লামা-আলীকদমে নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে

  প্রিন্ট
(Last Updated On: জুন ১৮, ২০১৮)

 

মো.কামরুজ্জামান, লামা
লামা-আলীকদমে নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। । গত তিন বছরে লামা-আলীকদম উপজেলায় বেশ কয়েকটি নারী নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো প্রমান করে; কতটুকু নির্দয় আর নিষ্টুর ও বর্বর আচরণ হচ্ছে নারীর সাথে। ২০১৪ সালে লামা পৌর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে পাষন্ড স্বামীর দায়ের কোপে শিক্ষিকা অন্তস্বত্তা স্ত্রী মাক্যচিং মার্মা ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। খুনী স্বামী জামিনে মুক্ত হয়ে দিব্যি পৃথিবীর আলো বাতাশ নিচ্ছে(!)। এভাবে বিভিন্ন বয়সের অনেক নারী স্বামী-তথাকতিথ প্রেমিক কিংবা পারিবারিক অবজ্ঞা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়ার নজির রয়েছে। দেশের আইন নারীর অনুকুলে থাকলেও প্রয়োগিক ক্ষেত্রে স্বার্থজালে আটকা পড়ে সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্যাতিত নারীরা সামাজিক বিচার বিড়ম্বনায় ভোগছে। অপরদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা অসহায় হয়ে দাসত্ব বরণ করে নেয়ারমতো হচ্ছে। সমাজ সভ্যতা শুনতে পায়না নিগৃহের শিকার কণ্যা-যায়া-জননীদের বোবা কান্না। অবস্থা এমনটাই হয়েছে; স্বীয় গৃহেও নিরাপদ নয় নারীরা(!)

১৬ জুন গভীর রাতে লামায় এক কলেজ ছাত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে । লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা অংহ্লাড়ী উক্যচিং কারবারী পাড়ায় ক্যাহ্লা অং মার্মার কিশোরী মেয়েকে ঘুমুন্তবস্থায় হত্যা করেছে দূর্ববৃত্তরা। খোজ নিয়ে জানাযায়, রাতে পিতা কণ্যা একই ঘরে পাশাপাশি রুমে ঘুমিয়ে পড়ে। সকাল বেলা মেয়ের বিবস্ত্রব লাশ দেখে বাবা চিৎকার করেন। পিতার সুর চিৎকারে প্রতিবেশিরা এসে বিছানায় মেয়েটির নিস্প্রান দেহ দেখতে পায়। ওই সময় কিশোরীর রুমের জানালাটি ভাঙ্গা ও দরজা খোলাবস্থায় দেখেন পাড়ার লোকজন। জানাযায়, নিহত কিশোরীর মা গত কয়েকদিন ধরে খাগড়াছড়িতে চিকিৎসার জন্য অবস্থান করছেন। শনিবার রাতে তাদের ঘরে পাশাপাশি দু’রুমে পিতা-মেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। কিশোরীটি এ বছর ‘মাতামুহুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আর দু’মাস পরে পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। প্রাথমিকভাবে ধর্ষনের কোন আলামত বা শরীরে কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানায়।
রবিবার ছিল বিশ্ব বাবা দিবস, কিন্তু হতভাগ্য বাবা ক্যাহ্লা অং মার্মা বিশ্ব বাবা দিবসের প্রথম সকালে দেখলো নিজ সন্তানের বিবস্ত্র লাশ (!)। নির্দয় ও পৈচাশিকভাবে ১৯ বছর বয়সের কলেজ পড়–য়া কিশোরীকে হত্যার ঘটনা, যে কোন বিবেককে কাঁদিয়ে তুলবে। হত্যাকারীরা নিহতের শরীর থেকে স্বর্ণালংকার, ব্যাক্তিগত ব্যবহারের মোবাইল ফোন ও সাথে থাকা নগদ টাকা নিয়ে যায়।
সমাজে এমন অনেক নারী রয়েছে, যাঁরা নির্যাতন হতে হতে মরে বেচেঁ আছে। প্রশাসনের দীর্ঘ সূত্রিতাকে এ ক্ষেত্রে দায়ি করছেন লোকজন। অনেক সময় পবিত্র সম্পর্কের দোহাই দিয়ে স্বামী নামের পাষন্ড পুরুষ মানুষটিকে নারীর প্রতি আরো হীং¯্র হওয়ার সুযোগ করে দেয় প্রচলিত সামাজিক নিয়ম। বলা হয় স্বামী স্ত্রীর দ্বন্ধ, কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কি ঠিক হয়ে যাবে কিনা? নারী নির্যাতনের সামাজিক সূচক বিবেচনায় কতটা যুক্তি মিলে এই কথায়। এমন প্রশ্ন জাগাটা উচিৎ। নাকি কিছুদিন পরে সম্পর্কের জোড়া-তালির নামে নারীর প্রতি আত্মঘাতি হামলা বা সামাজিকভাবে হেয়পতিপন্ন করার পরিকল্পনা চলছে; স্থান-কাল পাত্র ভেদে সেই দিকগলোও ভাবা উচিৎ। এ রিপোর্টের উজ্জল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আলীকদম উপজেলার এক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী শিক্ষিকা জয়নব আরা বেগম ও তার ষোড়শী কণ্যা।
জানা গেছে, এই শিক্ষিকা তার দেবর আলীকদম উপজেলার থোয়াইচিং হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম ও স্বামী চৈক্ষ্যং ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলীকদম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করে। এ ঘটনার তদন্ত শেষে অভিযুক্ত শিক্ষকদ্বয়কে বান্দরবান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গত ১০ এপ্রিল ১৪৭ নম্বর স্মারকের অফিস আদেশে সাময়িক বরখাস্ত করেন । গত ২৫ মে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) ১১(গ)/৩০ ধারায় চার্জশীট দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আলীকদম থানার ওসি রফিক উল্লাহ্। এছাড়াও শিক্ষিকার অভিযুক্ত স্বামী শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চকরিয়া কোর্টে সি.আর মামলা নং- ১৩০/২০১৮ রুজু হয়। এ মামলার সাক্ষী হচ্ছেন চকরিয়া উপজেলার দক্ষিণ কাকারা গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম।

