জনগণের নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী

  প্রিন্ট
(Last Updated On: ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭)

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। এই চট্টগ্রামের তিন তিনবার নির্বাচিত মেয়র আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মহিউদ্দিন চৌধুরী সর্বশেষ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মেয়র থাকাকালে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের হৃদয়ে বাসা বেঁধেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। গৃহহীন থেকে পুঁজিপতি সবার কাছে তিনি জনপ্রিয় মানুষ। অধিকার হারা মানুষের পক্ষের শক্তি হিসেবে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। চট্টগ্রামের মাটি মানুষের নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। জনতা ও জনগণের নেতা, আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সংগঠক তিনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেেহর পরশে রাজনীতিতে আসা। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে জনগণের রাজনীতিতে প্রবেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে অসীম অবদান রাখে। মূলত চট্টগ্রাম নামের ইতিহাসে, রাজনীতি, সেবা, সাহিত্য, ছাত্র রাজনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষার উন্নয়ন, বন্দর উন্নয়ন, বিমান বন্দর উন্নয়ন, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড, ওয়ার্ডভিত্তিক চিকিৎসা সেবাসহ সর্বক্ষেত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম।
চট্টগ্রামের মানুষের প্রিয় নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী হঠাৎ করে না ফেরার দেশে চলে যান। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ইং মধ্যরাতে নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। লাখ লাখ মানুষের প্রিয় নেতার প্রয়াণ সংবাদ শুনে সেই রাত থেকে জানাজা দাফন পর্যন্ত লাখো মানুষ শোকাহত হয়ে শেষ নজর দেখার জন্য ছুটে আসে। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘির ময়দানে ১৫ ডিসেম্বর শুক্রবার আসরের নামাজের পর লক্ষ জনতার অংশগ্রহণে জানাজার নামাজের পর ঐতিহ্যবাহী শেখ ফরিদ (রা.) জামে মসজিদ চশমা হিলে তাঁর বাবার কবরের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত হন। নগরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। পুরো নগরে কালো পতাকা ও ব্যানারে চেয়ে গেছে। পরের দিন বিজয় দিবসের কর্মসূচি শোকের কারণে সংক্ষিপ্ত হয়। আওয়ামী লীগসহ সিটি কর্পোরেশন তিনদিনের শোক পালন করে। তাঁর জানাজায় ছুটে আসেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক মন্ত্রী, এমপি। বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতা তাঁর জানাজায় শরিক হন। বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, কূটনীতিকবৃন্দ ও বাংলাদেশের বড় বড় পার্টির নেতৃবৃন্দ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার প্রাচীন জনপদ গহিরা শান্তির দ্বীপ গ্রামে বক্স আলী চৌধুরীর বাড়িতে ১লা ডিসেম্বর, ১৯৪৪ সালে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম। পিতা হোসেন আহমদ চৌধুরী, মাতা বেদুরা বেগম। মহিউদ্দিন চৌধুরীর দাদার নাম আশরাফ আলী চৌধুরী। নানার নাম দলিলুর রহমান। পিতা আহমদ হোসেন চৌধুরী চাকরি করতেন ইস্টার্ন রেলওয়েতে। তাঁর পিতার কর্মস্থল সীতাকুণ্ডের মনিন্দ্রনাথ প্রাইমারিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। পরে সীতাকুণ্ড হাইস্কুল, নোয়াখালী জিলা হাইস্কুল, পটিয়া রাহাত আলী হাইস্কুল, চট্টগ্রাম প্রবর্তক বিদ্যাপীঠ, কাজেম আলী হাইস্কুল, হাটহাজারী খন্দকিয়া শিকারপুর স্কুলে তিনি লেখাপড়া করেন। ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাস করেন। অবশ্যই ইতিমধ্যে বাবার ইচ্ছায় পলিটেকনিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হন। কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। অতপর ছাত্র রাজনীতিতে চাকসুর ভিপি পদে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান চট্টগ্রাম সিটি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তখন সভাপতি ছিলেন মওলভী সৈয়দ আহমদ (বাঁশখালী)। মহিউদ্দিন চৌধুরী ষাটের দশকের ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ছাত্রনেতা হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে মওলভী সৈয়দ আহমদ ও মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম শহর ছাত্রলীগকে শক্তিশালীরূপেগড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সামরিক আইন বিরোধী মিছিল হয় চট্টগ্রামে। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণ দিয়ে অ্যাসেম্বলি বন্ধ ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামের ছাত্র জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। চট্টগ্রাম শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমাবেশ শুরু হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা পরদিন হরতাল ও লালদিঘির মাঠে জনসভার ডাক দিলেন। ২রা মার্চ ঐতিহাসিক লালদিঘির ময়দানে মহিউদ্দিন ও অন্যান্য ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি পতাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে খবর এলো ঢাকায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের নতুন পতাকা বানানো হয়েছে। সাথে সাথে মহিউদ্দিন চৌধুরী রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কাপড় কিনে এনে বাংলাদেশের অনুরূপ পতাকা তৈরি করেন। এসব পতাকা নিয়ে ছাত্র জনতার মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। সিটি