বান্দরবানে বিএনপি প্রার্থী হচ্ছে মাম্যাচিং, আওয়ামীলীগের বীর বাহদুর উশৈসিং

  প্রিন্ট
(Last Updated On: অক্টোবর ১২, ২০১৮)

মো.কামরুজ্জামানঃ ১২ অক্টোবর
বান্দরবানে বি.এন.পি’র অভ্যান্তরীণ কোন্দল থাকায় বরাবরের মতো আবারো বীর বাহাদুর ৬ষ্ট বারের মত নির্বাচিত হবে একথা এখন সবার মুখে। তবে অভ্যান্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্ধ রয়েছে আওয়ামী লীগের মধ্যেও। জেলা আওয়ামী  লীগের সভাপতি-সেক্রেটারী প্রসন্ন মুজিবের মান ভাঙ্গাতে না পারলে নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে সরকার দলে। বান্দরবান আসনে পাহাড়ী বাঙ্গালীদের বসবাস প্রায় সমান সমান। পার্বত্য অন্যান্য জেলা সমুহের তূলনায় বান্দরবান জেলাও অগ্রসরমান একটি জেলা। বিগত ১০ বছর ধরে এই জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছে।
এদিকে লামা ও আলীকদম উপজেলায় ব্যক্তি ও স্বার্থদ্বন্ধের কবলে পড়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দ্বিধা বিভক্ত দলের তিনটি গ্রুপ আলাদা হয়ে অভিন্ন শ্লোগান তুলছেন। ২০১৬ সালে লামার রাজপথে প্রবীণ আওয়ামী নেতা আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদের ব্যানারে একটি পক্ষ’র আত্মপ্রকাশ ১ম ঘটেছিল। এর মধ্য দিয়ে পার্বত্য লামা উপজেলায় আওয়ামী লীগের শত প্রতিকুলতায়ও ঐক্যের সু-দীর্ঘ বন্ধনে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অনৈক্য। ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে একই চিত্র আলীকদম উপজেলায়ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
২০০৬ সালে জোট সরকরের বিদায়ের কয়েকমাস পূর্ব থেকে লামা উপজেলায় আওয়ামীলীগ তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করে ২০০৮ সালে নবম ও ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার সু-ফলও অর্জন করেন। দলের অনেক ত্যাগী ও তৃণমুলের নেতা-কর্মিদের মাঝে গ্রহনযোগ্য নেতাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে দ্বিধাবিভক্ত এখন ক্ষমতাসিন দল। ঐক্যে না আসলে হয়তো চরম খেসারত দিতে হতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সুবিধা নিতে পারে পাহাড়ী সংগঠন জেএসএস।
বিগত সরকারগুলোর আমলে সংকটময় পরিস্থিতিতে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামীলীগ লামা-আলীকদম উপজেলায় শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের জেলা সভাপতি প্রসন্ন তঞ্চঙ্গা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে, ১ম বারের মতো জেলা ব্যাপি দলের অভ্যন্তরে দ্বিধা বিভক্তি শুরু হয়। যার ফলে বীর বাহাদুর উশৈসিং আধুনিক বান্দরবানের রুপকার খ্যতি লাভ করার পরেও স্বগোত্রের সর্থন তেমন পাননি ১০ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে দলের কিছু সিনিয়র আনুগত্য নেতাদের বিশেষ করে তৎকালীন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিব-এর কারণেই জয়লাভ করেছিলেন বলে এখনো সর্বজন স্বীকার করেন। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রসন্ন তঞ্চঙ্গাকে জেলা সভাপতির পদ থেকে বহিস্কারের দাবী উঠলে, সে দাবী আমলে নেননি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। এনিয়ে রয়েছে দলের দু’পক্ষের মানাভিমান।
