নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা শিক্ষা খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধ

  প্রিন্ট
(সর্বশেষ আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০১৮)

আজহার মাহমুদ

নতুন বছর মানে সবকিছু আবার নতুন ভাবে শুরু করা। সব ভুলকে শুধরে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নাম নতুন বছর। তাই এই নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা থাকবে অনেক বেশী। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরনের একটি বড় মঞ্চ হচ্ছে ২০১৮ সাল। নতুন বছরে শিক্ষার্থীরা দেখতে চায় না আর কোনো প্রশ্ন ফাঁসের গল্প। বন্ধ করতে হবে প্রশ্নফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধকে। শাস্তি দিতে হবে এসব অপরাধের সাথে জড়িত ব্যাক্তিদের। নতুন বছরে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বই পেয়ে খুশিতে উচ্ছাসিত হয়েছে। সেই খুশি যেনো পরিক্ষার ফল পাওয়ার পরেও থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে সকলের। শিক্ষার্থীরা যেনো নির্বিঘ্নে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যেতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা থাকবে ২০১৮ সালের শেষের দিকে জাতিয় নির্বাচনের প্রচারণায় তাদের ব্যবহার না করা। অনেক শিক্ষার্থীদের দেখা যায় নির্বাচনি প্রচারণা কালিন সময়ে স্কুল, কলেজে আসা বন্ধ করে দেয়। তারা তখন ব্যস্ত থাকে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ এগুলো নিয়ে । শিক্ষার্থীদের প্রধান এবং মূখ্য কাজ হচ্ছে পড়ালেখা করা। এখন দেখা যায় তাদের সেই মূখ্য কাজ থেকে বড় কাজ হয়ে দাঁড়ায় এসব মিছিল, মিটিং, সমাবেশ। আর কেনই বা পড়ালেখার চাইতে বড় হবে না, যেখানে গেলে টাকা পাওয়া যায় সেখানে তো যাবেই। এসকল কাজ থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়ার জন্য আহবান করা হলো নির্বাচনি দল গুলোর প্রতি, সাথে অভিবাবকদেরও দৃষ্টি রাখতে হবে তার সন্তানের উপর। শিক্ষার্থীদের স্থান শিক্ষাপ্রতিষ্টান। বর্তমানে দেখাযায় একটি ক্লাসে ৫০% শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকেনা। এর মূল কারণ হচ্ছে সঠিক ভাবে তদারকি না করা। অভিবাবকরা সচেতন নেই তাদের সন্তানদের প্রতি, শিক্ষকরা সচেতন নেই তাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি। আর শিক্ষাপ্রতিষ্টান গুলোর খবর রাখে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এভাবে অবহেলা করলে কখনো শিক্ষার্থীদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রসামুখী করা যাবে না। এজন্য সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনেক। প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি ধাক্কা হচ্ছে ভর্তি জালিয়াতি। সেটা হোক স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানেই যাবেন এ চক্র আছেই আছে। উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা এইচ. এস. সি. পাশ করার পর সকল শিক্ষার্থীদের সপ্ন থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। কিন্তু মেধার বিচারে যারা ঠিকবে তারাই সেখানে পড়ার সুযুগ পায়। কিন্তু মেধার বিচারের সাথে সাথে যে মোটা অংকের টাকার বিচার হয় সেটাও অবিশ্বাসের কিছু নেই। কিছুদিন আগে “চ্যনেল 24” এর অনুসন্ধান মূলক অনুষ্টান সার্চলাইটে দেখানো হয়েছিলো কিভাবে মেধাবি শিক্ষার্থীদের আসন টাকা দিয়ে অন্যরাও কিনে নিতে পারে। টিম সার্চলাইট তাদের অভিযানের মাধ্যমে দেখিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী, যারা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে ভর্তি পরিক্ষা দিয়েছে। দেখিয়েছে কিভাবে প্রশ্নফাঁস করে অপরাধীরা। সাথে তুলে ধরেছিলো টাকার অভাবে এক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারার করুণ একটি গল্প। এভাবে হাজারো করুণ গল্প আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়্, মিড়িয়া হয়তো কিছু কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করে। সবগুলো তাদের তুলে ধরা হয়তো সম্ভব না কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে সেগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরার। নতুন বছরের প্রত্যাশার থাকবে কোনো গরীব শিক্ষার্থী যেনো টাকার অভাবে পড়ালেখা থেকে দূরে সরে না যায়। মিড়িয়ার তৎপরতায় হয়তো কিছু অপরাধী ধরা