ঘুষ, দুর্নীতি ও বিশ্বব্যাংক

  প্রিন্ট
(সর্বশেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭)

মানুষ মাত্রই ঘুষ খায়—ব্যাপারটা এমন নয়। ঘুষ খাওয়ার জন্য আপনার কিছু ক্ষমতা থাকা চাই। সেটা ছোট হতে পারে বা বড় হতে পারে। তবে আপনাকে অবশ্যই ক্ষমতাবান হতে হবে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি অথচ ঘুষ খায় না—এমনটি বর্তমান সমাজে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। অবশ্য ঘুষ ব্যাপারটাই এমন যে, এটা প্রকাশ্যে কেউ ‘খান’ না। খেলেও স্বীকার করেন না। এ যেন নিষিদ্ধ নেশা। আমাদের দেশে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অধিকাংশই ঘুষ খান। কিন্তু জরিপ চালিয়ে দেখুন লাখে একজন ঘুষখোর ব্যক্তিও খুঁজে পাবেন না। আসলে ঘুষ এমন একটা জিনিস যা মানুষ খায় বটে, কিন্তু কেউ তা স্বীকার করে না, সাধারণভাবে তা দেখাও যায় না। আমাদের সমাজে কোনো ব্যক্তি ঘুষখোর এটি প্রমাণ করা সহজ কাজ নয়। একই সঙ্গে সেই ব্যক্তির আয়ের সঙ্গে ব্যয় তুলনা করলে তিনি যে ঘুষখোর নন—এটা প্রমাণও অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মোটের ওপর এটি একটি জটিল সম্পাদ্য।

 

মহামতি চাণক্য বহু বছর আগে বলেছিলেন ‘মাছ কখন জল খায় আর রাজপুরুষ কখন ঘুষ খায় এটা বোঝা সহজ কাজ নয়।’ এক সময় শুধু রাজপুরুষরাই ঘুষ খেত। এখন ওপর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন বোর্ড অফিসের পাহারাদার, পিয়ন-ঝাড়ুদার পর্যন্ত ঘুষ খায়। রাজা-রাজড়াদের আমলে সাধারণ মানুষকে ঘুষ খেতে হয়নি। মোটা ভাত, মোটা কাপড় পেয়ে এমনিতেই তারা সুখে ছিল। মানুষের সুখের ঘরে ঘুষ নামক ‘আগুন’ কে প্রথম আমদানি করে তা বলা কঠিন। তবে এটা যে সভ্যতার সমান বয়সী—একথা জোর দিয়ে বলা যায়। মানুষ যখন থেকে লোভ-লালসা-মোহ দ্বারা পরিচালিত হতে শিখেছে, লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষতে শিখেছে তখন তারা বিধি-নিষেধ, নিয়ম-পদ্ধতি, আইন-কানুনেরও জন্ম দিয়েছে। আর এ দুয়ের মধ্যে আসন গেড়েছে ‘ঘুষ’ নামক আপদটি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘুষ নিঃসন্দেহে একটি অভিনব সংযোগ।

 

ঘুষ ব্যাপারটির সঙ্গে দুটি পক্ষ জড়িত। একজন ঘুষ প্রদানকারী, অন্যজন ঘুষ গ্রহীতা। ঘুষ গ্রহীতা হচ্ছে ক্ষমতাবান। পক্ষান্তরে ঘুষ দাতা হচ্ছে স্বার্থ-প্রত্যাশী। ক্ষমতাবানরা নগদ বাড়তি কিছু পেয়ে ‘স্বার্থ-প্রত্যাশীকে’ কিছু পাইয়ে দেন। এ বাড়তি কিছু পাওয়া এবং পাইয়ে দেওয়ার খেলাই হচ্ছে ঘুষ।

 

