চট্টগ্রামে পলাশী দিবস স্মরণে আলোচনা সভায় বক্তারা নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইতিহাসের এক ভাগ্যাহত বীর ও দেশপ্রেমিক

  প্রিন্ট
(Last Updated On: জুন ২৪, ২০১৭)

 

 

ইন্টারন্যাশনাল হিস্ট্রি রিসার্চ এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম জেলার ব্যবস্থাপনায় ঐতিহাসিক ২৩ জুন পলাশী দিবস স্মরণে আলোচনা সভা চেরাগী পাহাড় মোমিন রোডে এক রেস্টুরেন্টে ২৩ জুন শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ইউনুচ কুতুবীর সভাপতিত্বে পলাশী দিবস স্মরণে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মরমী গবেষক কবি এস এম সিরাজউদ্দৌলা। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেনদৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। ঐতিহাসিক পলাশী দিবস ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন ইন্টারন্যাশনাল হিস্ট্রি রিসার্চ এসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক সোহেল মো. ফখরুদ-দীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইতিহাসবিদ এ বি এম ফয়েজ উল্লাহ, প্রাবন্ধিক এস এম ওসমান, অধ্যক্ষ শিহাব উদ্দিন চৌধুরী, ডা. বিমল তালুকদার, আবদুল করিম, শাহনুর আলম প্রমুখ। সভায় বক্তারা বলেছেন, আজ থেকে ২৬০ বছর আগে ২৩ জুন এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সঙ্গে এক যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ঘাতকের হাতে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতা হারায়। পরাজয়ের পর নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যু হলেও উপমহাদেশের মানুষ নবাবকে আজও শ্রদ্ধা জানায়। প্রতি বছর সেই জন্য ২৩ জুন পলাশী দিবস হিসাবে পালিত হয়। বক্তারা আরো বলেছেন, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দী খাঁ মৃত্যুর আগে দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলাকে নবাবের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করে যান। নবাব আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসেন। নবাবের খালা ঘোষেটি বেগম ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলান। সেনাপতি মীর জাফর আলি খান, ধনকুবের জগৎ শেঠ, রাজা রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন। ধূর্ত ইংরেজরা সন্ধির চুক্তি ভঙ্গ করে চন্দননগরের ফরাসীদের দুর্গ দখল করে নেয়। এরপর ১৭৫৭ সালের ১৭ জুন ক্লাইভ কাটোয়ায় অবস্থান নেয়। নবাব ২২ জুন ইংরেজদের আগেই পলাশী পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন সকাল ৮টায় যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের পরাজয় ঘটে। সেই সঙ্গে বাংলা স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয়। বক্তারা আরো বলেন, পলাশীর ষড়যন্ত্রে যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার শোচনীয় পরাজয় ঘটলেও ইংরেজরা ক্ষান্ত হয়নি সেদিন। এরপর তারা নবাবের চরিত্রে নানাভাবে কলঙ্কলেপন করতে থাকে, অন্ধকূপ হত্যা, লাম্পট্য ইত্যাদি। সিরাজ-উদ-দৌলার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে কলকাতায় একটা মনুমেন্ট তৈরি হয়েছিল। তার নাম ছিল হলওয়েল মনুমেন্ট। পরবর্তিতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে, ৩রা জুলাই, ১৯৪০ এ হলওয়ের মনুমেন্ট অপসারণের জন্য সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দিলেন। বাঙালি  ও মুসলমানেরা এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে ইংরেজদের বাধ্য করে ঐ হলওয়ের মনুমেন্ট তুলে নিতে। পরবর্তিতে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর উদ্যোগে ২৩ শে জুন প্রথম পলাশী দিবস উদযা্পিত হয়েছিল কলকাতায়। সাথে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং মওলানা আকরম খাঁ। এ ব্যাপারে কবি নজরুলের একটি বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছিল ‘দৈনিক আজাদ’ এবং ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ১৯৩৯ সালের জুনে। বিবৃতিতে নজরুলের আহবান ছিল, ‘মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নেতৃত্বে কলিকাতায় সিরাজ-উদ-দৌলা স্মৃতি কমিটি উক্ত অনুষ্ঠানকে সাফল্যমন্ডিত করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছেন। কলিকাতা কমিটিকে সর্বপ্রকার সাহায্য প্রদান করিয়া আমাদের জাতীয় বীরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিবার জন্য আমি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নিকট আবেদন জানাইতেছি। বিদেশীর বন্ধন-শৃঙ্খল হইতে মুক্তি লাভের জন্য আজ আমরা সংগ্রামে রত। সিরাজের জীবনস্মৃতি হইতে যেন আমরা অনুপ্রাণিত হই। ইহাই আমার প্রার্থনা।’ এই প্রার্থনা বিফলে যায়নি। পলাশী দিবস প্রতি বছরই আসে। কখনো সরবে, কখনো নীরবে। জাতীয় বীর সিরাজ-উদ-দৌলাকে স্মরণ করে অনুপ্রাণিত হয়, ব্যথিত হয়। একথা সত্য, নবাব সিরাজ ইতিহাসের এক ভাগ্যাহত বীর, দেশপ্রেমিক।

 

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password