জনপদে জনরবে জেগে থাকবে তোমার হৃদয় -আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু

  প্রিন্ট
(সর্বশেষ আপডেট: অক্টোবর ৩০, ২০১৭)

ফখরুল ইসলাম চৌধুরী পরাগ
৪ঠা নভেম্বর ২০১২ ভোরে ফোন পাই। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রিয় মুখ আলহাজ্ব
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুযিনি সমগ্র দেশে বাবু মিয়া নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের খ্যাতিমান এই রাজনীতিবিদ ও
৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রিয় ‘বাবু ভাই’। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে
অসহযোগ আন্দোলনের সময় তার পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউজ থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকান্ড পরিচালিত হত।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামে আসার পর জুপিটার হাউজ থেকে সাইক্লোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তার
বাসা থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে
আখতারুজ্জামান বাবু ভারতে যান এবং সেখানে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুজিব নগর
সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার
লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন যাহা
স্বাধীনতা অর্জনে খুবই গুরুত্বপূণ ছিল।
আমি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে বাবু মামা কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল। নানা ঝড়ঝাপ্টার মাঝেও
দলীয় আদর্শে তিনি ছিলেন অবিচল, দলীয় নেতা কর্মীদের বড় অবলম্বন ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি
প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করেছেন। দলের দূরদিনে আথিক সহযোগিতা করেছেন দলের সকল কমকানন্ড দলের
দুই হাতে টাকা খরচ করেছেন। আওয়ামী লীগকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর যত কাজ ছিল সবই তিনি
করেছেন। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তাঁর অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। চট্টগ্রামের
রাজনীতিতে দুর্দিনের কান্ডারী ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ করতে গিয়ে তিনি অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের জন্য সবকিছু হাসি মুখে বরণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল অগাত ভালবাসা, তার নীতি ও
আদর্শের প্রতি ছিলেন অবিচল। জেনারেল এরশাদ ও খালেদার সময় মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হাতে পেয়েও তিনি কখনো
আদর্শচ্যুত হননি। ঐসময় অনেক বড় বড় নেতারাই আওয়ামী লীগের আদর্শ ত্যাগ করে, এরশাদের সরকারে যোগ
দিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন আমাদের বাবু মামা। তিনি আদর্শবান মহাপুরুষ ছিলেন যাহা থেকে তাকে
বিন্দুমাত্র সরাতে পারে নাই তৎকালীন ক্ষমতাশালীরা। দলের নেতা কর্মীদের তিনি অনেক ভালবাসতেন। তাদের
যেকোন সমস্য নিজের সমস্যা মনে করে তিনি দূত সমধান করে দিতেন। টাকা দিয়ে, চাকরি দিয়ে, আইনগত
সহযোগিতা দিয়ে, যার যেটা প্রয়োজন তাকে ঠিক সেইভাবে সহযোগিতা করতেন। সহযোগিতা চেয়ে তার কাছ থেকে
কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে গেছে এমন নজির নাই। জীবনের বেশীরভাগ সময় ব্যায় করেছেন রাজনীতি করে।
সকলের সাথে সহজে মিশে য়াওয়ার অসাধারণ গুণ ছিল মামার। তিনি ধনী গরীব সকলকে সহজে বুকে জড়িয়ে
নিতেন। তিনি মানুষকে খাওয়াতে খুবই ভালবাসতেন। আপ্যায়ন না করে কেউ তার বাসা থেকে ফিরতে পারতনা।
নেতাকর্মীদের কিংবা অতিথিদের আপ্যায়ন করাতে দেরি হলে তিনি খুবই রেগে যেতেন। মানুষের প্রতি তার এরকম
ভালবাসা ছিল। সবসময় পরিবারের সদস্য, স্বজনদের ও নেতাকর্মীদের বলতেন আমি রাজনীতি করি দেশের জন্য
এলাকার জনসাধারণের জন্য আর ব্যবসা করি রাজনীতির জন্য। আমার দেখামতে তিনি তার জীবনের আয়ের বিশাল
অংশ দুহাতে খরচ করেছেন রাজনীতির জন্য, দলের জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি সাধারণ
মানুষকে খুবই ভালবাসতেন। এবং দল মতের উপরে উঠে মানুষকে সহযোগিতা করতেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী
বাবু একজন সমাজহিতৈষী, দানবীর ও জনদরদী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যাকে সাহায্য করতেন মন উজাড় করে
করতেন। পর্বতের মত হৃদয় নিয়ে তিনি সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি সাধারণ মানুষের পাশাপশি আতœীয়-
স্বজনদের প্রচুর সহয়োগিতা করতেন। তিনি সব আতœীয়-স্বজনদের খোজখবর রাখতেন। কোন সমস্যা নিয়ে ওনার
