সমাজকর্মী বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী স্মরণে

  প্রিন্ট
(Last Updated On: মে ৫, ২০১৮)

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী একজন কর্মবীর। দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা এ জাতি কখনো ভুলতে পারবে না। সমাজ উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে শত শত কর্মবীর তৈরি হয়েছে। যাঁরা প্রতিনিয়ত সমাজ উন্নয়নে কাজ করেই চলছেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ ফেডারেশন তাঁর হাতে গড়া জাতীয় পর্যায়ের সমাজসেবা সংগঠন। মৃত্যু দিন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। এই সংগঠনের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেই চলেছেন আরেকজন কিংবদন্তি সমাজকর্মী আলহাজ্ব হাফেজ মো. আমান উল্লাহ। এই সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষা উন্নয়ন, সমাজ উন্নয়ন, এতিম অনাথ হতদরিদ্র শিশুদের শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত জীবন দানের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করে চলছেন। বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী। জন্ম কক্সবাজার জেলার রামুতে হলেও কর্মসূত্রে প্রথমে চট্টগ্রাম পরবর্তীতে ঢাকায় বসবাস করেন। আমিরুল কবির চৌধুরী চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সেবা করার মানসে প্রতিনিয়ত কাজ করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর সাথে আমার সুসম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক ও সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামালের মাধ্যমে তাঁর সাথে পরিচয়। ঢাকার সার্কিট হাউস রোডস্থ বিচারপতিদের বাসভবনে তিনি বাস করতেন। সৈয়দ মোস্তফা জামাল সহ তাঁর বাসভবনে একাধিকবার আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রতিবার দেখা হওয়া মাত্রই দরদি কণ্ঠে বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের খবর নিতেন। আগ্রহের সহিত সমাজ উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়নের খোঁজখবর রাখতেন। সৈয়দ মোস্তফা জামাল মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর তিনি আমাকে বলেন, “এবার আমি চট্টগ্রাম গমন করিলে আমি জামাল ভাইয়ের (সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল) কবর জিয়ারত করিতে যাব। তুমি সঙ্গে থাকবে।” কথা মতো তিনি চট্টগ্রাম আসলে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে সরকারি গাড়িতে ও পুলিশ প্রোটেকশন নিয়ে সাতকানিয়া সোনাকানিয়াস্থ মঞ্জিল দরবারে পৌঁছান। সেখানে তিনি সৈয়দ মোস্তফা জামাল ও তাঁর পিতা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রদূত সৈয়দ সুলতান এর কবর জেয়ারত করান। আমার জীবনে অনেক বড় বড় মানুষের সাথে মেলামেশার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম সমাজকর্মী ও কর্মবীর বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী অন্যরকম একজন মনীষী। ১ মে ২০১৮ ঢাকার ধানমন্ডি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোক গমন করেন এই মনীষী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। ১ মে ২০১৮ ঢাকায় দুইদফা জানাজার নামাজের পর চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। ২ মে ২০১৮ চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার জামে মসজিদ মাঠে জানাজার নামাজ শেষে ওখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে ইট-সুরকির-পাথরের এই শহরের একজন নিবেদিত সমাজকর্মীর চিরবিদায় হলো। আদর্শবাদী, মানবতাবাদী, সমাজকর্মী, বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর জন্ম কক্সবাজার জেলার প্রাচীন রামু থানার নোনাছড়ি গ্রামে। ২৩ জুন ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এডভোকেট গোলাম কবির চৌধুরী, মাতা গুলনর বেগম চৌধুরী। পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ লেটার মার্কসহ ১৯৫৫ সালে কক্সবাজার হাইস্কুল থেমে ১ম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে কৃতিত্বের সাথে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করে চট্টগ্রাম জজকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ও ১৯৯২ সালে আপীল বিভাগে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্তি হন। ১৯৭৭-৭৮ সালে এপিপি, ১৯৭৯-৮৩ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার পিপি, ১৯৮৪-৮৮ সালে হাইকোর্টে সরকারি প্যানেল এডভোকেট, ১৯৮৯-৯৬ সালে ডেপুটি এটর্নী জেনারেল হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ও ২০০৪ সালে আপীল বিভাগের বিচারক হিসাবে নিযুক্তি হন। কক্সবাজার জেলার তিনিই প্রথম বিচারপতি। বিচার বিভাগে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক ২০০৪ সালে সমিতির প্রথম সম্মানিত সদস্য পদ অর্জন করেন। ২০০৭ সালে বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণের পর সরকার কর্তৃক শ্রম আপীল ট্রাইবুন্যালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ২০০৮ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার পর কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ লাভ করেন। আইন পেশার পাশাপাশি সমাজসেবায় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। জাতীয় আইনজীবী