বাংলাদেশ, শনিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৯ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে বনভোজনের চাঁদার নোটিশ!

কে.এম.রিয়াজুল ইসলাম

বরগুনা জেলার বামনা উপজেলায় বাংলাদেশ ফার্মাসিস্ট রিপ্রেজেন্টিটভ এ্যাসোসিয়েশন (ফারিয়া)’র বার্ষিক বনভোজনের চাঁদা আদায়ের নোটিশ দিলেন বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন। বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সকল চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বনভোজনে যাওয়ার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে চাঁদা আদায়ের নোটিশ টানিয়ে দেন মো. জামাল হোসেন। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে। এছাড়াও নিয়মিত অফিস না করা, রোগীদের কাছ থেকে হাসপাতালে বসে চিকিৎসাপত্র বাবদ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মচারীরা অভিযোগ করেন ডা. জামাল হোসেন বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত বছরের ১৮ জুন যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে হাসপাতালের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছে মতো অফিস করতেন। হাসপাতাল চলাকালীন সময় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি সাধারণ রোগীদের নিকট থেকে চিকিৎসা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নিতেন। এছাড়াও হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করতেন।

তারা আরো বলেন, ডাক্তার সাহেব হাসপাতালের কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও জিপি ফান্ডের টাকা আত্মসাত করেছেন। এছাড়াও তিনি স্থানীয় ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যবস্থাপত্র দেন এবং অফিস চলাকালীন সময় ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ করে দেন। তার খামখেয়ালীপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে হাসপাতালের কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। তবে এবিষয়ে উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে বলেও তারা জানান।

বামনা উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় স্থানীয় ৪ ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সাংবাদিকরা তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অনয়িম ও খামখেয়ালীনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হতে সাধারণ জনগণ কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি সেবা গ্রহণ না করে জনসাধারণকে প্রাইভেট ক্লিনিক/হাসপাতালে সেবা নিতে বাধ্য হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা বেশিরভাগ সময় মঠবাড়িয়ায় অবস্থান করেন এবং অফিস চলাকালীন সময়ে রোগীদের কাছ থেকে ৪০০ টাকা হারে ভিজিট নিয়ে রোগী দেখেন। এছাড়া রোগীদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবহার সন্তোষজনক নয়। সাধারণ জনগণ স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে যাতে কোন প্রকার হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয় ওই সভায়। হাসপাতাল চলাকালীন সময়ে রোগীদের কাছ থেকে ভিজিট গ্রহনের কোন সুযোগ নেই উল্ল্যেখ করে অভিযুক্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সভার কার্যবিবরণী মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবরে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে অদ্যবধী অভিযুক্ত ডা. জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি রোববার বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি দেখতে পাওয়া যায়। এসময় চিকিৎসা নিতে আসা বামনা উপজেলার আমতলী গ্রামের মোস্তফা দফাদারের স্ত্রী সুরমা বেগম বলেন, আমার সন্তানের জ্বর হয়েছে তাই হাসপাতালে এসেছিলাম বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে কিন্তু ডাক্তার সাহেব বললেন তিনি চিকিৎসাপত্র লিখে দিচ্ছেন আর ঔষধ হাসপাতালের বাহিরের ফার্মেসী থেকে নিতে হবে। চিকিৎসাপত্রের জন্য আমার কাছ থেকে দেড়শ টাকা নিয়েছেন উনি। সাথে সাথে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষনিক রোগীর কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দিয়ে দেন।

প্রসঙ্গত ডা. জামাল হোসেন পার্শ্ববর্তী মঠবাড়িয়ায় উপজেলায় কর্মরত থাকা অবস্থায় এক নারী রোগীর সাথে অসামাজিক আচরণের দায়ে অর্থদণ্ড দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে কর্মরত আছেন।

হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, ডা. জামাল হোসেন সপ্তাহে একদিন কর্মস্থলে এসে হাজিরা খাতায় বাকি ছয় দিনের স্বাক্ষর দেন। বামনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিংগার প্রিন্টের মাধ্যমে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হাজিরা চালু থাকলেও তিনি কখনো ফিংগার প্রিন্টের মাধ্যমে হাজিরা দেন না।

উপজেলার পশ্চিম সফিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, আমি টিউমার আক্রান্ত এক রোগীকে নিয়ে ডা. জামাল হোসেনের শরণাপন্ন হই। এসময় তিনি আমার কাছে ওই রোগীর টিউমার অপারেশন করার জন্য ১০ হাজার টাকা দাবী করেন। ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে অপারেশন করলে নানান অজুহাতে তিনি ওই রোগীর নিকট থেকে মোট ২৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।

এবিষয়ে অভিযুক্ত ডা. জামাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসপাতালে স্পেশাল কেউ দেখাতে চাইলে তাদের কাছ থেকে নাম মাত্র ভিজিট গ্রহণ করি। আপনারা যদি চান তাহলে দাপ্তরিক কাজ ছাড়া আমি কোন রোগী দেখবো না। হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে রোগীদের জন্য ব্যবহৃত তার চিকিৎসাপত্রে চাঁদা আদায়ের নোটিশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পিকনিকের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে বলে আর কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

বামনা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাইতুল ইসলাম লিটু বলেন, ডা. জামাল হোসেন যোগদানের পরে বেশ ভালোই দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এখন তার বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়া সহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় অভিযোগ করেন ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকবৃন্দ। ওই সভার রেজুলেশন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সমূহ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. জসীম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে উপজেলা পরিষদের রেজুলেশন হওয়ার বিষয়ে আমি অবগত আছি। তিনি সবসময় অফিসে থাকেন না ও হাসপাতাল চলাকালীন সময়ে ভিজিট গ্রহণ করেন বলে শুনেছি। কেউ অভিযোগ দিলে আমি তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আরো খবর

Leave a Reply