কাছে আমারা বাসায় গেলেই তিনি বুঝতে পারতেন। দেখার সাথে সাথেই সবার আগেই জানতে চাইত কোন ধরণের
দরকার বা সমস্যা আছে কিনা? কোন প্রয়োজন বা সমস্যার কথা বললে সাথে সাথে বিনা বাক্যে তিনি সমধান করে
দিতেন। একই সাথে প্রয়োজনীয় পরামর্শদিতেন। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আমাদের প্রিয় বাবু মামা।
অত্যান্ত দয়ালু ও মহৎ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছে এরকম রের্কড নাই। যাকে
যেভাবে পেরেছে সহযোগিতা করেছে। তিনি সবসময় আমাদের মাথার উপর ছায়ার মত ছিলেন। আমাদের সেছায়া
হটাৎ করে সরে গেল বড় অসময়ে। গত পাঁচ বছরে আমরা এটি প্রতিমূহূতে অনুধাবন করেছি।
তিনি কেবল রাজনীতিই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের মাটি ও মানুষের জন্য আজীবন কাজ
করেছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব হ্রাসে গুরুত্বপূণ অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক
স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ গড়ার কাজে হাত দেন। ব্যবসাবাণিজ্য
এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশে গড়ে তুলেন অনেকগুলো শিল্প প্রতিষ্টান যার মাধ্যমে সারা দেশের অসংখ্য
লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন। তার অসামন্য মেধা, মনন, সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেন
একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পউদ্যোক্তা। স্বাধীনতার পূর্বেতিনি বাটালি রোডে রয়েল ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কারখানা
প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি আসিফ স্টিল মিল, জাভেদ স্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যান আম বনস্পতি,
আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ভ্যানগার্ড স্টিল মিল,
সিনথেটিক রেজিন প্রোডাক্ট ক্রয় করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম দু’দশকে জামান শিল্পগোষ্ঠির গোড়াপত্তন
করেন। তিনি বিদেশী মালিকানাধীন আরামিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করান। এতে করে
হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থার সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠায় তিনি পথিকৃতের
ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশের দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল)
এর উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। মৃর্ত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পুর্ননির্বাচিত হন এবং
মৃত্যুর আগ পর্যস্তএ দায়িত্ব পালন করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মুখপাত্র ও
ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণভূমিকা রাখেন। তিনি দু দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৮
সালে তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসি ভুক্ত দেশসমূহের
চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান
নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত
হয়েছিলেন।
মানুষ পৃথিবীতে আসে ক্ষনিকের জন্য। ছোট জীবনটাই কাজ থাকে অনেক। কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁেচ
থাকতে পারে আজীবন। ছোট এই জীবনে বড় কাজ করলেই হয়ে উঠেন মহান একজন ব্যাক্তি। এরকম ছোট জীবনে
মহান হয়ে উঠা ব্যক্তিত্ববাবু মিয়া। মহৎ জীবনের অধিকারী হয়েছিলেন চট্টগ্রামবাসী এই প্রিয় নেতা, যাহা প্রমানিত
হয়েছে তার মহা প্রয়াণের পর। হাজার হাজার মানুষ ছুটে গিয়েছে তার জানাজায়। তাকে হারিয়ে দিক-বেদিক ছুটাছুটি
করেছে সমাজের সর্বস্থরের মানুষ। এই মহান ব্যক্তির মহা প্রয়াণে দেশের মানুষ আজও হতভম্ব, দিশেহারা। বাবু
মিয়াকে হারিয়ে দেশের মানুষ এক মহা পুরুষকে হারালো। তাঁর এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তার অভাব
আমরা আজও অনুভব করি। তার শূন্যতা আজও এলোমেল করে দেয় আমাদের চলাপথ। আমাদের চলার পথে তিনি
প্রেরণা হয়ে থাকবে আজীবন এই জনপদ যতদিন থাকবে, চট্টগ্রামবাসী যতদিন থাকবে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি
যতদিন থাকবে, মানুষের হৃদয়ে ততদিন থাকবেন আমাদের বাবু মিয়া। এই মহান ব্যাক্তিত্বে মৃত্যু হতে পারে না।
তিনি কালজয়ী মহাপুরুষ হিসেবে বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। জনপদে জনরবে জেগে থাকবে তোমার হৃদয় হে
মহান প্রিয় “আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু”।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password