সমিতির প্রতিষ্ঠাকল্পে সাংগঠনিক কমিটির সদস্য, ১৯৮৭-৮৮ সালে সুপ্রীম কোর্ট (হাইকোর্ট ডিভিশন) চট্টগ্রাম বেঞ্চ আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ১৯৫৩Ñ৫৪ সালে সম্পাদক, কক্সবাজার হাইস্কুল ডিবেটিং সোসাইটি, ১৯৫৩Ñ৫৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, পল্লীমঙ্গল সমিতি, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, লিয়াকত মেমোরিয়েল ক্লাব কক্সবাজার, ১৯৫৩Ñ৫৮ সালে সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগ ও ১৯৫৫Ñ৫৮ সালে যুগ্ম সম্পাদক, জেলা মুসলিম ছাত্রলীগ, ১৯৬৪Ñ৯০ সালে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার সমিতি, চট্টগ্রাম, ১৯৯১Ñ৯৬ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, ১৯৭৩Ñ৯০ সালে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সমাজকল্যাণ কাউন্সিলের সদস্য ও ১৯৮৪Ñ৯০ সরকার কর্তৃক গঠিত কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা সমাজকল্যাণ কাউন্সিলের সহ-সভাপতি, ১৯৮০Ñ৯৬ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, বিচারপতি হিসাবে নিয়োগের আগ পর্যন্ত অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সংস্থা, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম সমাজকল্যাণ ত্রাণ কমিটি, খরুলিয়া পল্লী ধর্ম ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১ ও ৩ নম্বর চট্টগ্রাম শহর সমাজসেবা প্রকল্পে সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, নাটাব, ডায়াবেটিক সোসাইটিসহ বহুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য ছিলেন। সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাঁশখালী সমাজসেবা সংসদ, কুতুবদিয়া সমিতি, চট্টগ্রাম, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সমিতি, ঢাকার সম্মানিত সদস্যপদ ও ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বায়তুশ শরফ কর্তৃক ফেলোশীপ অর্জন ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী গবেষণা একাডেমি কর্তৃক স্বর্ণপদক সম্মান, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ সংসদ ঢাকা সম্মাননাও অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সরকার-এর সমাজকল্যাণ কাউন্সিল কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সমাজকর্মী পদক, ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামের সেবানিকেতন পদক, ২০০০ সালে কক্সবাজার প্রেসক্লাব পদক এবং ১৯৯৫ সালে আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ কর্তৃক গুণীজন সংবর্ধনা লাভ করেন। দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পরিচিতি ছিল। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশের রোটারী ক্লাবসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্মাননা লাভ করেন বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী। ১৯৭৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আন্তর্জাতিক সমাজকল্যাণ সম্মেলন, ২০০১ সালে দিল্লীতে দক্ষিণ এশিয়ার বিচারপতিদের ওয়ার্কশপ, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘গ্লোবাল জাজেস ফোরাম’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চ আদালতসমূহের কার্যাবলী অবলোকন করেন। ২০০৫ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত আইডিপি সংক্রান্ত কোর্সে অংশগ্রহণ, ২০০৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিচারপতি সম্মেলন ও ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে অনুষ্ঠিত ১৫তম আন্তর্জাতিক বিচারপতি সম্মেলনে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেন। ভারত, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মালদ্বীপ-এ অনুষ্ঠিত মানবাধিকার বিষয়ক সম্মেলন ও ওয়ার্কশপে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব প্রদান করে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনেন। যুক্তরাজ্যের হাউস অফ্ কমনস ও হাউস অব লর্ডস-এর অধিবেশন প্রত্যক্ষ করে সে বিষয়ের উপর বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখালেখি করেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উক্ত দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশনা উৎসবে যোগদান ও যুক্তরাজ্যে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার সম্পর্কিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও মানবতার কথা বিশ্ব দরবারে তিনি তুলে ধরেন। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ইতালি, কাতার, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন। আইন ও সমাজসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রবন্ধ জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে লিখেছেন। সে বিষয়ের উপর তাঁর একটি অসাধারণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা দেশবিদেশে সমাদৃত। এই মহান গুণী মানুষটি ৭৮ বছর বয়সে ১ মে ২০১৮ ইংরেজি তারিখে পবিত্র শবে বরাতের মহিমান্বিত রাতে ইন্তেকাল করেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তি ও পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মানুষকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password