মহাকাশ জয়ের পথে বাংলাদেশ

  প্রিন্ট
(Last Updated On: মে ১১, ২০১৮)

ইতিহাস সৃষ্টি করতে দরজার ঠিক দোরগোড়ায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দেশের কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’মহাকাশের ডানা মেলার আর কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা মাত্র। বাংলাদেশের ইতিহাসে যোগ হতে যাচ্ছে সাফল্যের আরেকটি পালক।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইস্টার্ন টাইমজোন বিকেল ৪টায় এবং বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৪৭ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে যে কোনো সময় মহাকাশের পথে যাত্রা শুরু করবে স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

নিয়ম ভেঙ্গে স্মৃতি হিসেবে লেখা থাকবে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’
মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে সাধারণত স্মৃতি হিসেবে কোনো কিছুই লেখা থাকে না বা লিখে রাখার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে আরেকটি ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। স্মৃতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গায়ে বাংলায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানটি লেখা রয়েছে। এই স্লোগান নিয়েই মহাকাশে যাবে স্যাটেলাইটটি।

ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় বুধবার একটি হোটেলে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সম্মানে স্পেসএক্সের দেওয়া নৈশভোজ শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

তারানা হালিম বলেন, কয়েক মাস আগে যখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অগ্রগতি দেখতে ফ্লোরিডা আসি তখন স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্যাটেলাইটের গায়ে স্মৃতি হিসেবে কিছু একটা লিখতে বলে।

সে সময় তারানা হালিম তাদের বলেন, স্যাটেলাইটের গায়ে আমার কিছু লেখার এখতিয়ার নেই। যদি এতে কারও নাম লিখতেই হয় তাহলে তা অবশ্যই আমাদের জাতির জনকের নাম লিখতে হবে। আর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্লোগান হচ্ছে জয় বাংলা। তখন নিজ হাতে স্যাটেলাইটের গায়ে লিখে দেই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশকে এগিয়ে যাওয়ার পথে অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে, বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে। সেই উপগ্রহই ছিল মহাকাশের সঙ্গে দেশের যোগাযোগের প্রথম সেতুবন্ধ। তখন বিদেশি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া ছিল সেই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের কাজ।

জাতির পিতা সেদিন স্বপ্নের যে বীজ বুনেছিলেন, তার পথ ধরেই আজ আকাশে উড়ছে দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট। এর নামও জাতির পিতার নামেই, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পরিকল্পনা, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান এবং দিকনির্দেশনায় বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ প্রবেশ করতে যাচ্ছে গৌরবময় বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে।

সরাসরি সম্প্রচার হবে স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠান
যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের অত্যাধুনিক মডেল ‘ব্লক ফাইভ’ এ চড়ে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৪৭ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে যে কোনো সময় কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। এই লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকেই ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১।

এদিকে, উৎক্ষেপণের সময় অনুযায়ী বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৪৭ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঐতিহাসিক মুহূর্তটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের সব স্যাটেলাইট টিভি এবং অনলাইন সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা ও উপজেলাতেও সরাসরি সম্প্রচারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

এরই মধ্যে কেনেডি স্পেস সেন্টার টুইটার এক বার্তায় এই উৎক্ষেপণের সাক্ষী হতে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ জন্য কেনেডি স্পেস সেন্টারের পক্ষ থেকে ভিজিটর কমপ্লেক্সে দর্শকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

আগ্রহীরা সারা দিনের জন্য টিকেট কেটে কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৯ মাইল দূরে অ্যাপোলো/স্যাটার্ন ভি সেন্টার এবং প্রায় সাড়ে ৭ মাইল দূরে মূল ভিজিটর কমপ্লেক্স থেকে এই উৎক্ষেপণ দেখার সুযোগ পাবেন।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ওয়েবে বিশ্বব্যাপী লাইভ সম্প্রচার করবে স্পেসএক্স। www.spacex.com/webcastথেকে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পারবেন সকলেই। ইউটিউবে স্পেসএক্সের চ্যানেলেও লাইভ সম্প্রচার করা হবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নিয়ে ফ্যালকন-৯ ব্লক ফাইভ রকেটের যাত্রা।

স্পেসএক্স এবারই প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে তাদের ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ফাইভ মডেল ব্যবহার করতে যাচ্ছে। ব্লক ফাইভ স্পেসএক্সের একটি অনন্য রকেট, যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য।

স্পেসএক্স কর্তৃপক্ষের মতে, এই রকেট উৎক্ষেপণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এটি আবারও উড়তে সক্ষম। এমনকি এটি ১০ বার পর্যন্ত বহন কাজে সক্ষম। মূলত মহাকাশে একই রকেটের মাধ্যমে একাধিকবার নভোচারী বহনের উপযোগী হিসেবেই ব্লক ফাইভ রকেট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে নাসার নিয়ম অনুযায়ী, নভোচারী বহনের আগে এটিকে ৭ বার মানুষবিহীন ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে। আর এক্ষেত্রে আজ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নিয়ে প্রথমবারের মতো উড়তে যাচ্ছে ব্লক লাইভ রকেট।

নিজস্ব স্যাটেলাইটের ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার সহজ হবে এবং বেতার ও মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন খাতে অগ্রগতি সাধিত হবে। এতে ব্যয়ও কমে আসবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারে সরকারের আয়ও বাড়বে।

গত ৪ মে ফ্লোরিডার কেপ কেনেডি স্পেস সেন্টারে নতুন এই রকেটের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কথা থাকলেও ফ্লোরিডায় ‘ইরমা’ ঝড় এবং প্রতিকূল আবহাওয়াজনিত কারণে কয়েক দফা পিছিয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ মে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পিছনে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বিদেশি চুক্তি এবং বাকি ১ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password