পড়েছে, কিন্তু এরকম আরো অনেক অপরাধী রয়েছে আমাদের মাঝে যাদের আমরা ধরতে পারিনি। আর এই সকল অপরাধের সাথে জড়িত থাকে তাদের অভিবাকরা। অভিবাবক টাকা দেওয়ার ফলেই সন্তান অবৈধ পন্থা অবলম্বন করছে। আগে আমাদের অভিবাবকদের সচেতন হতে হবে। তার পর শিক্ষার্থীরা সচেতন হবে। অভিবাবক অপরাধ করলে, তার সন্তান কেন অপরাধ করবে না। মা বাব নাকি সন্তানদের প্রথম শিক্ষক, তাহলে সন্তানরা তাদের থেকেই তো আগে শিখবে। তাই নতুন বছরের প্রত্যশা অভিবাকদের প্রতিও রইলো। তারা যেনো তাদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দেয়। নতুন বছরের শুরুতে দেখা যায় বিভিন্ন সরকারী স্কুল সমূহে ভর্তি পরিক্ষা নেওয়া হয়। অভিবাবকদেরও ইচ্ছা তাদের সন্তানরা যেনো সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তি পরিক্ষার মাধ্যমে কয়জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে সেটাও জানার বাকী নেই সকলের। এটা হয়তো একটা ফরমালেটি মাত্র। বাস্তবে সিট গুলো টাকার মাধ্যমে বেঁচাকেনা হয়েগেছে অনেক আগেই। আর এসকল জালিয়াতির বিরুদ্ধে তৎপরতা দেখা যায়না বল্লেই চলে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার এসকল অপরাধের বিরোদ্ধে বলার অধিকার আছে। কিন্তু এসকল অপরাধের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তাই প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা রইলো এসকল অপরাধের সঠিক তদন্ত করে শাস্তির আওতায় আনার। কোনো এক খবরের কাগজে পড়েছিলাম ২০১৭ সালের পঞ্চম শ্রেণীর পি. এস. সি. পরিক্ষায়ও প্রশ্নফাঁস হয়েছে, সেই সাথে একই খবরের কাগেজে বলা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেনীর প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যখন এধরনের খবর পত্রিকায় পড়ি। দেশের শিক্ষার্থীরা এখবর থেকে কী শিখবে? এসকল অপরাধে তো আর শিক্ষার্থী জড়িত থাকে না। এখানে অভিবাবক আর শিক্ষক জড়িত আছে এটা যে কেউ বলবে। আমাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে সেটা সময় হয়তো বলে দিবে। তবে অভিবাবক আর শিক্ষকরাও যে চাইলে এসকল অপরাধ বন্ধ করতে পারে সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এছাড়াও বিভিন্ শিক্ষাপ্রতিষ্টানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে পরিমান অর্থ হাতিয়ে নেয় তা বলার কোনো ভাষা নেই। অতিরিক্ত ফি আদায় ঠেকাতে প্রশাসনের দরজায় অনেকে হাজির হয়েছে এবার। প্রশাসনের সু নজর থাকলে হয়তো শিক্ষাখাতে দুর্নীতি অনেকখানি প্রতিরোধ করা যাবে। সম্প্রতি প্রশ্নফাঁস এড়ানো সহ দুদকের ৩৯টি সুপারিশ ছিলো শিক্ষাখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে। এরমধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে আটটি সুপারিশ ছিলো। এসকল সুপারিশ যদি সঠিকভাবে মেনে চলাহয় তবে প্রশ্নফাঁস এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন অনেক শিক্ষাবিদ। কোচিং এবং নোট গাইড বাণিজ্য বন্ধে আটটি সুপারিশ করেছেন দুদক। এখাতে দুর্ণীতির মূল বিষয় হচ্ছে শ্রেনিকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান না করা। এছাড়াও সরকারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্টান সমূহের নানা অনিয়মের জন্য পাচঁটি সুপারিশ করেছেন দুদক। এনসিটিবি’র পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে পাচঁটি সুপারিশ করেছেন দুদক। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রন, টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাসহ আটটি সুপারিশ করা হয়েছে, এবং সর্বশেষ ছয়টি সুপারিশ গ্রহন করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন পথে পরিচালিত হবে, তার নিয়ন্ত্রক শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুদকের এসকল সুপারিশ সঠিকভাবে মেনে চললে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নিঃসন্দেহে এক একটি দেশের সম্পদ হিসেবে রুপান্তর হবে। তাই সকল প্রত্যাশার মাঝে একটাই প্রত্যাশা, সেটা হলো শিক্ষাখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ। তবেই শিক্ষাখাতের উন্নয়ন হবে আশানুরূপ। বর্তমান সরকার এবং প্রশাসনের সঠিক তদারকি থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরনে বাঁধা হয়ে দাড়াবার কেউ থাকবে না। তাই আসুন শিক্ষাখাত থেকে দুর্নীতি বন্ধ করতে আমরা সকলে এক হয়ে কাজ করি।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password