এদিকে সব বাঁধা অতিক্রম করে সরকার গঠন করার পরে দলটি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে একের পর এক সভা-সমাবেশ করে দলের শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপক প্রয়াস চালান। দফায় দফায় কাজী মুজিবের নেতৃত্বে জেলা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ লামা সফর করে দলকে সংগঠিত করেছিলেন। তবে আ’লীগের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন অংগসংগঠন-এর কমিটির মধ্যে কয়েকজন অকর্মন্য নেতৃত্বের কারণে দলটির মাঝে বিভিন্ন সময় ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হলেও দলীয় আনুগত্যের কারণে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ দানা বেধে ওঠতে পারেনি। অনেক ত্যাগী নেতা কর্মীরা জানায়, এ উপজেলায় আ’লীগের অংগ সংগঠনের কমিটি গঠনের সময় জেলা আ’লীগ কর্তৃক মূলত: বিতর্কিত ও পুঁজিপতি ব্যবসায়ীসহ নব্য আওয়ামীলীগের অনেককেই দলের শীর্ষপদে আসীন করা হয়।
সব কিছুর পরেও লামা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল বুদ্ধিমত্তার সাথে সহযোগি সংগঠন গুলোর সহযোগিতায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রেখে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো জোরদার করতে সক্ষম হন। কিছুদিন না যেতেই ১৫ সালে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে জেলা সেক্রেটারী ও জেলা পরিষদ সদস্য কাজী মুজিবুর রহমান-এর বিরুদ্ধে দৃষ্টতা ও পক্ষপাত মূলক আচরণের অভিযোগ উঠে। তার কয়েক দিনের মধ্যে তিনি জেলা পরিষদের সদস্য’র পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে পড়েন। এসব কিছুকে কেন্দ্র করে কাজী মুজিবকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিস্কারের দাবী উঠলেও কেন্দ্রীয় নেতারা তাও অগ্রাহ্য করেন বলে জানা যায়। এর ফলে দলীয়ভাবে এক ঘরে হয়ে পড়ে জেলা আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা কাজী মজিবুর রহমান। মূলত: এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে আরেক দফা দ্বিধা বিভক্তি দেখা দিয়ে তিন গ্রুফে ভেঙ্গে পড়ে ক্ষমতাসীন এই বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি।
এর আগে আওয়ামীলীগের নেতাদের আত্মকেন্দ্রীকতা ও খুঁটিনাটি ভুলের জের দিতে হয়েছে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে। এলাকায় অনেক উন্নয়ন কাজ করার পরেও দলের অভ্যন্তরে গোপন অনৈক্যর কারণে লামা উপজেলায় নির্বাচনে হেরে যায় আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মো: ইসমাইল। জেলার প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের সকল আসন হারিয়ে আবারো সাংগঠনিক কাজে মনোনিবেশ করে দলের নেতা কর্মিরা। এর ফলে জেলার দু’টি পৌরসভা ও পরবর্তিতে প্রায় ৩৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৫টি চেয়ারম্যান পদ নিজেদের ভাগে আনতে সক্ষম হন ক্ষমতাসিন আওয়ামীলীগ।
এরই মধ্যে শুরু হয় ভাঙ্গা গড়ার খেলা। আওয়ামীলীগের এক নেতা জানায়, দশম জাতীয় সংসদে দলের সাথে বিদ্রোহ করে জেলা সভাপতি প্রসন্ন তঞ্চঙ্গা বান্দরবানের আওয়ামীলীগের ঐতিহ্য লালিত ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করেছিল। ১৫ সালে ছাত্রলীগের সভায় অনাকাঙ্খিত ঘটনায় কাজী মুজিবকে দায় করায়, তাঁর বিশাল সমর্থক গ্রুফ ও ১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাসহ ঘাপটি মেরে বসে থাকারাও যুক্ত হয়েছে একই সারিতে। ফলে আওয়ামীলীগের সৃষ্ট দুর্গখ্যাত লামা-আলীকদম উপজেলায় দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়া আওয়ামী রাজনীতিতে জেলা আওয়ামীলীগের বিভেদের রাজনীতির কালো ছায়া ক্রমেই গ্রাস করে নিচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
