড থামবে কখন? কখন আমরা নির্ভয়ে সড়কে নামতে পারবো? সরকারের কাছে এই প্রশ্ন গুলো দিয়ে গেলাম। সব মিলিয়ে আমরা চাই যাতে সড়ক-মহাসড়কে আর কোনো প্রাণবিনাশী দুর্ঘটনা না ঘটে। কোনো চালক ও হেল্পার যাতে যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার এবং তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে হত্যা করার কথা কল্পনাও না করতে পারে।

আরো খবর

Leave a Reply