কলেজে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরবর্তীতে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার জন্য মৌলভী সৈয়দ আহমদকে প্রধান ও মহিউদ্দিন চৌধুরীকে উপ-প্রধান করে জয় বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। গোপনে সিটি কলেজে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ঝাউতলা পাহাড়তলী ওয়ারলেস কলোনিতে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা শুরু হয়। এ সময় পাকি¯তানি নৌবাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ হন ভিক্টোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক আবুল কালাম। টাইগারপাস থেকে একটি বিশাল মিছিল মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে লালদিঘি ময়দানে পৌঁছে। ঐ সমাবেশে তিনি অবাঙালিদের আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে যেতে থাকে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের একটি দল ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগদান করেন। ছাত্র জনতার গগণবিদারী শ্লোগানে সমস্ত বাংলাদেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। জনতার শ্লোগান ছিল মুজিব তুমি ঘোষণা করÑবাংলাদেশ স্বাধীন কর; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরÑবাংলাদেশ স্বাধীন কর; তুমি কে, আমি কেÑবাঙালি বাঙালি; তোমার আমার ঠিকানাÑপদ্মা মেঘনা যমুনা; রক্ত সূর্য উঠেছেÑবীর বাঙালি জেগেছে; জয় বাংলা।
রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পাওয়ার পর চট্টগ্রাম ফিরে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও অন্যান্য ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কর্মীরা রাইফেল ক্লাব ও মাদারবাড়ি এলাকার অস্ত্র গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারদ দখল করে নেয়। শুরু হয় জনযুদ্ধের প্রস্তুতি। লালদিঘি ময়দানে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর কুচকাওয়াজ হলো। প্রস্তুতি শুরু হলো সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের। উত্তাল পরিস্থিতিতে অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর সদস্য, তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সংগঠিত হতে ছাত্রলীগের কর্মীরা মাইকিং করে প্রচার করতে থাকে। এ ঘোষণার পর এসব বাহিনীর সদস্যরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। এরা সকলে আন্দরকিল্লা ও স্টেশন রোডস্থ রেস্ট হাউজের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এসে যোগাযোগ করতে লাগল। আর ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতারা এদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। সকালে বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণাটি জহুর আহমদ চৌধুরীর দামপাড়াস্থ বাসায় পাঠানো হয়। তাঁর স্ত্রী ডা. নুরুন্নাহার জহুর বার্তাটি গ্রহণ করেন। জহুর আহমদ চৌধুরী বাসায় ছিলেন না। খবর পেয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী দ্রুত তাঁর কাছে গেলেন। বার্তাটি তিনি নুর আহম্মদ সড়কের গেস্টেট নার নামের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বেশ কিছু কপি সাইক্লোস্টাইল করে বিলির ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী, মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ ইউনুছ, বেঙ্গল রেজিমেন্টের নায়েক সুবেদার সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যান্যরা রেস্ট হাউজ থেকে খাবার দাবার নিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের দিকে রওনা হন। তাদের হাতে ছিল রাইফেল, তাদের বহনকারী জিপ গাড়িটি জুবিলী রোডের নেভাল অ্যাভিনিউর মোড়ে গেলে পাকিস্তানি নৌ-কমান্ডো দ্বারা আক্রান্ত হন। সংঘর্ষের পর মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সকলে গ্রেপ্তার হন। তাঁদেরকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কলারবোন ভেঙে যায়। একপর্যায়ে তাঁদেরকে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রেরণ করা হয়। কারাগার থেকে তাঁদেরকে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করানো হতো। চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার ছিলেন বাঙালি অফিসার খালেক। পাকিস্তানি বাহিনীর স্টেশন কমান্ডার ছিলেন এক বালুচ ক্যাপ্টেন। তিনি জেল পরিদর্শনে এসে জেলারের সাথে পরামর্শ করে পাগল জাতীয় বন্দিদের ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। এ খবর গোপনে পৌঁছে দেয়া হলো মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ তাঁর সাথীদের। তখন তাঁর ইশারায় সকলে পাগলের অভিনয় করতে থাকলেন। এক পর্যায়ে তাঁদেরকে পাগল ভেবে ছেড়েও দেয়া হল। মুক্তি পেলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ত্রিশ জন। মুক্তি লাভের তিন-চারদিন পর তিনি ভারতে চলে যান গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য। তিনিসহ তাঁর দল আগরতলায় শ্রীধর ভিলায় চলে যান। সেখান থেকে একদিন শেখ ফজলুল হক মণি কলকাতায় নিয়ে যান মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। সহযোদ্ধাদের পাঠানো হয় উত্তর প্রদেশের টান্ডুয়া সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। টান্ডুয়া সামরিক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের তেরতম স্কোয়াড কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর ভারতে উচ্চতর গেরিলা লিডার্স প্রশিক্ষণে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে পূর্বাঞ্চলীয় মাউন্ট ব্যাটালিয়নের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে পাকবাহিনীর এবং তাদের দোসর মিজু বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই লড়াই ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আঠার ডিসেম্বর তিনি তাঁর দলবল নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছেন। এরপর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে তিনি হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত হন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে যান। পরে জামিন লাভ করে অসীম সাহসী কয়েকজন সহযোদ্ধাদের নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। তিনি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এ অবস্থায় গ্রেফতার এড়াতে তিনি ভারতে চলে যান। রাজনৈতিক কারণে ফেরার জীবনে জীবিকার তাগিদে তাকে ভারতের কলকাতায় চায়ের দোকানে চাকরি নিতে হয় এবং এর পাশাপাশি বাড়তি রোজগারের জন্য হাওড়া রেলস্টেশনে হকারের কাজ করতে হয়। ভারতে তাঁর ফেরার জীবন কাটে দুই বছর। ভারত থেকে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে রাউজানে সংসদ নির্বাচন করেন। কিন্তু বিজয় ছিনিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। ১৯৯১ সালে তিনি চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী আসন থেকে দ্বিতীয় দফায় সংসদ নির্বাচন করেন। এবারও তিনি জয়লাভ করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। চট্টগ্রাম শহরে আওয়ালী লীগ সংগঠনকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সু-সংগঠিত করতে দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে লাগলেন। শুধু সংগঠন নয়, এলাকার সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য তিনি তাদের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। এছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মিল কারখানায় শ্রমিক লীগকে সংগঠিত করে তিনি নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তিনি চট্টগ্রামের একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাতে পরিণত হলেন। যার ফলশ্র“তিতে ১৯৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রামবাসী তাঁকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে মেয়র নির্বাচন করলেন। তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন মেয়র হলেন। ১৯৯৪ সালের ১১ মার্চ মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। পাঁচ বছর মেয়র হিসেবে সাফল্য অর্জনের পর ২০০০ সালের ১লা মার্চ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বারের মত মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে তিনি তৃতীয় দফায় চট্টগ্রামবাসীর ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামেরসাথে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র থাকাকালীন এক-এগার সরকার ক্ষমতা এসে ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালে মুক্তিলাভকরেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরী ছাত্রলীগের রাজনীতির ইতি টেনে যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। তিনি যুবলীগ নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম শ্রমিক রাজনীতির প্রাণপুরুষ ছিরেন। দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ২০০৬ সালের সম্মেলনে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতিত্বে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানেও তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন মাঠের মানুষ। জননেতা এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, এম এ মান্নানসহ অনেক ত্যাগী ও দূরদর্শী নেতাদের সান্নিধ্য পেয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন নিজ রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলে। তিনি রাতারাতি চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ের মানুষ হয়ে উঠেননি। তাঁর সততা, একাগ্রতা, কঠোর মনোবল, কঠোর পরিশ্রম, স্বপ্ন, সাধনা ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, আদর্শের প্রতি গভীর আস্থা ও নেতৃত্বের প্রতি অগাধ বিশ্বাসই তাঁকে আজ চট্টগ্রামের ঈর্ষণীয় সফলতা অর্জনকারী একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের স্বার্থের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন একজন নেতা। তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ড ও চট্টগ্রামবাসীর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা তিনি এ অঞ্চলের কিংবদন্তি পুরুষে পরিণত হন। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মহিউদ্দিন খুবই সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। জনগণের সেবাই তাঁর একমাত্র ব্রত ছিল। জনগণের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করার মানসিকতা নিয়েই তিনি রাজনীতি করেছেন। বর্তমানে তাঁর মতো রাজনৈতিক নেতার খুবই আকাল চলছে। তিনি সত্যিকারের একজন জনদরদী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। স্বভাবে কঠোর মনোভাবের মনে হলেও তিনি ছিলেন একজন উদারপ্রকৃতি ও সরল অন্তরের মানুষ। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনও রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন ও দুই ছেলে তিনি মেয়ে নিয়ে ছিল তাঁর পরিবার। তাঁর বড় মেয়ে টুম্পা মারা গেছেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নে ও জনস্বার্থে তাঁর অবদান চট্টগ্রামবাসী অনন্তকাল ধরে স্মরণ করবে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও গণমানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামই তাঁর জীবনের ছিল একমাত্র সাধনা। তাই চট্টগ্রামের কাছে তিনি বীর মহিউদ্দিন নামে খ্যাত।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password