অপর দিকে পাওয়া না পাওয়ার মনস্তাত্বিক দন্ধে জড়িয়ে পড়ে দলের নবীন প্রবীন অনেক নেতৃবৃন্দ। যা গোপনে তুষের আগুনে পরিণত হয়। এ সুযোগে ভেতরে বাহিরে দু’রকম, মুখোশ পরা কিছু নেতা সাথে জেএসএস-জামায়াতসহ ঘাপটি মেরে বসে আছে সুযোগের অপেক্ষায়। এ সব নেতৃত্ব আ’লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক অতীত ও বঙ্গবন্ধুর মূল দর্শনের সাথে আদৌ পরিচিতি নেই বলে জানিয়েছেন দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। সময় যত গড়াচ্ছে ততই এসব বিরোধ নিস্পত্তির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খোদ কেন্দ্রীয় নেতারাও হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
এ ব্যপারে আওয়ামীলীগের প্রবীন নেতাদের অনেকেই জানান, লামা-আলীকদম উপজেলায় চরম রাজনৈতিক সংকটময় সময়ে ‘আমরা যারা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়েছিলাম, তারা কে কেমন আছে কেউ খবর রাখে কি? এছাড়া যারা আজ আমাদের মাঝে নেই তাদের পরিবার-সন্তানদের কথা কেউ ভাবছেন না। সূতরাং আমরা সংকটকালীন সময় থেকে আওয়ামীলীগে ছিলাম, আছি এবং যতদিন আল্লাহ পাক বাঁচিয়ে রাখবেন ততদিন থাকবো। কিন্তু কারোর ইচ্ছায় আওয়ামীলীগে আসিনি এবং যাবোওনা, তবে দলের জন্য-কর্মিদের জন্য যে যেটুকু করেছে তার মুল্যায়নও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে করা হবে।
বীর বাহাদুরের নেতৃত্বে যখন সরকারের জন কল্যাণমুখি ব্যপক উন্নয়ন কর্মকান্ড ও সকল অর্জন জনগনকে অবহিত করার চুড়ান্ত সময়, ঠিক তখনই নিজেদের বিভেদ ১১ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে। এই অবস্থায় কেবল কেন্দ্রীয় নেতারাই পারে, নিজেদের মানাভিমান ভেঙ্গে আবারো ঐক্যের পতাকাতলে ফিরে আনতে। এটা করা হলে আগামী সংসদ নির্বাচন ও তার পরের উপজেলা নির্বাচনে কাঙ্খিত ফসল আসবে আওয়ামী পরিবারে। অন্যথায় সব হিসেবে পাল্টে যেতে পারে।
অপর দিকে পরপর দুবার ক্ষমতার বাহিরে থেকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বিএনপি। বিগত ১০ বছরে প্রথম প্রথম রাজপথে দ্বিধাবিভক্ত কর্মিদেরকে দেখা গেলেও, কিছুদিন পর অভ্যান্তরীন দ্বন্ধে ও পুলিশি ভয়ে ঘরবন্দি হয়ে যায় দলটি রাজনৈতিক কর্মকান্ড। তৃণপর্যায়ে এদের বিপুল সমর্থক থাকলেও নেতা ও নেতৃত্বের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তার উপর ১১ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেরী-মাম্যাচিং দু’জনের কে পাবে দলীয় টিকেট; এ নিয়েও রয়েছে দ্বিধাদ্বন্ধ। রাজপূত্র সাচিংপ্রু জেরী দীর্ঘদিন রাজপথে থাকলেও শেষ দিকে এসে মাঠ দখল নিয়েছেন মাম্যাচিং, তবে জেরীও ঢেলেঢালাভাবে মাঠে আছেন। লোকমুখে শুনা যাচ্ছে; মাম্যাচিং এর রয়েছে বাঙ্গালী জনপ্রিয়তা একইভাবে জেরী বাবুর রয়েছে উপজাতির সমর্থন। বাংগালীর ভোট বিভক্ত হলেও উপজাতিদের ভোট এক বাক্সে পড়ে এমন মন্তব্য করে অনেকের ধারণা বীর বাহাদুরের দুর্গে আঘাত হানতে হলে জেরী বাবুকে বিএনপির প্রার্থী করা দরকার।
আবার ২০০১ সালের নির্বাচনী ফলাফল বিবেচনায় মাম্যাচিংকে ধানের শীষের প্রতীক দিলে; ক্ষমতাসিনদের অভ্যান্তরীণ কোন্দল হেতু ভোটের ফলাফল বিএনপির অনুকুলে আসতে পারে বলেও মনে করেন সাধারণ নাগরিকরা। অপরদিকে জেএসএস সাংগঠনিকভাবে আগের চেয়ে অনেক শক্ত অবস্থান গড়েছে। জানাগেছে, সাচিং প্রু জেরী প্রার্থী হলে জেএসএস তাদের প্রার্থী দিবেন না। এর ফলে বান্দরবান ৩০০ নং আসনে বিশেষ করে লামা-আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি; এই তিন উপজেলায় ভোটের সমিকরণ মিলানো এখনো কঠিন। তবে ক্ষমতাসিনরা দলীয় ঐক্যোর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলে আবারো নিশ্চিত বলা যায় ৬ষ্ট বারেরমতো নৌকার পাল উড়াতে পারে বীর বাহাদুর উশৈসিং।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password