বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২৫শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং, ১২ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

ধ্বংসের মুখে দেশীয় কাগজ শিল্প আমদানি নিয়ন্ত্রণ চাই

শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকার যখন দেশীয় কাগজশিল্পের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন এ শিল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। দেশীয় কাগজ মিলগুলো নিজেদের প্রচেষ্টায় যখন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানি করছে, তখনই বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার নামে দুর্নীতিবাজ কাস্টম কর্মকর্তাদের সহায়তায় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কাগজ আমদানি করছে একাধিক ব্যবসায়ী চক্র।
কাগজশিল্প মালিকদের মতে, দেশে কাগজের মোট বাজারের পরিমাণ বছরে ছয় হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশে কাগজশিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণ খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭১টি কাগজ ও কাগজ জাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কারখানাগুলোর বছরে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ লাখ টন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের কাগজকলগুলো প্রায় ৩০টি দেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা কাগজশিল্পে নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বাড়ার কারণে বাংলাদেশের কাগজ উৎপাদকরা এখন ইউরোপের বাজারে কাগজ রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) দেয়া বিভিন্ন সুবিধা দাবি করছে। গুণগত মান ভালো হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে কাগজ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করছে। যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম রিটেইলার টেসকোও বাংলাদেশ থেকে কাগজ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কাছে।
শুল্ক ফাঁকি ও বিদেশে টাকা পাচারসহ অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ২৩ প্রভাবশালীর নিয়মবহির্ভূত বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের কাগজশিল্প এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে কাগজ কলগুলোর ২০ লাখ শ্রমিক পরিবারের ভাগ্য।
বন্ডেড ওয়্যার হাউসের মাধ্যমে কাগজ আমদানির ‘শুল্কমুক্ত সুবিধা’ এখন দেশের জন্য বড় আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাগজ আমদানি’র নামে আসছে ন্যাপকিন, ফেসিয়াল টিস্যু, টয়লেট টিস্যু, ইসিজি পেপারের ছদ্মাবরণে পাতলা সাদা কাগজ। মিথ্যা ঘোষণায় আনা সাদা কাগজে সয়লাব হয়ে আছে রাজধানীর নবাবপুর, জিন্দাবাহার, ইসলামপুর ও ফকিরাপুলের কাগজ গুদামগুলো।
বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। বন্ধ করা যাচ্ছে না ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনাও। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ইসিজি পেপারের ঘোষণা দিয়ে দেদার থার্মাল ও কার্বনলেস পেপার আমদানি করা হচ্ছে, বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে শত শত টন সাদা কাগজ, আর্ট কার্ড ও সুইডিশ বোর্ড। ‘শুল্কমুক্ত সুবিধা’ নিয়ে আমদানিকৃত এসব বোর্ড, আর্ট কার্ড ও সাদা কাগজ খোলাবাজারে বেচাকেনাও চলছে পাল্লা দিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি শাখার এক কর্মকর্তা বলেছে, ফরমালিন বন্ধের মতো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কাগজ আমদানির ক্ষেত্রেও। এটি হলে মিথ্যা ঘোষণায় বা বিনাশুল্কে অবাধে কাগজ আমদানি কিছুটা কমবে। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কাগজে নানারকম কেমিক্যাল জার্ম থাকে। অথচ কাগজগুলো কোনোরকম পরীক্ষা ছাড়াই অবাধে দেশে ঢোকানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআই’র একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানায়, বিএসটিআই’র বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকায় আমদানিকৃত কাগজের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থেই আমদানিকৃত কাগজের মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিদেশ থেকে কাগজ ও কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির নামে বিদেশী কোম্পানির এ দেশীয় এজেন্টরা প্রতি বছর অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার (১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) পাচার করছে। আমদানির নামে ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র মাধ্যমে দেশীয় টাকা পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকায় রয়েছে কাগজ আমদানিকারকরা। এটা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও দোষীদের ব্যাপারে দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কোনো উদ্যাগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উদ্যোক্তারা কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে বিএসটিআইয়ের প্রত্যয়নপত্র দাখিলের বিধান করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাছাড়া কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানির সময় সব ধরনের পরীক্ষা ও এইচএস কোড যাচাই করে পণ্য খালাসেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারেও সরকারের কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই।
দেশীয় কাগজ বাজারজাত করতে বিএসটিআইয়ের মাননিয়ন্ত্রণ সনদ বাধ্যতামূলক হলেও আমদানি করা কাগজের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই।
মূলত, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের কাগজকলগুলো। বিশ্ববাজারে অসম প্রতিযোগিতা এবং দেশে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব থাকা সত্ত্বেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন থেমে নেই। তবে সরকারের সঠিক নজরদারির অভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে দেশীয় কাগজকলগুলো। উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে সাত লাখ টন কাগজ। এ কারণে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছে এ খাতের উদ্যোক্তারা। এ বিষয়ে সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
মূলত, সব সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা তথা সততা।

আরো খবর

Leave a Reply