ঘুষ ব্যাপারটি যথেষ্ট গোলমেলেও বটে। কে ঘুষ খায় কখন ঘুষ খায়, কিভাবে ঘুষ খায়, কেন ঘুষ খায়—এসব মৌলিক প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক-অর্থনীতিবিদ এমনকি মনোবিজ্ঞানী পর্যন্ত দিতে পারেননি। এগুলো এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে অপার রহস্য। পরশুরামের এক গল্পে পড়েছিলাম,‘ঘুষগ্রাহী অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারে না যে সে ঘুষ নিচ্ছে।’ তো ঘটনা যাই হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের সমাজে ঘুষ প্রদান এবং ঘুষ গ্রহণ, একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এদেশে চাকরিতে ঘুষ, লাইসেন্স-পারমিটে ঘুষ, আমদানিতে ঘুষ, রপ্তানিতে ঘুষ, সরকারি বরাদ্দ টাকা পেতে ঘুষ, ঠিকাদারিতে ঘুষ, বিমান-জাহাজ ক্রয়ে ঘুষ, তেলকূপ-গ্যাস ক্ষেত্র লিজ দেওয়াতে ঘুষ, শিক্ষায় ঘুষ, স্বাস্থ্যে ঘুষ, নিরাপত্তায় ঘুষ, খুনের জন্য ঘুষ, খুন হলে পরে ঘুষ, বৈধ পাওনা আদায়ে ঘুষ, অবৈধ কিছু পেতেও ঘুষ—মোটের ওপর সবখানেই সবক্ষেত্রেই শুধু ঘুষ আর ঘুষ। ঘুষ ছাড়া সামনে এগুনো কঠিন; পিছিয়ে আসাও অসম্ভব। এদেশে টিকে থাকতে হলে ঘুষ দিতেই হবে। পুলিশকে ঘুষ দিয়ে অপরাধীরা যেমন স্বাধীনভাবে দুষ্কর্ম করার অধিকার আদায় করে, ঠিক তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকে উেকাচ দিয়ে অথবা হয়রানি থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পায়। সুকুমার রায় ‘ঘুষ খায় দারোগায়’ একথা লিখে ‘আইনি’ ভাইদের ঘুষ খাওয়াকে স্থায়ী স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।

 

ঘুষ সবচেয়ে বেশি উত্পন্ন হয় প্রশাসনের মগডালে। ক্রমশ সেটা আগায়, গোড়ায়, সমানভাবে বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশে ঘুষের কবল থেকে মুক্ত রাখার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন।’ কিন্তু এই কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট  কোনো কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

 

ঘুষের সঙ্গে যেহেতু অর্থ জড়িত সেহেতু এটা আসলে অর্থনৈতিক ব্যাপার। দিন যত যাচ্ছে আমাদের অর্থনীতিও ততোটা শীর্ণ হচ্ছে। অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজে ঘুষও বাড়ছে। ঘুষ গ্রহণ নিঃসন্দেহে আদর্শের বিকৃতি। আদর্শের এই বিকৃতি তখনই সম্ভব যখন সমাজে মূল্যবোধের শক্তি অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়। প্রাণহীন কঙ্কালের মতো সেটা অনড় হয়ে পড়ে থাকে। এ কথা সামাজিক নীতি ও আদর্শের আলোচনা প্রসঙ্গে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।

 

