বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২৩শে মে, ২০১৯ ইং, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

আজ  বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে অনেক জ্ঞানীগুণী সমাজসেবক ও মহৎপ্রাণ মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। মহাত্মা জ্বীন হেনরী ডুনান্ট
সেই সব শ্রেষ্ঠ মানব সন্তানের একজন। রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট এর প্রতিষ্ঠাতা জ্বীন হেনরী ডুনান্টের জন্ম হয়েছিল ১৮২৮
সালের ৮ই মে। ১৯১০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর হতে সারা বিশ্বে ৮মে তাঁর জন্মদিনকে সম্মান দেখিয়ে ‘বিশ্ব রেডক্রস ও
রেডক্রিসেন্ট দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবক, মানব হিতৈষী ও শ্রেষ্ঠ মানব। সেই
জন্যই তিনি পেয়েছিলেন শান্তিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আজ কোটি কোটি মানব সন্তান বিপন্ন
মানবতার সেবায় নিয়োজিত। তিনি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষকে এক পতাকাতলে একই কর্মসূচীতে একত্রিত
করেছিলেন। সাম্য মৈত্রির বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন মানব সন্তানদের। সেই সংগঠনের নাম রেড ক্রিসেন্টে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান রেডক্রস সোসাইটির পূর্ব পাকিস্তান শাখা বাংলাদেশের জাতীয় রেডক্রস সোসাইটি
হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮৮ সালে ৪ঠা এপ্রিল হতে মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির
নাম পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রশাসনিক জেলায় ৬৪টি ও ৪টি সিটি
করপোরেশনে ৪টি সর্বমোট ৬৮টি ইউনিট রয়েছে যার মাধ্যমে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সারাদেশব্যাপী নানাবিধ
জনসেবা ও কল্যাণ মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। মানবতার কল্যণে বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি স্বাভাবিক
সময়ে ও প্রতিটি দুর্যোগে ৬৮টি ইউনিট এর স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বিপন্ন মানবতার কল্যাণে গণ মানুষের
সেবায় সর্বদা নিয়োজিত।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে আহতদের সেবা ও নিহতদের সৎকার করার উদ্দেশ্যে রেডক্রসের জন্ম হলেও এর সেবা ও কর্ম-পরিধি বর্তমানে
ব্যাপক এবং বিস্তৃত। সেবার মনোভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত রেড ক্রিসেন্ট বন্যা, নদী ভাঙ্গন, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস,
অগ্নিকান্ড, প্রচন্ড শীত প্রভৃতি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে খাদ্য সামগ্রী, ঔষধপত্র, বস্ত্র, অস্থায়ী আশ্রয় সামগ্রী
প্রদান এবং উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এমনকি বিধ্বস্তএলাকার গৃহহীনদের জন্য পুনর্বাসন
কর্মসূচীর আওতায় গৃহ নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৯৮ সালে সংঘটিত শতাব্দীর প্রলয়ংকারী বন্যায় সোসাইটি ত্রাণ
কার্যক্রম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা প্রদানের জন্য দেশের দুর্যোগ প্রবণ ৩৫টি জেলার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়
বসবাসকারী অসহায় গণমানুষের বিপদাপন্নতা লাঘবে সোসাইটি ১৯৯৭ সাল হতে ‘সমাজ ভিত্তিক দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মসূচী’র
মাধ্যমে গণ মানুষের সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৯১ সালে সংঘটিত প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে সোসাইটির উদ্ধার ও
ত্রাণ কার্যক্রম সারা বিশ্বে সেবার অনন্য মডেল হিসাবে আস্থা অর্জন করেছে। সোসাইটির স্বাস্থ্য সেবার কর্মসূচীর অধীনে এ
দেশের গণ মানুষের সেবায় ২টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ৫টি স্বয়ংসম্পূর্ণ অত্যাধুনিক হাসপাতালসহ ৫টি মাতৃসদন
হাসপাতাল, ৬১টি গ্রামীণ মাতৃসদন কেন্দ্র, ৩টি আউটডোর ক্লিনিক, ২টি চক্ষু ক্লিনিক, ৬টি রক্ত কেন্দ্র, ১টি নার্সিং স্কুল, ৩টি
ধাত্রী বিদ্যা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এইচ আইভি/এইডস ও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এর সক্রিয় ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা, জরুরী মেডিকেল
টিমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তমানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে। এছাড়াও রয়েছে থ্যালাসেমিয়া রিসার্চ সেন্টার, ডেন্টালসহ
আর্তমানবতার সেবায় চিকিৎসার অন্যান্য দিক।
সাতটি মূলনীতি নিয়ে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট কাজ করে। মূলনীতি গুলো হল মানবতা, পক্ষপাতহীনতা, নিরপেক্ষতা,
স্বাধীনতা, স্বেচ্ছামূলক সেবা, একতা, সার্বজনীনতা। স্কুল কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র ছাত্রী বা যুব শ্রেণীর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে
সোসাইটির যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সোসাইটির অধিকাংশ কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
প্রশিক্ষিত যুব স্বেচ্ছাসেবকগণই প্রতিটি দুর্যোগে গণমানুষের সেবায় আস্তরিক ও নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে যুব রেড
ক্রিসেন্ট এর ইতিহাস বেশি দিনের পুরানো নয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জুনিয়র রেড ক্রিসেন্ট
কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্তগ্রহন করে। ১৩টি বিদ্যালয়কে প্রাথমিকভাবে জুনিয়র রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমে অন্তভূক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে কলেজ র্পযায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রথম অবস্থায় ২০টি
কলেজকে যুব রেড ক্রিসেন্টর আওতায় আনা হয় পরে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮৩ সালে নামের জটিলতা পরিহার করার
উদ্দেশ্যে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে নামের সামঞ্জস্য রাখার লক্ষে রেড ক্রিসেন্ট এর যুব সংগঠনের নাম রাখা হয় যুব রেড
ক্রিসেন্ট। জুনিয়র ও যুব রেড ক্রিসেন্ট একত্রিত বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের সকল সদস্যদের সমন্বয়ে এই নাম রাখা হয়। যুব
রেড ক্রিসেন্ট এর লক্ষ, উদ্দেশ্য, মূলমন্ত্র আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। “কাজের মাধ্যমে শিক্ষা” এটাই মূলতঃ যুব রেড ক্রিসেন্ট
এর লক্ষ। যুব রেড ক্রিসেন্ট এর মূল মন্ত্র বা গড়ঃঃড় হল ও ঝবৎাব বা সেবাব্রতী। ১৯৭৫ সালে বেলগ্রেডে রেড ক্রস
সন্মেলনে সকলের সিদ্ধান্তমোতাবেক যুব রেড ক্রস/ যুব রেড ক্রিসেন্ট এর লক্ষ নির্ধারণ করা হয় ৪টি সেগুলো হল জীবন ও
স্বাস্থ্য রক্ষা, সেবা ও সংহতি, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব, সমঝোতা ও শান্তির অন্বেষনে শিক্ষা এবং রেড ক্রস/ রেড ক্রিসেন্ট মূলনীতি
ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিস্তার।
মহামন্য রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০১০ সালে সরকার যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমকে সহশিক্ষা হিসেবে ঘোষণ করেন।
ফলে সারা দেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুব কার্যক্রম চালূ রয়েছে এবং এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩,৫০,০০০ জন। স্কুল ও
কলেজ পর্যায়ে যুব রেড ক্রিসেন্ট নিম্মলিখিত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ যেমন রেড
ক্রস/ক্রিসেন্ট মৌলিক প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ, উদ্ধার ও সাড়া প্রদান, নেতৃত্ব উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ
ইত্যাদি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পুরনো বই, কাপড় সংগ্রহ ও বিতরণ, ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা, প্রাথমিক চিকিৎসা
কেন্দ্র পরিচালনা, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন সহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
এমন এক বান্তবতায় আজ যুবকদের সুযোগ রয়েছে শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষার অংশ হিসেবে মানূষের পাশে দাঁড়ানোর।
অসহায় ও দূর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারছে কয়জন। ক্লাসের অবসরে হয়ত আড্ডা দিয়ে
অতিরিক্ত সময়টুকু নষ্ট করে ফেলি কিন্তু একটু সচেতন হলে আমরা পারি অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাড়াতে। আমাদের
সহযোগিতার কারণে হয়ত কিছু অসহায় মানুষ তার পথ চলার রাস্তা খুঁজে পাবে। একই সাথে নিজের আতœাতৃপ্তি বৃদ্ধি পাবে।
তাছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এর মাধ্যেমে নিজেকে যোগ্য ও সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে ভবিষ্যতের জন্য।
ডিজিটার বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আজকের যুব সমাজ। যুবকদের মাঝে রয়েছে তারণ্যের
উদ্দিপনা, সেটিকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে গড়তে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ডিজিটার বাংলাদেশ। সেটির অন্যতম মাধ্যম
হতে পারে রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন। যুবক শ্রেণী ও স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সুযোগ রয়েছে যুব রেড ক্রিসেন্ট এর মাধ্যমে
মানুষের কল্যাণে কাজ করার। শুধু যুবক বা ছাত্র-ছাত্রী নয় যে কেউ পারে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে তার জন্য রেড
ক্রিসেন্টের দরজা সবসময় খোলা রয়েছে। মানবসেবাই বড় ধর্ম তাই আসুন মানবের কল্যানে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে
রেড ক্রিসেন্ট এর পতাকা তলে ঐক্য বদ্ধ হয়। সকলের পদযাত্রা হোক মানবতার কল্যাণে, সত্য, সুন্দর ও মানবতার
জয়গানে। মানবতার সেবায় রেড ক্রিসেন্ট এগিয়ে চলছে “ সর্বত্র সবার জন্য”।

আরো খবর

Leave a Reply