বাংলাদেশ, বুধবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং, ১১ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকসহ ৫ আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ

নিম্ন মানের ও ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ পান করে ২৮ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকসহ খালাস পাওয়া পাঁচ আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদেশপ্রাপ্তির সাতদিনের মধ্যে তাদেরকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের ডিভিশন বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন।
গত বছরের ২৮ নভেম্বর ঢাকার ড্রাগ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান এক রায়ে রিড ফার্মার মালিক মিজানুর রহমান, তাঁর স্ত্রী পরিচালক শিউলি রহমান, পরিচালক আবদুল গণি, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল ইসলাম ও এনামুল হককে খালাস দেন। রায়ে আদালত বলেছে, মামলার বাদী ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলামের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণেই রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ মামলার বাদী সঠিক নিয়ম না মেনেই জব্দ তালিকা প্রস্তুত করেছেন। এমনকি পরীক্ষার প্রতিবেদন সঠিকভাবে দাখিল করেননি। এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তেও ছিলো গাফিলতি। মামলা দায়েরের সময় যেসব পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল, তা তিনি গ্রহণ করেননি। এতে তার অযোগ‌্যতা ও অদক্ষতা প্রমাণিত হয়। এ কারণে আসামিদের খালাস দেয়া হলো।
এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিলে বলা হয়, মামলার রেকর্ডে যে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে তার ভিত্তিতে আসামিরা খালাস পেতে পারে না। কিন্তু বিচারিক আদালত খালাস দিয়ে যে রায় দিয়েছে তা সঠিক হয়নি। এ কারণে ওই রায় বাতিল করে আসামিদের যথপোযুক্ত সাজা দেয়া হোক। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির আহমেদ। শুনানি শেষে হাইকোর্ট উপরোক্ত আদেশ দেয়।
২০০৯ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে রিড ফার্মার বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ পানে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৮ শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি তখন সারা দেশে ব্যাপকভাবে চাঞ্চল্যের জন্ম দেয়। কারখানায় ভেজাল ও নিম্নমানের প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ১০ আগস্ট ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, রিড ফার্মার টেমসেট সিরাপ (প্যারাসিটামল) এবং নিডাপ্লেক্স সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) খেয়ে কিডনি অকেজো হয়ে শিশু মারা গেছে মর্মে  ২০০৯ সালের ২১ জুলাই কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওষুধ প্রশাসন পরিদফতর জনস্বার্থে ওই ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এম আর খান এবং এইচ এস কে আলম ওই দুইটি সিরাপের নমুনা সংগ্রহ করে ড্রাগ টেস্টটিং ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করান। ২৯ জুলাই ড্রাগ টেস্টটিং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার রিপোর্টে বলেন, এগুলোতে ক্ষতিকর ডাই ইথাইল গ্লাইকল মেশানো হয়েছে। যা মূলত প্লাস্টিক বা চামরার রঙের থিনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলো মানুষের দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই প্যারাসিটামল পান করে শিশু মারাও গেছে। মামলা করার পর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। মিজানুর রহমান ওই বছরের ১২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠায়। শিউলি হাইকোর্টে জামিন পান।
ঘটনার পর মামলার এজাহারের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যে গড়মিল পরিলক্ষিত হয়। এজাহারে  বলা হয়েছিল, রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলেন, ওই প্যারাসিটামলে ডাই ইথানল গ্লাইকল পাওয়া যায়নি। তবে ওই ওষুধ ছিল নিম্নমানের। বিচার চলাকালে আলোচিত এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক এইচএসকে আলম, ঔষধ প্রশাসনের সহকারি পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, একই অধিদপ্তরের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের সহকারি বিশ্লেষক মো. আবু বকর সিদ্দিক। সাক্ষ্য গ্রহন শেষে গতকাল আদালত ওই রায় ঘোষণা করে।

আরো খবর

Leave a Reply