বাংলাদেশ, সোমবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ।

দূষণ মুক্ত দেশ চাই

আজহার মাহমুদ

সবুজের দেশ বাংলাদেশ। আমাদের দেশের রূপ এবং প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হয় সারা বিশ্ব। কিন্তু সেই রূপ এবং প্রকৃতি আজ পাল্টে যাচ্ছে। আজ নদ-নদী, খাল-বিল সব কিছুই দুষিত। যেভাবে বায়ু দূষণ সেভাবে শব্দ দূষণ। কোনোটাই মুক্তি দিচ্ছেনা আমাদের দেশের মানুষকে। দূষণ থেকে যেনো নিস্তার নাই! বায়ু দূষণের কবলে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এই বায়ু দূষণের জন্য বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরাই। বিশ্ব জরিফ বলছে, বায়ু দূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশ। মূলত যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া ও ধুলা থেকে বাতাসে ক্ষুদ্রকণা গুলো ছড়িয়ে পড়ে। ইট ভাটা, যানবাহন, শিল্পকারখানার ধোঁয়া বাতাসে মিশে দূষিত করছে আমাদের এই সবুজ দেশকে। বায়ু দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী ইট ভাটাগুলো। দূষণের ৫৬ শতাংশই আসে এই উৎস থেকে। ইট ভাটাগুলো আধুনিায়নের বা দূষণ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কিনা তাও সন্দেহ? এছাড়া শিল্পকারখানা গুলো অবাধে নদী-জলাশয়ের পানি দূষণ করছে। বহু কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বা ইটিপি নেই। যেগুলোতে আছে তারাও খরচ কমাতে ঠিকমতো ইটিপি ব্যবহার করে না। দূষিত তরল বর্জ্য নদীতে ছেড়ে দেয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্বক হুমুকির মুখে। আবার কিছু কিছু বিজ্ঞানীদের মতে এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। জনসংখ্যার মাত্র বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দূষণের মাত্রাও ‍বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ু দূষণের কারণে দেশে প্রতি বছর ক্ষতি হয় জিডিপির এক শতাংশ বা ২৫০ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশের টাকায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হয়েছে, সামগ্রিকভাবে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির চার শতাংশ বা ৮২ হাজার কোটি টাকার ন্যায়। কিন্তু এই ক্ষতি মোকাবেলায় আমাদের ভূমিকা কতটুকু? যদি দূষণের কারণেই বছরে লাখো কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলে দেশের উন্নয়ণ গতি পাবে কীভাবে? শূধু বায়ু দূষণেই নয়, সাথে আরো একটি দূষণ রয়েছে যা আমাদের জন্য বেশী ক্ষতিকর। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে বায়ু দূষণের চাইতে মারাত্বক হচ্ছে শব্দ দূষণ। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, মসজিদ, মন্দির এমনকি হাসপাতালের রোগীরাও এই শব্দ দূষণের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। শব্দ দূষণ নামক অপরাধের জন্য দেশে প্রচলিত আইন আছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। অযথা যেখানে সেখানে গাড়ীর হর্ন বাজিয়ে যারা জনজীবনে দূর্ভোগ ডেকে আনে তাদের বিরোদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অতীব জরুরী। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সেখানে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। মাইক ও হর্নের ব্যবহারের জন্য প্রশাসনের পূর্বানুমতি নেয়ার আইন আছে বলে জানা যায়। রাজনৈতিক সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কী সংখ্যক মাইক-হর্ন ব্যবহার করতে পারবে আয়োজকগণ, তার একটা নির্দিষ্ট বিধিবিধান প্রশাসনের কাছে নিশ্চয় আছে। জনগণের সমাবেশ ও আধিক্য অনুপাতে এ মাইকের ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে শ্রোতার চেয়ে মাইক ও হর্ণের ব্যবহারের আধিক্য লক্ষণীয়। জনচলাচল অফিস আদালত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা না রেখে প্রয়োজনতিরিক্ত মাইকের ব্যবহার কী ধরনের জনউপকারে আসছে সেটা বোধগম্য নয়। অনুষ্ঠানের নামে মাঠ, রাস্তা, অফিসপাড়া, বাসাবাড়ি ঘেষে মাইকের হর্ণ ব্যবহার করে নগরজীবনে চরম অশান্তি সৃষ্টি করছে। তবুও আমদের কাছে এই শব্দ দূষণ অবহেলার বিষয় মনে হয়। এই শব্দ দূষণে মানুষ ছাড়াও প্রকৃতির জীবজন্তুর স্বাস্থ্যের জন্য আশঙ্কাজনক ও হুমকি স্বরূপ। শব্দ দূষণ মানুষের মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। যার ফলে মানুষ অবমন্নতা, শ্রবন শক্তি হ্রাস, ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি, কর্মক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি সহ নানা সমস্যায় পড়ছে। শব্দ দূষণ এখন এমন এক পর্যায় পৌছেছে যা নিশ্চিত এক ঝুঁকি। আর এ ঝুকি আমাদের দেশে আজীবন বহাল থাকার পাঁয়তারা করছে। কেননা আমরাতো শব্দ দূষণের মত হুমকি নির্বিবাদে সহ্য করে যাচ্ছি। কোনো প্রকার অভিযোগ বা প্রতিবাদ করছি না। আমরা নিজেরাও সচেতন হচ্ছিনা। শব্দ দূষণের মতো হুমকি দূর করতে হলে সচেতন হতে হবে জনসাধারণকে। শুধু শব্দ দূষণ নয়, শব্দ এবং বায়ু দূষণ উভয় দূষণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। এসকল দূষণ রোধে একমাত্র জনসচেতনতাই মূখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। যেহেতু দেশ আমাদের, তাই দূষন রোধের দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। সারাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তর আছে, পরিবেশবাদী সংঘঠন আছে, স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে, রয়েছে পাড়া মহল্লা ওয়ার্ডভিত্তিক সামাজিক কমিটি। এই দায়িত্বতো তাদের। এখানে সামাজিক আন্দোলন আর প্রতিরোধের বিকল্প নেই। সামাজিক সংঘঠন ও প্রতিষ্ঠান সমূহকে দূষণের বিরুদ্ধে এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এসব আন্দোলনে পরিবেশবাদী ও প্রশাসনকে সহযোগীতা দিতে হবে। তাহলে কিছুটা হলেও আশা করা যায় দূষণের যন্ত্রণা থেকে সমাজ ও মানুষ রেহাই পাবে। সবাই যদি সচেতন হই, তবে দূষণ মুক্ত দেশ গড়াও অসম্ভব কিছু নয় বলে আমার বিশ্বাস পরিশেষে বলতে চাই:- দূষণ মুক্ত দেশ চাইলে
হও সকলে সচেতন,
সচেতন যদি হয় সকলে
হারিয়ে যাবে সকল দূষণ।

এই বিভাগের আরো খবর

আরো খবর

Leave a Reply