এদেশের নিপীড়িত মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য করবার রাজনীতি আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ ৪০ বছরেও জাতির জীবনের গভীর অসুখ দূর হয়নি। সামাজিক-অর্থনৈতিক-মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ক্লান্ত বাঙালি জাতি আজ এক নৈতিক শূন্যতায় আচ্ছন্ন। এখানে জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে দেবার কোনো সামাজিক সান্ত্বনা অনুপস্থিত। অন্যদিকে রয়েছে এগিয়ে যাবার তথা উপরে উঠবার নিরন্তর হাতছানি। এমতাবস্থায় এগিয়ে যেতে হলে দরকার অসাধুতা। ল্যাং মারা সম্ভব না হলে প্রয়োজন অন্য কোনো ফাঁদ। এ ফাঁদ হচ্ছে ফাটলে আটকে দেওয়া। এ ফাঁদে ঘুঘু ধরা খাবেই। এদেশে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। এছাড়া রয়েছে আমলাতন্ত্র। তিনগজ জায়গা পার হতে একটি ফাইলের আঠারো হাত বদল হতে হয়। প্রতিটি হাত এক একটি বিশ্বস্ত চেকপোস্ট! মাল ছাড়ুন ফাইল নড়বে। না হলে নট নড়নচড়ন! ঘাটে ঘাটে জল ঢেলে তবেই যজ্ঞ। আমাদের বর্তমান সভ্যতা হচ্ছে কাগজ সভ্যতা। আর কাগজ মানেই হচ্ছে ফাইল। আর ফাইল মানেই হচ্ছে ঘুষ। সুতরাং বর্তমান সভ্যতার সঙ্গে ঘুষ বাইসাইক্লিক অর্ডারে ঘুরে-ফিরে আসছে, আসবে। বর্তমান কালে আমরা অনেক পাল্টে গেছি—রূপ-জৌলুস-চাকচিক্য-ভোগ-লোভ এসব কিছু দিয়ে এক অদ্ভুত মায়ার জগত্ আমরা তৈরি করেছি। এই অলীক রঙিন পৃথিবীর দিকে আমাদের অভিযাত্রা। উচ্চাভিলাষী মন সারাক্ষণ পেতে চায় ভোগবাদী জগতের পণ্য সামগ্রী। অথচ সাধ্যের সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। আরো আরো চাইতে চাইতে আরো আরো পেতে পেতে আর পাইয়ে দিতে সবাই মিলে অধ:পাতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।

 

ব্যক্তির সাধ ও সাধ্যের সীমাকে জোর করে মেলাতে গিয়েই আসে ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা আর্থিক অনাচারের বিষয়। এই সর্বগ্রাসী সংকট থেকে রেহাই পেতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আর্থিক সামঞ্জস্য বিধান। সামঞ্জস্য প্রয়োজন ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির। সামাজিক জীবনযাত্রার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের সমীকরণ প্রয়োজন। ব্যক্তি ও সমষ্টির মানদণ্ডও এক হওয়া দরকার। তবেই শুধু ব্যালেন্স রেখে চলতে পারব। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। সততা, ভালোমানুষীর মতো কিছু বাতিল মূল্যবোধকে আবারো সমাজের সংস্থানে পুনর্বাসন করতে হবে। শুধু জল আর মল নয়, আরো কিছু— বিশেষত সমষ্টির কল্যাণে আত্মত্যাগ করবার মন্ত্র যদি গোটা জাতিকে উজ্জীবিত করা না যায় তবে ঘুষ নিয়ে ঘুষোঘুষি কখনোই বন্ধ হবে না। মামুলি কথাবার্তা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর ঘুষখোরদের শাস্তির কেতাবী ব্যবস্থা করলে কিছুই হবে না; যে গরু সেই গোয়ালেই রয়ে যাবে।

 

পুনশ্চ:

 

বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন কানাডার আদালত। আদালতের এ রায়ের ফলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো। বিশ্বব্যাংকের চাপে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) একটি মামলা করেছিল। ২২ মাস তদন্ত শেষে দুদকের তদন্তকারীরা ২০১৪ সালে জানিয়ে দেন, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ তারা পাননি। দেশে-বিদেশে কোনো আদালতেই পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি।

 

এতে জয় হলো সরকারের অবস্থানের। পরাজিত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। আর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা। দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে পদ্মা সেতুতে ঋণ বাতিল করা ছিল বিশ্বব্যাংকের অন্যায় সিদ্ধান্ত। সংস্থাটির একরোখা অবস্থানের কারণে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ পিছিয়ে গেছে, যার দায় সংস্থাটি এড়াতে পারে না।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন, ‘আমরা আগেই জানতাম দুর্নীতির অভিযোগ ঠিক নয়, প্রমাণিত হবে না। এখন বিশ্বব্যাংকের জবাবদিহি করা দরকার। তারা (বিশ্বব্যাংক) যে ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছে এবং সেই ষড়যন্ত্রে দেশেরও নিশ্চয় কেউ না কেউ আছেন। এটা খুব দুঃখজনক। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে বলে যারা বিভিন্ন কথা বলেছেন, তাদের এখন জিজ্ঞেস করা দরকার কিসের ভিত্তিতে তারা তখন এসব কথা বলেছিল।’

 

কথা হলো, ‘বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’

 

n লেখক : রম্য লেখক

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password