শিক্ষিকা জয়নব আরার অভিযোগে প্রকাশ, মামলা দায়েরের পর অভিযুক্ত শিক্ষক শফিকুল মামলার বাদী জয়নব আরা বেগম ও সাক্ষীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মনগড়া কুৎসা রটিয়ে বান্দরবান চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর মামলা নং- ৩৯/২০১৮ দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে এ মামলার তদন্ত করেন, আলীকদম উপজেলা শিক্ষা অফিসার ইস্কান্দর নুরী। তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৯ এপ্রিল ১৩৯ নম্বর স্মারকে ‘সাক্ষ্য-প্রমাণে কথিত ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি’ মর্মে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

মামলার বাদী নির্যাতিত জয়নব আরা বেগম বলেন, শিক্ষক শফিকুল এবং তার দুই সহোদর মনিরুল ও জহিরুলের বিরুদ্ধে পুলিশের চার্জশীট, তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক শফিকুলের দায়ের করা মামলা মিথ্যা মর্মে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর থেকে তারা তিন সহোদর মারমুখী হয়ে পড়ে। শুরু করেন উন্মাদের মতো আচরণ। এরপর থেকে শফিকুল তার ফেসবুক আইডিতে অশ্লীল ও মানহানিকর ছবি এবং লিফলেট আপলোড করে চলেছে। এছাড়াও শফিকুল ও মনিরুল মিলে চকরিয়ার কাকারা গ্রামে এবং আলীকদম উপজেলার বাস স্টেশন, পানবাজার, চৌমুহুনী ও আলীকদম বাজার এলাকার বিভিন্ন ওয়ালে শিক্ষিকা জয়নব ও স্থানীয় রিপোর্টার ও মানবাধিকার কর্মি, মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জড়িয়ে চরিত্রহনন করে পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে শিক্ষিকা জয়নব আরা বেগম আইসিটি এ্যাক্ট-এ মামলা করতে গিয়েও পারেননি। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে এই ন্যাক্কার জনক ও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র মূলক ঘটনার কথা সর্ব মহল জ্ঞাত রয়েছেন। এদিকে আইনের ফাকগলে শফিকুল ইসলাম ও তার সহোদররা চরমভাবে মারমুখি হয়ে উঠে জয়নব ও তাকে মানবিক সহায়তাকারীসহ তার আত্মীয়-স্বজনের উপর।

জানাযায়, গত ১৫ জুন চকরিয়া উপজেলা মাঝেরফাড়ি বাজারে মামলার সাক্ষী রেজাউল করিমকে অতর্কিত আক্রমণ করে মামলার ১নম্বর আসামী শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযুক্ত তিন সহোদর। এ সময় ছুরি দিয়ে রেজাউল করিমে মারাত্মক জখম করে শফিকুল ইসলাম। তার অপর দুইভাই মনিরুল ও জহিরুলও ছুরি ও ইটের আঘাতে উপর্যুপরি জখম করেন রেজাউলকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আসামীদের খুন-জখমের কবল থেকে রেজাউলকে উদ্ধার করেন ওই এলাকার ওয়ার্ড মেম্বার বাদশা মিয়াসহ স্থানীয়রা। ছুরি ও ইটের আঘাতে রেজাউলের ডান চোখ দৃষ্টি হারাতে চলেছেন বলে আশংকা করছেন ডাক্তার ও আহতের পরিবার-পরিজন। এ ঘটনার সময় রেজাউল করিম থেকে অভিযুক্ত শফিক, জহিরুল ও মনির জোর করে ৮৫ হাজার টাকা ও একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল ছিনিয়ে নেয় বলে থানায় করা এজাহারে বলা হয়েছে। অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে দুইজনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক। দুই সহোদর শিক্ষকের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে-বাজারে মামলার ঘটনাটি প্রকাশ্য সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয়রা

ঘটনার হোতা অভিযুক্ত শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, ঘটনার দায় অস্বীকার করলেও ফেসবুকে ছবি ও লিফলেট আপলোডের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, অন্যায়ভাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে চাকুরী থেকে সাময়িক সাসপে-ের আদেশ দিয়েছেন। আমি বর্তমানে ৫/৬ মামলার আসামী। তাই আমার মাথা ঠিক নেই(!)।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার বাদশা মিয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থলে আমি শফিকসহ তিন ভাইকে এই সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নিতে দেখেছি। এ ঘটনায় আহত রেজাউল কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। কাকারা গ্রামের লোকজন জানান, শফিকসহ তারা তিন ভাইয়ে গত কয়েক বছর আগে স্থানীয় এক যুবককে লাঠিদ্বারা প্রকাশ্যে বেদম প্রহার করে, তা ভিডিও ধারণ করে মোবাইলে আপলোড করা হয়। ওই নিষ্টুর হামলার কোন বিচার না হওয়ায় তারা আরো হীং¯্র হয়ে উঠে। অবশেষে তাদের হীং¯্র আছড় লাগতে শুরু করেছে, শিক্ষিকা জয়নব আরাসহ তাদের সন্তান, আত্মীয় স্বজনসহ ঘোটা সমাজ পরিমন্ডলে। এদিকে শিক্ষিকা জয়নব আরা বেগম জানান, শফিকুল ইসলামের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা প্রায়ই গভীর রাতে তার ঘরের দরজায় গিয়ে নানান ধরণের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। সে এবং তার দশম শ্রেণিতে পড়–য়া মেয়েকে নিয়ে নানান মন্তব্য ছড়াচ্ছে সমাজে। এসব অপবাদের যন্ত্রণায় তারা মা মেয়ে এখন মরে বেচেঁ আছেন। শফিকুলদের বেপরোয়া, সন্ত্রাসী, মারণাত্মক আচরণ থেকে প্রাণে বাঁচতে শিক্ষিকা জয়নব আরা বেগম সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী মহলসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আরো সজাগ ও সচেতন দৃষ্টি কামণা করেছেন।

এই বাস্তবতায় বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। আইন প্রয়োগকারী দায়িত্বশীলরা ঢিলেঢালা ভাব বা নিরব ভুমিকা পালন করা মোটেও কাম্য নয়। ঘাতকদের মগজের কোণে স্থান নেয়া অপরাধ জিবানুটি দ্রুত ধংস করা না হলে, এর প্রভাব সমগ্র সমাজ শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। তখন হয়তো এর নিষ্ঠুর খেসারত শুধু নিরিহ নারী বা সমাজের লোকদেরকেই দিতে হবে। সূতরাং সম্পর্কের দোহাই দিয়ে ঘাতক চক্রকে সুযোগ করে দেয়ার কোন মানে হয়না। বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নজরে আনা প্রয়োজন রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবী।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password